ডুমুরিয়া-ফুলতলার সড়ক : ফেসবুকে সংস্কার, রাস্তায় হাঁটু পানি!

দৌলতপুর-খর্ণিয়া, শাহপুর-ফুলতলা, খুলনা-সাতক্ষীরাসহ গুরুত্বপূর্ণ সড়কে জনদুর্ভোগ চরমে

কামরুল ইসলাম

ডুমুরিয়া-ফুলতলা উপজেলার মানুষের কাছে এখন একটি প্রশ্নই বড় হয়ে দেখা দিয়েছে-রাস্তা কি শুধু প্রতিশ্রুতিতেই ঠিক হবে, নাকি সত্যিই সংস্কার হবে?

উপজেলার গুরুত্বপূর্ণ বহু সড়কের বর্তমান অবস্থা দেখলে মনে হয়, ডুমুরিয়া-ফুলতলার সড়কব্যবস্থা যেন দীর্ঘদিনের এতিম। দৌলতপুর-খর্ণিয়া, শাহপুর-ফুলতলা, খুলনা-সাতক্ষীরাসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়কের অনেক অংশে ভাঙাচোরা পিচ, খানাখন্দ ও গর্তের কারণে স্বাভাবিক চলাচল মারাত্মক ব্যাহত হচ্ছে। কোথাও রাস্তার অবস্থা এতটাই খারাপ যে যানবাহন চালানো যেমন কষ্টকর, তেমনি যাত্রীদের জীবনও ঝুঁকির মধ্যে পড়ছে।

সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়ছেন সাধারণ মানুষ। রোগী নিয়ে অ্যাম্বুলেন্স, শিক্ষার্থী বহনকারী যান, কৃষকের পণ্যবাহী গাড়ি, কর্মজীবী মানুষের যানবাহন- সবকিছুকেই এসব সড়ক ব্যবহার করতে হচ্ছে। একটি নষ্ট রাস্তা শুধু যাত্রার সময় বাড়ায় না; এটি বাড়িয়ে দেয় পরিবহন ব্যয়, দুর্ঘটনার ঝুঁকি এবং মানুষের ভোগান্তি।

বর্ষাকালে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়। রাস্তার গর্তে পানি জমে গেলে কোথায় রাস্তা আর কোথায় গর্ত তা বোঝা কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে সামান্য অসাবধানতাতেই দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।

রাস্তা নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণের সঙ্গে সরকারি বিভিন্ন সংস্থা জড়িত। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) এবং সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর (সওজ) তাদের নিজ নিজ আওতাধীন সড়কের উন্নয়ন ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব পালন করে।

কিন্তু সাধারণ মানুষের কাছে প্রশাসনিক বিভাজন খুব গুরুত্বপূর্ণ নয়। তাদের প্রশ্ন একটাই “রাস্তা নষ্ট হয়েছে, তাহলে রাস্তা ঠিক হবে কবে?”

একটি সড়ক বছরের পর বছর ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় পড়ে থাকবে, অথচ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নিয়মিতভাবে সেটি পর্যবেক্ষণ করবে না এটি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

রাস্তার ছোট ক্ষতি সময়মতো মেরামত করা হলে সেটি বড় ক্ষতিতে পরিণত হয় না। কিন্তু বছরের পর বছর অবহেলা করলে শেষ পর্যন্ত পুরো রাস্তা পুনর্নির্মাণ প্রয়োজন হয়। এতে সরকারি অর্থের অপচয় বাড়ে এবং মানুষের দুর্ভোগও দীর্ঘায়িত হয়।

ফেসবুকে উন্নয়ন, বাস্তবে দুর্ভোগ : বর্তমান সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম রাজনৈতিক ও সামাজিক যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। কোনো নেতা বা জনপ্রতিনিধি রাস্তা সংস্কারের জন্য উদ্যোগ নিলে সেটি জনগণকে জানানো স্বাভাবিক।

কিন্তু সমস্যা হয় তখন, যখন ফেসবুকের পোস্ট আর বাস্তবতার মধ্যে বিশাল ব্যবধান তৈরি হয়।

কখনো দেখা যায়, কোনো নেতা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার সঙ্গে বৈঠকের ছবি পোস্ট করছেন। কোথাও লেখা হচ্ছে রাস্তা হবে, কাজ আসছে, প্রকল্প অনুমোদনের পথে। জনগণ আশায় বুক বাঁধে। কিন্তু মাস যায়, বছর যায় রাস্তা আগের মতোই পড়ে থাকে। তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে, ছবি কি উন্নয়নের বিকল্প? আশ্বাস কি রাস্তার গর্ত ভরাট করতে পারে? উত্তর অবশ্যই ‘না’। জনগণ এখন আর শুধু আশার বাণী শুনতে চায় না। তারা চায় দৃশ্যমান কাজ।

রাস্তা সংস্কারে শুধু বরাদ্দ নয়, জবাবদিহিও চায়।

সরকার রাস্তা নির্মাণ ও সংস্কারে জনগণের অর্থ ব্যয় করে। সেই অর্থের প্রতিটি টাকা জনগণের সম্পদ। তাই কোনো রাস্তার জন্য কত টাকা বরাদ্দ হলো, কাজের দায়িত্ব কার, কাজ কবে শুরু হবে এবং কবে শেষ হবে- এসব তথ্য জনগণের জানার অধিকার রয়েছে।

আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো কাজের মান। একটি রাস্তা সংস্কারের পর যদি অল্প সময়ের মধ্যেই আবার ভেঙে যায়, তাহলে শুধু নতুন করে বরাদ্দ দিলেই সমস্যার সমাধান হয় না। কেন রাস্তা দ্রুত নষ্ট হলো, নির্মাণকাজের মান ঠিক ছিল কি না, যথাযথ তদারকি হয়েছিল কি না- এসব প্রশ্নের উত্তরও প্রয়োজন। কারণ নিম্নমানের রাস্তা মানে শুধু সরকারি অর্থের অপচয় নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে মানুষের জীবন ও নিরাপত্তা।

দুর্ঘটনার পর নয়, দুর্ঘটনার আগেই ব্যবস্থা : আমাদের প্রশাসনিক সংস্কৃতির একটি বড় দুর্বলতা হলো অনেক সময় কোনো সমস্যা ভয়াবহ আকার ধারণ করার পর ব্যবস্থা নেওয়া হয়। কিন্তু সড়কের ক্ষেত্রে এই নীতি ভয়ংকর।

একটি ঝুঁকিপূর্ণ রাস্তা যদি আগে থেকেই চিহ্নিত করা যায়, তাহলে দুর্ঘটনা ঘটার অপেক্ষা কেন? প্রশাসনের কাজ শুধু দুর্ঘটনার পর তদন্ত করা নয়; দুর্ঘটনা যাতে না ঘটে, সেই ব্যবস্থা করাও প্রশাসনের দায়িত্ব।

তাই খুলনা জেলার ঝুঁকিপূর্ণ সড়কগুলোর জন্য একটি জরুরি সড়ক পরিদর্শন ও সংস্কার কর্মসূচি নেওয়া যেতে পারে। কোন রাস্তা সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ, কোন অংশ দ্রুত মেরামত দরকার এবং কোনো সড়ক পুনর্নির্মাণ প্রয়োজন তা নির্ধারণ করে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কাজ শুরু করা দরকার।

খুলনার মানুষ করুণা নয়, অধিকার চায় : খুলনার মানুষ কারও কাছে দয়া চায় না। তারা রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে তাদের ন্যায্য অধিকার চায়। একজন কৃষক চান তাঁর উৎপাদিত ফসল নিরাপদে বাজারে পৌঁছাক। একজন রোগীর স্বজন চান অ্যাম্বুলেন্স দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছাক। একজন শিক্ষার্থী চান নিরাপদে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যেতে। একজন কর্মজীবী মানুষ চান সময়মতো কর্মস্থলে পৌঁছাতে। এই চাওয়াগুলো কোনো বিলাসিতা নয়। এগুলো মানুষের মৌলিক নাগরিক প্রয়োজন।

এখনই সময় বাস্তব পদক্ষেপের : খুলনার সড়ক ব্যবস্থার এই দুরবস্থা আর দীর্ঘায়িত করা উচিত নয়। সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তর, জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও স্থানীয় প্রশাসনের সমন্বয়ে দ্রুত একটি বাস্তবভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা প্রয়োজন।

প্রথমত, ঝুঁকিপূর্ণ সড়কগুলোর তালিকা তৈরি করতে হবে। দ্বিতীয়ত, জরুরি ভিত্তিতে চলাচলের উপযোগী করার জন্য প্রয়োজনীয় মেরামত করতে হবে। তৃতীয়ত, দীর্ঘমেয়াদে টেকসই সংস্কার বা পুনর্নির্মাণের ব্যবস্থা করতে হবে। চতুর্থত, কাজের মান নিশ্চিত করতে কঠোর প্রকৌশলগত তদারকি প্রয়োজন। পঞ্চমত, কাজের অগ্রগতি ও সময়সীমা জনগণের সামনে প্রকাশ করা উচিত। ষষ্ঠত, সংস্কারের পর অল্প সময়ের মধ্যে রাস্তা নষ্ট হলে সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।

শেষ কথা : খুলনার উন্নয়ন শুধু বড় বড় প্রকল্পের হিসাব দিয়ে মাপা যাবে না। উন্নয়নের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হলো একজন সাধারণ মানুষ তার ঘর থেকে বের হয়ে নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছাতে পারছেন কি না। ফেসবুকে উন্নয়নের ছবি থাকতে পারে, সভার ছবি থাকতে পারে, আশ্বাসের বাণী থাকতে পারে। কিন্তু মানুষের চলার রাস্তা যদি ভাঙা থাকে, তাহলে সেই উন্নয়ন মানুষের জীবনে কতটা পৌঁছেছে, প্রশ্ন থেকেই যায়। তাই এখন আর ছবি নয়, রাস্তা চাই। আর আশ্বাস নয়, কাজ চাই। আর প্রতিশ্রুতি নয়, জবাবদিহি চাই। খুলনার মানুষ জানতে চায়।

দৌলতপুর-খর্ণিয়া, শাহপুর-ফুলতলা, খুলনা-সাতক্ষীরাসহ ঝুঁকিপূর্ণ সড়কগুলো কবে নিরাপদ হবে? এই প্রশ্নের উত্তর কোনো ফেসবুক পোস্টে নয়, উত্তর দিতে হবে রাস্তার ওপর। কারণ- রাস্তা শুধু ইট-পাথর-বিটুমিনের নির্মাণ নয়; একটি রাস্তা মানুষের জীবন, জীবিকা, অর্থনীতি ও ভবিষ্যতের সঙ্গে যুক্ত। খুলনার সেই ভবিষ্যতের পথটি নিরাপদ করার দায়িত্ব যাদের, এখন তাঁদেরই সামনে এগিয়ে আসতে হবে।

লেখক : অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তা।

 

খুলনা গেজেট/এনএম




আরও সংবাদ

খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন