স্মৃতিতে চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান

খানজাহান আলী (রহঃ) সেতুতে অবরোধ করে খুবি শিক্ষার্থীরা

কাজী মোতাহার রহমান

১০ জুলাই ২০২৪। সরকারি চাকরির প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণিতে মুক্তিযোদ্ধা কোটা পদ্ধতি বাতিল চেয়ে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের স্ব-স্ব বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাসে ফিরে যেতে বলেন আপিল বিভাগ।

একই সঙ্গে সরকারি চাকরির প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণিতে মুক্তিযোদ্ধা কোটা পদ্ধতি বাতিলের সিদ্ধান্ত অবৈধ ঘোষণা করে হাইকোর্টের দেওয়া রায়ের ওপর চার সপ্তাহের জন্য স্থিতাবস্থা জারি করে আপিল বিভাগ। এসময়ের মধ্যে রাষ্ট্রপক্ষ ও শিক্ষার্থীদের হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে লিভ টু আপিল করতে বলেন আদালত।

১ জুলাই সরকারি চাকরির প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণিতে মুক্তিযোদ্ধা কোটা পদ্ধতি বাতিলের সিদ্ধান্ত অবৈধ ঘোষণা করে হাইকোর্টের দেওয়া রায় স্থগিত চেয়ে দুই শিক্ষার্থী আবেদন করেন।

দুই শিক্ষার্থী হলেন- ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতির সভাপতি আল সাদী ভূঁইয়া ও উর্দু বিভাগের শিক্ষার্থী আহনাফ সাঈদ খান।

এর আগে গত ৪ জুলাই সরকারি চাকরির প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণিতে মুক্তিযোদ্ধা কোটা পদ্ধতি বাতিলের সিদ্ধান্ত অবৈধ ঘোষণা করে হাইকোর্টের দেওয়া রায় আপাতত বহাল রাখেন আপিল বিভাগ।

সেদিন আপিল বিভাগ রায় স্থগিত চেয়ে রাষ্ট্রপক্ষের আবেদনের ওপর শুনানি করেননি, ‘নট টুডে’ বলে আদেশ দেন। আপিল বিভাগ রাষ্ট্রপক্ষকে বলেন, আপাতত হাইকোর্টের রায় যেভাবে আছে, সেভাবে থাকুক। রায় প্রকাশিত হলে আপনারা ‘লিভটু আপিল’ দায়ের করুন। আমরা শুনব। এসময় প্রধান বিচারপতি বলেন, “আন্দোলন হচ্ছে, হোক। রাজপথে আন্দোলন করে কী হাইকোর্টের রায় পরিবর্তন করবেন?”

আদালতে রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি করেন অ্যাটর্নি জেনারেল এ এম আমিন উদ্দিন। রিটের পক্ষে আদালতে উপস্থিত ছিলেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মোতাহার হোসেন সাজু। গত ৫ জুন সরকারি চাকরিতে প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির মুক্তিযোদ্ধা কোটা পদ্ধতি বাতিলের সিদ্ধান্ত অবৈধ ঘোষণা করেন হাইকোর্ট। এরপর ৯ জুন হাইকোর্টের রায় স্থগিত চেয়ে আবেদন করে রাষ্ট্রপক্ষ। ঐদিন এই আবেদন শুনানির জন্য আপিল বিভাগে পাঠিয়ে দেন চেম্বার আদালত। ২০১৮ সালের ৪ অক্টোবর সরকারি চাকরিতে প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির পদে সরাসরি নিয়োগে বিদ্যমান কোটা পদ্ধতি তুলে দিয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় পরিপত্র জারি করে।

শিক্ষার্থীদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ফিরে যাওয়ার আহ্বান : কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের আদালতের আদেশ অনুযায়ী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ফিরে যাওয়ার আহ্বান জানায় আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক এবং সাবেক সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের।

রাজধানীর ধানমন্ডিতে আওয়ামী লীগ সভাপতির রাজনৈতিক কার্যালয়ে ১০ জুলাই দুপুরে গণমাধ্যম কর্মীদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এ আহ্বান জানান।

তিনি বলেন, “আমরা জেনেছি, আগামী আগস্ট মাসের প্রথম সপ্তাহে আপিল বিভাগে চূড়ান্ত শুনানির মাধ্যমে কোটা সংক্রান্ত বিষয়টির নিষ্পত্তি হবে। আমরা ততদিনে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের ধৈর্যধারণ করতে বলব। একই সঙ্গে মানুষের দুর্ভোগ সৃষ্টি হতে পারে এ ধরনের কর্মসূচি পরিহার করে আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী যার যার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ফিরে যাওয়ার অনুরোধ করব।”

