পাটের দামে পতন, বিপাকে নড়াইলের চাষি

নিজস্ব প্রতিবেদক, নড়াইল

মৌসুমের শুরুতে ভালো দাম পেলেও নড়াইলে এখন পাট নিয়ে বিপাকে পড়েছেন কৃষকেরা। মাত্র ১৫ দিনের ব্যবধানে জেলার বাজারে পাটের দাম মণপ্রতি প্রায় ১ হাজার টাকা কমেছে। মৌসুমের শুরুতে ৪ হাজার ২০০ থেকে ৪ হাজার ৬০০ টাকা মণ দরে বিক্রি হওয়া পাট বর্তমানে মানভেদে ৩ হাজার ২০০ থেকে ৩ হাজার ৬০০ টাকা দরে কেনা-বেচা হচ্ছে। এতে উৎপাদন খরচ উঠে আসা নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে চাষিদের মধ্যে।

কৃষকেরা বলছেন, পাট চাষে জমি প্রস্তুত, বীজ, সার, সেচ, আগাছা দমন, কর্তন, জাগ দেওয়া, আঁশ ছাড়ানো, ধোয়া, শুকানো ও পরিবহণসহ প্রতিটি পর্যায়েই ব্যয় হয়েছে। এর মধ্যে শ্রমিকের মজুরি ও পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন ব্যয়ও বেড়েছে। ফলে বর্তমান দামে পাট বিক্রি করে কাক্সিক্ষত লাভ পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।

জেলা কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে নড়াইলে ২৩ হাজার ৫১৭ হেক্টর জমিতে পাটের আবাদ হয়েছে। পাট উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৫৮ হাজার ১৯৮ টন। এরই মধ্যে প্রায় ৯৮ শতাংশ জমির পাট কর্তন শেষ হয়েছে। ফলে একসঙ্গে বিপুল পরিমাণ পাট বাজারে উঠতে শুরু করায় সরবরাহ বেড়েছে।

জেলার অন্যতম বড় পাটের মোকাম তুলারামপুর ও মিঠাপুর হাটে দেখা গেছে, সকাল থেকেই বিভিন্ন এলাকা থেকে কৃষকেরা পাট নিয়ে আসছেন। হাটে পাটের সরবরাহ বাড়ায় ফড়িয়া ও পাইকারদের ব্যস্ততাও বেড়েছে। পাটের রং, আঁশের মান, আর্দ্রতা ও শুকানোর অবস্থা দেখে দর নির্ধারণ করছেন ব্যবসায়ীরা। দরদাম চূড়ান্ত হলে পাট কিনে তা গুদামে নেওয়া হচ্ছে।

ইতনা এলাকার পাটচাষি আবদুল হালিম বলেন, “মৌসুমের শুরুতে পাটের ভালো দাম পেয়েছি। এখন দাম অনেক কমে গেছে। অথচ চাষের সময় যে খরচ হয়েছে, তার কোনো কিছুই কমেনি। এভাবে দাম কমতে থাকলে পাট বিক্রি করে খরচের টাকাই উঠবে না।”

পাটের দাম কমার জন্য কৃষকদের একাংশের অভিযোগ, সরবরাহ বৃদ্ধির সুযোগ নিয়ে কেউ কেউ কম দামে পাট কেনার চেষ্টা করছেন। তাদের দাবি, বাজারে প্রকৃত প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করতে প্রশাসনের নিয়মিত নজরদারি প্রয়োজন।

এদিকে পাটের দাম কমার পাশাপাশি ওজন নিয়েও অভিযোগ করেছেন কৃষকেরা। তাদের দাবি, প্রচলিত হিসাবে এক মণ ৪০ কেজি হলেও কোনো কোনো ক্ষেত্রে ৪২ কেজিতে এক মণ পাট হিসাব করা হচ্ছে। এতে প্রতি মণে কৃষককে অতিরিক্ত প্রায় দুই কেজি পাট দিতে হচ্ছে। ফলে কম বাজারদরের সঙ্গে ওজনের বাড়তি চাপও কৃষকদের লোকসান বাড়াচ্ছে বলে অভিযোগ তাদের।

কৃষকদের আশঙ্কা, বাজারে পাটের সরবরাহ আরও বাড়লে দাম আরও কমতে পারে। এতে উৎপাদন খরচের তুলনায় বিক্রয়মূল্য কমে গিয়ে অনেক কৃষক লোকসানে পড়তে পারেন। দীর্ঘমেয়াদে এমন পরিস্থিতি চলতে থাকলে পাট চাষে কৃষকদের আগ্রহও কমে যেতে পারে বলে মনে করছেন তারা।

জেলা কৃষি বিভাগ জানিয়েছে, চলতি মৌসুমে নড়াইলে পাটের আবাদ ও উৎপাদন উল্লেখযোগ্য। অধিকাংশ জমির পাট কাটা শেষ হওয়ায় বর্তমানে বাজারে সরবরাহ বাড়ছে। এ অবস্থায় কৃষকের উৎপাদিত পাটের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা জরুরি। কৃষকদের দাবি, বাজার তদারকির পাশাপাশি সঠিক ওজন নিশ্চিত করে পাটের ন্যায্য দাম নিশ্চিত করতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হোক।

নড়াইলের জেলা প্রশাসক ড. মোহাম্মদ আব্দুল সালাম বলেন, পাটের বাজার পরিস্থিতি প্রশাসনের নজরদারিতে রয়েছে। কোনো সিন্ডিকেট বা কারসাজির কারণে যাতে কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত না হন, সে বিষয়ে প্রশাসন তৎপর। পাটের মাপজোক নিয়ে কৃষকদের অভিযোগও যাচাই করে দেখা হবে। কোনো অনিয়ম বা কারসাজির প্রমাণ পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

 

খুলনা গেজেট/এনএম




আরও সংবাদ

খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন