রাজধানী ঢাকার পাশাপাশি বগুরা ও চট্টগ্রামে চালু হয়েছে মহিলাদের জন্য ‘পিংক বাস’। তবে বরাবরের মতো খুলনাও এবার বঞ্চিত হয়েছে। খুলনা মহানগরী ও আশপাশের রুটগুলোতে কর্মজীবী নারী ও নারী শিক্ষার্থীদের নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যময় যাতায়াত নিশ্চিত করতে আলাদা ‘মহিলা বাস সার্ভিস’ চালুর দাবি জোরালো হয়ে উঠেছে। প্রতিদিনের চরম ভোগান্তি ও ভিড় এড়াতে এ দাবি জানিয়েছেন নগরীর বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার নারীরা।
খুলনার বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি দপ্তর, ব্যাংক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে দিন দিন কর্মজীবী নারীর সংখ্যা বাড়ছে। তবে গণপরিবহনে তাঁদের চলাচলের পরিবেশ এখনও ততটা উপযোগী নয়। পিক আওয়ারে নিয়মিত গণপরিবহনগুলোতে উপচে পড়া ভিড়ের কারণে নারীরা প্রায়ই বাসে উঠতে পারেন না। বাসে কয়েকটি সংরক্ষিত আসন থাকলেও তা অধিকাংশ সময় সাধারণ পুরুষ যাত্রীদের দখলে থাকে। এর পাশাপাশি যাতায়াতের সময় বিভিন্ন সময় হয়রানি ও অস্বস্তিকর পরিস্থিতির শিকার হতে হয় তাঁদের।
এ বিষয়ে খালিশপুর মুজগুন্নি এলাকার বাসিন্দা নাহিদ পারভীন বলেন, আমি একজন নারী যাত্রী হিসেবে দেখি, গণপরিবহনে অনেক সময় নারী যাত্রীদের সম্মান করা হয় না। একজন বয়স্ক নারী বাসে উঠলেও তাকে নিজের আসন ছেড়ে দেওয়ার মতো মানসিকতা সাধারণ যাত্রী বিশেষ করে পুরুষ যাত্রীদের মধ্যে অনেক সময় দেখা যায় না। একই সাথে গণপরিবহনে স্কুল-কলেজ পড়ুয়া কিশোরীরা উঠলে কিছু কম বয়সী পুরুষের বাঁকা দৃষ্টি ও খারাপ আচরণেরও শিকার হতে হয়। সবচেয়ে বড় কথা, অফিস সময় বা ভিড়ের বাসে কিছু পুরুষের বাজে আচরণের কারণে নারীদের অস্বস্তিকর পরিস্থিতিতে পড়তে হয়।
গণপরিবহনে আসন সংকটের কারণে নারীদের জন্য নির্ধারিত আসন মোট আসনের তুলনায় খুবই সীমিত। ফলে পুরুষ ও নারী যাত্রীদের পাশাপাশি গাদাগাদি করে দাঁড়িয়ে যাতায়াত করতে হয়। এতে অনেক সময় নারীদের অনাকাক্সিক্ষত ও অপ্রীতিকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়। সাধারণ বাসে কম বয়সী মেয়েদের দেখলে কিছু পুরুষের খারাপ দৃষ্টিতে তাকানো কিংবা বাজে আচরণের চেষ্টা করতে দেখা যায়। বাসে ওঠানামার সময় ইচ্ছাকৃতভাবে না সরে দাঁড়িয়ে থাকা বা শরীরের সঙ্গে ধাক্কা লাগার মতো ঘটনাও ঘটে। এ ধরনের পরিস্থিতি নারীদের জন্য অত্যন্ত অস্বস্তিকর ও নিরাপত্তাহীনতার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
তিনি বলেন, খুলনায় মহিলা বাস সার্ভিস চালু হলে এ ধরনের পরিস্থিতি অনেকটাই দূর হবে। নারীরা স্বাচ্ছন্দ্য ও নিরাপত্তার সঙ্গে চলাচল করতে পারবেন। দিন শেষে একজন নারী কোনো ধরনের আতঙ্ক বা অস্বস্তি ছাড়াই আত্মতৃপ্তি নিয়ে বাড়ি ফিরতে পারবেন।
খুবির শিক্ষাথী ফারজানা মিম বলেন, ফুলতলা থেকে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে যাতায়াত করতে গিয়ে বাসের ভিড়ের জন্য অনেক সময় সমস্যায় পড়তে হয়। এতে সময়মতো ক্লাসে পৌঁছানোও কঠিন হয়ে যায়। মহিলা বাস চালু হলে নারী শিক্ষার্থীরা নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যে যাতায়াত করতে পারবে। আমার মতে, ফুলতলা-খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় রুটে আগে মহিলা বাস চালু করা উচিত।
আইনজীবী শামিমা সুলতানা শিউলি বলেন, খুলনায় গণপরিবহনে নারীদের জন্য এই বিশেষ সুবিধা না থাকায় কর্মজীবী নারীদের নানা সমস্যায় পড়তে হয়। ফুলতলা-ডাকবাংলো-রূপসা-জিরো পয়েন্ট-সোনাডাঙ্গা রুটে বাস না থাকায় আমাদের মূলত ইজিবাইক বা মাহিন্দ্রায় চলাচল করতে হয়। এসব যানবাহনে আসনসংখ্যা সীমিত থাকায় নারী-পুরুষ পাশাপাশি গাদাগাদি করে বসতে হয়। এতে মাঝে মধ্যে নানা অপ্রীতিকর ঘটনাও ঘটে থাকে। তাছাড়া গাদাগাদি করে বসার সুযোগে প্রায়ই পকেটমারের ঘটনা ঘটে। ব্যাগ কেটে টাকা ও মোবাইল ফোন নিয়ে যাওয়ার ঘটনাও ঘটে। এসব ঘটনা ইজিবাইকে বেশি হয়।
মাহিন্দ্রায় অনেক দূর পর্যন্ত যাতায়াত করতে হলে বেশি ভোগান্তিতে পড়তে হয়। এতে যাতায়াত খরচও বেশি হয়। খুলনায় দৌলতপুর-ডাকবাংলো-রূপসা-জিরো পয়েন্টসহ বিভিন্ন রুটে কর্মজীবী নারীদের এক স্থান থেকে অন্য স্থানে নিয়মিত চলাচল করতে হয়। ফলে প্রতিনিয়ত এসব সমস্যার মুখোমুখি হতে হচ্ছে তাদের। যতদূর জানি, খুলনায় আগে কয়েকটি রুটে মহিলাদের জন্য অর্ধেক সিট বরাদ্দ দিয়ে বাস চালু হয়েছিল। কিন্তু সেই উদ্যোগ দীর্ঘস্থায়ী হয়নি।
সরকারের কাছে দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, দ্বিতীয় ধাপে হলেও ফুলতলা থেকে রূপসা রুটে অন্তত দুটি মহিলা বাস সার্ভিস চালু করা হোক। তাহলে এই অঞ্চলের কর্মজীবী নারীরা নিরাপদে যাতায়াত করতে পারবেন। নারীরা এখন কোথায় নেই? ২০২৬ সালে এসে নারীরা এই কাজ করতে পারবে না, সেখানে যেতে পারবে না এভাবে আর নারীদের আটকে রাখা যাবে না। নারীদের জন্য যে বাস সার্ভিস চালু হবে, সেখানে নারী চালক ও নারী হেলপার থাকলে সেটি আরও ভালো উদ্যোগ হবে।
খুলনা সম্মিলিত নারী অধিকার সুরক্ষা ফোরামের সাধারণ সম্পাদক সুতপা বেদজ্ঞ বলেন, খুলনায় গণপরিবহন বলতে আমরা সাধারণত দেখি ইজিবাইক, মাহিন্দ্রা ও সিএনজি। এগুলোর প্রত্যেকটিতেই নানা ধরনের সমস্যা রয়েছে। একে তো নারীদের পুরুষের গা ঘেঁষে বসতে হয়, তার ওপর জায়গাও খুবই সীমিত থাকে। অন্যদিকে, আমাদের দেশের বাস্তবতায় নারীদের প্রতি পুরুষের লোলুপ দৃষ্টির বিষয়টিও রয়েছে। নারীরা নানা ধরনের বাজে মন্তব্য ও হয়রানির শিকার হচ্ছেন।
তিনি বলেন, অনেক নারীর সামর্থ্য না থাকলেও তারা রিকশা নিয়ে চলাচল করেন কিংবা একটু দূরে যাওয়ার ক্ষেত্রেও চেষ্টা করেন, কীভাবে পুরুষের সংস্পর্শ এড়িয়ে আলাদাভাবে যাওয়া যায়। এ ধরনের সংকট নারীরা প্রতিনিয়তই মোকাবিলা করছেন। একজন নারী হিসেবে আমিও দুই-একদিন এই পরিস্থিতির মধ্যে পড়েছি। সিএনজি বা মাহিন্দ্রায় চলাচলের সময় আমিও এ ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হয়েছি।
সুদপা বেদজ্ঞ বলেন, দেশকে এগিয়ে নিতে হলে অনেক উদ্যোগ নিতে হয়। এর মধ্যে মহিলাদের জন্য আলাদা বাস সার্ভিস চালু করা একটি ইতিবাচক উদ্যোগ। মহিলাদের জন্য মহিলা বাস সার্ভিস চালু করা হলে এ ধরনের সমস্যা অনেকটাই কমে আসবে। একই সঙ্গে পুরুষের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন করাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এখনো শহরে অনেকেই মেয়েদের স্কুটি বা মোটরসাইকেল চালানোকে স্বাভাবিকভাবে দেখেন না। বিষয়টিকে স্বাভাবিকভাবে নেওয়ার জন্য স্কুল পর্যায় থেকেই মেয়েদের সাহসী ও আত্মনির্ভরশীল হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।
তিনি আরও বলেন, এই মুহূর্তে দেশের তিনটি শহরে মহিলা বাস সার্ভিস চালু হয়েছে। সারাদেশে এ সার্ভিস চালু হলে একসঙ্গে একটি ইতিবাচক বার্তা যেত। শিল্পাঞ্চল ও দেশের তৃতীয় বৃহত্তম শহর হিসেবে খুলনায়ও মহিলা বাস সার্ভিস চালু করা উচিত বলে আমি মনে করি। এ বিষয়ে এখনই সরকারের সঙ্গে দেনদরবার করা উচিত, যাতে দ্বিতীয় দফায় খুলনা শহরের জন্যও বাস পাওয়া যায়।
নিরাপদ সড়ক চাই মহানগর শাখার সভাপতি মাহবুবুর রহমান মুন্না বলেন, ঢাকাসহ বিভিন্ন শহরে মহিলা বাস সার্ভিস চালুর উদ্যোগকে আমরা স্বাগত জানাই। খুলনা শহরেও নারী যাত্রীদের নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যময় যাতায়াত নিশ্চিত করতে দ্রুত মহিলা বাস সার্ভিস চালুর দাবি জানাচ্ছি। বিশেষ করে কর্মজীবী ও শিক্ষার্থীদের যাতায়াতের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ রুটগুলোতে এ সেবা চালু করা প্রয়োজন। একই সাথে নগরবাসীর চলাচলের সুবিধার্থে খুলনায় গণপরিবহণ চালুরও দাবি জানাচ্ছি।
বিআরটিসি খুলনা বাস ডিপো ম্যানেজার মোঃ কামরুজ্জামান খুলনা গেজেটকে বলেন, খুলনায় মহিলা বাস চালুর বিষয়ে কোনো নির্দেশনা আসেনি। নির্দেশনা পেলেই খুলনায়ও বাস চালু করা হবে।
খুলনা গেজেট/এনএম

