বিশ্ব রাজনীতির ইতিহাস বলে, কোনো জনগোষ্ঠীর ওপর অন্যায়-অবিচার দীর্ঘদিন চলতে পারে তখনই, যখন সেই অন্যায়ের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ ও কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে না ওঠে । প্রতিবাদ শুধু রাজপথের স্লোগানে সীমাবদ্ধ থাকলে তার প্রভাব অনেক সময় সাময়িক হয়; কিন্তু সেই প্রতিবাদের সঙ্গে যদি কূটনীতি, অর্থনীতি, শিক্ষা ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা যুক্ত হয়, তখন তা পরিণত হতে পারে দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তনের শক্তিতে।
ভারতের মুসলিমসহ বিভিন্ন সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর অধিকার, নিরাপত্তা ও ধর্মীয় স্বাধীনতা নিয়ে বহু বছর ধরে নানা অভিযোগ, বিতর্ক ও উদ্বেগ প্রকাশিত হয়ে আসছে। বিশেষ করে (বিজেপি)-র শাসনামলে ধর্মীয় মেরুকরণ, সংখ্যালঘু অধিকার এবং নাগরিক সমতার প্রশ্নে দেশ-বিদেশে তীব্র বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। তবে একই সঙ্গে মনে রাখতে হবে, ভারতের সমাজ একমাত্র কোনো একটি রাজনৈতিক দল বা মতাদর্শের প্রতিনিধিত্ব করে না। সেখানে অসংখ্য মানুষ, নাগরিক সংগঠন, সাংবাদিক, আইনজীবী, মানবাধিকারকর্মী ও রাজনৈতিক দল সংখ্যালঘু অধিকার ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির পক্ষে কাজ করে চলেছেন।
তাই প্রশ্নটি হওয়া উচিত-মুসলিম বিশ্বের প্রতিক্রিয়া কী হওয়া উচিত?
আমার মতে, উত্তরটি কোনো ধরনের সহিংসতা, প্রতিশোধ বা সাধারণ মানুষের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ নয়। বরং উত্তর হতে পারে ঐক্যবদ্ধ কূটনীতি, মানবাধিকারের পক্ষে আন্তর্জাতিক অবস্থান এবং অর্থনৈতিক আত্মনির্ভরতা।
এই জায়গা থেকেই সামনে আসতে পারে একটি সাহসী ধারণা-‘ইসলামি দিনার’।
প্রতিবাদের নতুন ভাষা : অর্থনৈতিক শক্তি
আধুনিক বিশ্বে অর্থনীতি আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। একটি রাষ্ট্রের রাজনৈতিক প্রভাব অনেকাংশে নির্ভর করে তার অর্থনৈতিক সক্ষমতা, বাণিজ্যিক সম্পর্ক, প্রযুক্তিগত উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক বাজারে অবস্থানের ওপর।
মুসলিম বিশ্বের দেশগুলো সম্মিলিতভাবে বিপুল প্রাকৃতিক ও মানবসম্পদের অধিকারী। মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি সম্পদ, দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার জনশক্তি, আফ্রিকার কৃষি ও খনিজ সম্পদ এবং বিভিন্ন মুসলিম দেশের শিল্প ও প্রযুক্তিগত সম্ভাবনা-সব মিলিয়ে মুসলিম বিশ্ব একটি বড় অর্থনৈতিক শক্তি হয়ে উঠতে পারে।
কিন্তু বাস্তবতা হলো, এই দেশগুলোর মধ্যে পারস্পরিক অর্থনৈতিক সহযোগিতা এখনও তাদের সম্ভাবনার তুলনায় সীমিত। রাজনৈতিক বিভাজন, ভিন্ন অর্থনৈতিক নীতি, পারস্পরিক অবিশ্বাস এবং আঞ্চলিক সংঘাত তাদের সম্মিলিত শক্তিকে দুর্বল করে রেখেছে।
অতএব, যদি মুসলিম দেশগুলো সত্যিই আন্তর্জাতিক অঙ্গনে শক্তিশালী ও স্বাধীন কণ্ঠস্বর প্রতিষ্ঠা করতে চায়, তবে প্রথম কাজ হওয়া উচিত নিজেদের মধ্যে অর্থনৈতিক সহযোগিতা বৃদ্ধি করা।
সেই সহযোগিতার দীর্ঘমেয়াদি প্রতীক হতে পারে-ইসলামি দিনার।
‘ইসলামি দিনার’-কীভাবে?
‘ইসলামি দিনার’ বলতে অবিলম্বে সব মুসলিম দেশের জাতীয় মুদ্রা বাতিল করে একটি নতুন মুদ্রা চালু করার কথা বলা হচ্ছে না। বাস্তবে সেটি অত্যন্ত জটিল এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া।
বরং প্রথম ধাপে হতে পারে একটি ইসলামি অর্থনৈতিক সহযোগিতা অঞ্চল। সদস্য দেশগুলো নিজেদের জাতীয় মুদ্রা বজায় রেখেও পারস্পরিক বাণিজ্যে স্থানীয় মুদ্রার ব্যবহার বাড়াতে পারে।
দ্বিতীয় ধাপে গড়ে উঠতে পারে একটি যৌথ পেমেন্ট সিস্টেম, যাতে আন্তর্জাতিক লেনদেনে তৃতীয় কোনো মুদ্রার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমে।
তৃতীয় ধাপে সদস্য দেশগুলো একটি অভিন্ন হিসাব একক বা ‘ইসলামি দিনার’ চালু করতে পারে, যা প্রথমে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও আন্তঃদেশীয় লেনদেনে ব্যবহৃত হবে।
অবশেষে, দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক সমন্বয়, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, আর্থিক শৃঙ্খলা ও রাজনৈতিক ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হলে একটি অভিন্ন মুদ্রা চালুর সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।
এই প্রক্রিয়া সফল করতে হলে প্রয়োজন হবে একটি শক্তিশালী যৌথ আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং স্বাধীন অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞদের নেতৃত্বে সুপরিকল্পিত কাঠামো।
‘ইসলামি দিনার’ কেন ‘শান্তির দিনার’?
একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এখানে স্পষ্ট করা প্রয়োজন। ‘ইসলামি দিনার’ নামটি যেন কখনোই কোনো ধর্মীয় বা রাজনৈতিক আধিপত্যের প্রতীক না হয়। বরং এর দর্শন হওয়া উচিত-শান্তি, ন্যায়, মানবিক মর্যাদা ও পারস্পরিক সহযোগিতা।
এই মুদ্রার প্রতীকী নাম তাই হতে পারে-
‘শান্তির দিনার’।
এর অর্থ হবে-আমরা কারও বিরুদ্ধে নই; আমরা অন্যায়ের বিরুদ্ধে।
আমরা কোনো দেশের সাধারণ জনগণের বিরুদ্ধে নই; আমরা মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে।
আমরা কোনো ধর্মের বিরুদ্ধে নই; আমরা ধর্মের নামে বৈষম্য ও ঘৃণার বিরুদ্ধে।
এমন একটি নীতি মুসলিম বিশ্বের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তিকেও আরও মানবিক ও ইতিবাচক করে তুলতে পারে।
ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক : প্রতিবাদ হোক, বিচ্ছিন্নতা নয়
ভারত বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ অর্থনীতি এবং মুসলিম বিশ্বের বহু দেশের সঙ্গে তার গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে। তাই ভারতের সঙ্গে সম্পূর্ণ অর্থনৈতিক বিচ্ছিন্নতা বাস্তবসম্মতও নয়, সবসময় কাম্যও নয়।
বরং মুসলিম দেশগুলো ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখেই মানবাধিকার ও সংখ্যালঘু অধিকারের প্রশ্নে তাদের উদ্বেগ প্রকাশ করতে পারে।
যদি কোনো নির্দিষ্ট ঘটনায় সংখ্যালঘুদের ওপর অন্যায় বা বৈষম্যের অভিযোগ ওঠে, তাহলে যৌথভাবে তদন্তের দাবি জানানো যেতে পারে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থার সঙ্গে সহযোগিতা করা যেতে পারে। কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে উদ্বেগ জানানো যেতে পারে।
প্রয়োজনে আন্তর্জাতিক আইন ও বাণিজ্যিক নীতির আওতায় শান্তিপূর্ণ অর্থনৈতিক ব্যবস্থা বিবেচনা করা যেতে পারে।
কিন্তু সেই পদক্ষেপ কখনোই কোনো দেশের সাধারণ জনগণের বিরুদ্ধে শত্রুতা সৃষ্টি করবে না-এটাই হতে হবে মূল নীতি।
মুসলিম বিশ্বের ঐক্যের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা
আজ মুসলিম বিশ্বের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ শুধু বাইরের কোনো শক্তি নয়; বরং নিজেদের অভ্যন্তরীণ বিভাজন।
সুন্নি-শিয়া বিভাজন, আরব-অনারব বিভাজন, রাজনৈতিক মতপার্থক্য, আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং পরস্পরের প্রতি অবিশ্বাস মুসলিম বিশ্বের সম্মিলিত শক্তিকে দুর্বল করেছে।
তাই ‘ইসলামি দিনার’ চালুর আগে প্রয়োজন ‘ঐক্যের ভিত্তি’ নির্মাণ।
-এই ঐক্যের প্রথম স্তম্ভ হতে পারে শিক্ষা।
-দ্বিতীয় স্তম্ভ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি।
-তৃতীয় স্তম্ভ অর্থনৈতিক সহযোগিতা।
-চতুর্থ স্তম্ভ মানবাধিকার।
-পঞ্চম স্তম্ভ আইনের শাসন।
-আর ষষ্ঠ স্তম্ভ হতে পারে শান্তিপূর্ণ কূটনীতি।
যে মুসলিম বিশ্ব নিজের নাগরিকদের জন্য উন্নত শিক্ষা, চিকিৎসা, কর্মসংস্থান ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে না, সে বিশ্ব কেবল একটি নতুন মুদ্রা চালু করলেই শক্তিশালী হয়ে উঠবে না।
অতএব, ‘ইসলামি দিনার’ হতে হবে একটি বৃহত্তর উন্নয়ন দর্শনের অংশ।
শুধু ভারতের জন্য নয়, সব নিপীড়িত মানুষের জন্য
যদি মুসলিম দেশগুলো মানবাধিকারের পক্ষে ঐক্যবদ্ধ হতে চায়, তাহলে তাদের নীতিটি হতে হবে সর্বজনীন।
ভারতে মুসলিমদের অধিকার যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি অন্যান্য সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর অধিকারও গুরুত্বপূর্ণ। একইভাবে বিশ্বের অন্য কোথাও মুসলিম, খ্রিস্টান, হিন্দু, বৌদ্ধ, ইহুদি বা কোনো আদিবাসী জনগোষ্ঠী যদি বৈষম্য বা নিপীড়নের শিকার হয়, তাদের অধিকার নিয়েও একইভাবে কথা বলতে হবে।
কারণ মানবাধিকার বেছে বেছে রক্ষা করা যায় না।
একজন মানুষের ধর্ম দেখে তার অধিকার নির্ধারণ করা হলে তা মানবাধিকারের মূল দর্শনের বিরোধী।
সুতরাং মুসলিম বিশ্বের আন্তর্জাতিক অবস্থান হওয়া উচিত-
‘অন্যায় যার ওপরই হোক, আমরা তার বিরুদ্ধে।’
এই নৈতিক অবস্থানই মুসলিম বিশ্বের প্রতিবাদকে সবচেয়ে শক্তিশালী ও গ্রহণযোগ্য করে তুলতে পারে।
শেষ কথা : দিনার নয়, দরকার আত্মমর্যাদার অর্থনীতি
‘ইসলামি দিনার’ হয়তো আজ একটি স্বপ্ন। হয়তো আগামীকালও তা বাস্তবায়ন সম্ভব হবে না। কিন্তু প্রতিটি বড় পরিবর্তনের শুরু হয় একটি স্বপ্ন থেকে।
আজ মুসলিম বিশ্বের প্রয়োজন এমন একটি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, যেখানে দেশগুলো নিজেদের মধ্যে বেশি বাণিজ্য করবে, নিজেদের মুদ্রার ব্যবহার বাড়াবে, নিজেদের প্রযুক্তি উন্নত করবে এবং নিজেদের মানবসম্পদকে কাজে লাগাবে।
যদি সেই অর্থনৈতিক ঐক্যের কোনো একদিন একটি অভিন্ন মুদ্রা জন্ম নেয়, তার নাম ‘ইসলামি দিনার’ হোক বা অন্য কিছু-নামটি বড় কথা নয়। বড় কথা হলো, সেই মুদ্রা যেন প্রতীক হয়ে ওঠে অর্থনৈতিক স্বাধীনতা, পারস্পরিক সহযোগিতা ও শান্তির।
ভারতের সংখ্যালঘুদের অধিকার রক্ষার প্রশ্নে মুসলিম বিশ্বের প্রতিবাদ অবশ্যই হওয়া উচিত-কিন্তু সেই প্রতিবাদ যেন ঘৃণার ভাষায় নয়, ন্যায়বিচারের ভাষায় হয়; প্রতিশোধের ভাষায় নয়, মানবাধিকারের ভাষায় হয়।
কারণ সত্যিকারের শক্তিশালী জাতি অন্যকে ধ্বংস করার শক্তিতে বড় হয় না; বরং নিজের মানুষকে উন্নত, শিক্ষিত, মর্যাদাবান ও নিরাপদ করে তোলার ক্ষমতায় বড় হয়।
তাই আজকের আহ্বান হতে পারে-
-ঐক্য হোক, কিন্তু ঘৃণার নয়।
-প্রতিবাদ হোক, কিন্তু সহিংসতার নয়।
-অর্থনৈতিক শক্তি হোক, কিন্তু আধিপত্যের নয়।
-‘ইসলামি দিনার’ হোক-শান্তির দিনার, ন্যায়ের দিনার, মানবতার দিনার।
হয়তো একদিন মুসলিম বিশ্বের কোনো এক প্রজন্ম এই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেবে। আর সেদিন সেই মুদ্রার সবচেয়ে বড় মূল্য হবে তার বাজারদর নয়—মানুষের অধিকার ও মর্যাদার প্রতি তার অঙ্গীকার।
লেখক : অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তা
খুলনা গেজেট/এনএম