অনেক রাজনৈতিক দল মত দিয়েছে তাদের এই আন্দোলন ন্যায্য, আওয়ামী লীগ কী মনে করছে জানতে চাইলে দলটির সাধারণ সম্পাদক বলেন, “তারা যে বিষয় নিয়ে আন্দোলন করছে, আমরা তো সেই কোটামুক্ত সিদ্ধান্তই নিয়েছিলাম। সরকার এটাই সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। কাজেই আমাদের অবস্থান পরিষ্কার, যখন কোটা নিয়ে এত কিছু তখন কোটার পক্ষে তো আমরা অবস্থান নেইনি। এখন আমাদের অবস্থান হচ্ছে, দেশের সর্বোচ্চ আদালতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। আদালতের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত হবে। আমরা আশা করি, আদালত বাস্তব সম্মত রায় দেবেন।”

বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের আন্দোলনও পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, “আমার বিশ্বাস, অচিরেই এ সমস্যার সমাধান হবে।” (খুলনা গেজেট)

পীর খানজাহান আলী (রহঃ) সেতু অবরোধ : কোটা পদ্ধতি সংস্কারের দাবিতে ‘সর্বাত্মক বাংলা ব্লকেড’ কর্মসূচির অংশ হিসেবে সাচিবুনিয়ায় কিছুক্ষণ অবস্থান নেয়। এরপর পীর খানজাহান আলী (রহঃ) সেতুতে অবস্থান নিয়ে অবরোধ করেন খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীরা। এর ফলে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয় খুলনা-মোংলা-পিরোজপুর-বাগেরহাট ও ঢাকা রুটে।

পূর্ব ঘোষণা অনুযায়ী বেলা সাড়ে ৪টা থেকে কোটা সংস্কারের এক দফা বাস্তবায়নে সেতু অবরোধ করে আন্দোলনকারীরা। আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা ‘একাত্তরের পথ ধর, বাংলা ব্লকেড সফল কর’, ‘ব্লকেড ব্লকেড, বাংলা ব্লকেড’, ‘দফা এক দাবি এক, কোটা নট কাম ব্যাক’, ‘দালালি না রাজপথ, রাজপথ রাজপথ’, ‘আঠারোর হাতিয়ার, গর্জে উঠুক আরেকবার’, ‘কোটা না মেধা, মেধা মেধা’, ‘মুক্তিযুদ্ধের বাংলায়, বৈষম্যের ঠাঁই নাই’ ইত্যাদি স্লোগান দিতে থাকেন। (খুলনা গেজেট ১০ জুলাই ২০২৪)।

শুরুতে চার দফা দাবিতে আন্দোলন করলেও বর্তমানে এক দফা দাবি বাস্তবায়নে অনঢ় শিক্ষার্থীরা। দাবিটি সরকারি চাকরির সব গ্রেডে অযৌক্তিক ও বৈষম্যমূলক কোটা বাতিল করে সংবিধানে উল্লিখিত অনগ্রসর গোষ্ঠী ও বিশেষ চাহিদা সম্পদের জন্য কোটাকে ন্যায্যতার ভিত্তিতে ন্যূনতম পর্যায়ে এনে সংসদে আইন পাস করে কোটা পদ্ধতিকে সংস্কার করাতে হবে।

নগরীতে শিক্ষার্থীদের রাজপথ ও রেলপথ অবরোধ : কোটাবিরোধী আন্দোলন ‘বাংলা ব্লকেড’ কর্মসূচির অংশ হিসেবে খুলনায় রাজপথ ও রেলপথ অবরোধ করে সরকারি বিএল কলেজ ও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের আওতাভুক্ত কলেজের শিক্ষার্থীরা।

সকাল ১০টা থেকে মহানগরীর নতুন রাস্তা এলাকায় রাজপথ ও রেলপথ অবরোধ করে তারা। এসময় তারা কোটাবিরোধী বিভিন্ন স্লোগান দিতে থাকে। চলে বেলা ১২টা ১০ মিনিট পর্যন্ত। এসময় আপিল বিভাগ হাইকোর্টের রায় চার সপ্তাহের জন্য স্থগিত করার সংবাদ শুনে সড়ক ছেড়ে দেয় শিক্ষার্থীরা। এরপর শুরু হয় যানবাহন চলাচল।

হাইকোর্টের আদেশের ফলে মুক্তিযোদ্ধা কোটা বাতিল করে ২০১৮ সালে সরকারের জারি করা পরিপত্র বহাল থাকবে বলে গণমাধ্যমকে জানায় আইনজীবীরা। এ আদেশের খবর শুনে বেলা ১২টা ১৫ মিনিটে সড়ক ছেড়ে দেন শিক্ষার্থীরা।

 

খুলনা গেজেট/এনএম




আরও সংবাদ

খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন