১৯৪৭ সালে ভারতীয় উপমহাদেশের কাঠামো ভেঙ্গে যায়। বৃটিশ শাসনের অবসান হয়। মূলতঃ দু’টি রাষ্ট্রের সৃষ্টি হয়। একদিকে ভারত অন্যদিকে পাকিস্তান। পাকিস্তানের দুটি অংশ পূর্ব ও পশ্চিম। পাকিস্তানের স্বাধীনতা দিবস ১৪ আগস্ট ও ভারতের স্বাধীনতা দিবস ১৫ আগস্ট। পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে একমাত্র ইসলাম ধর্মছাড়া ও অন্য কোন মিল ছিল না। পশ্চিম পাকিস্তানীরা বাঙালির ওপর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্য চাপিয়ে দিত।
পরবর্তীতে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের মধ্যে দিয়ে জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে বাঙালি স্বাধীনতার বীজ বপন করে। শহীদ হন সালাম, বরকত, জব্বার, রফিক ও শফিউর রহমান। খুলনায় ভাষা সৈনিক বিএল কলেজের শিক্ষার্থী আনোয়ার হোসেন সরদার ১৯৫০ সালের ২৪ এপ্রিল রাজশাহীর খাপড়া ওয়ার্ডে পুলিশের গুলিতে শহীদ হন। পরবর্তীতে আলীগড় বিশ^বিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষক এস এম শরীফের নাম অনুসারে গঠিত শরীফ কমিশনের ব্যয়বহুল শিক্ষা ব্যবস্থার বিরুদ্ধে ১৯৬২ সালে শিক্ষা আন্দোলন গড়ে ওঠে। এতে বাবলু, মোস্তফা ও ওয়াজিউল্লাহকে আত্মাহুতি দিতে হয়। ৬৬ সালে ৬ দফা আন্দোলন ছাত্র সমাজকে বেগবান করে। পরবর্তীতে ১৯৬৯’র গণঅভ্যুত্থানে আমানুল্লাহ আসাদ, সার্জেন্ট জহুরুল হক, নবকুমার ইন্সটিটিউটের ছাত্র মতিউর রহমান মল্লিক, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. শামসুদ্দোহার আত্মাহুতির মধ্য দিয়ে জেঃ আইয়ুব শাহীর পতন হয়। ১৯৬৯ সালে প্রেসিডেন্ট পদ থেকে জে. আইয়ুব খান পদত্যাগ করেন। ঐ বছরের ১ এপ্রিল তিনি সোয়াতের উদ্দেশ্যে রাওয়ালপিন্ডি ত্যাগ করেন। প্রধান সেনাপতি জে. ইয়াহিয়া খান রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল করেন। তিনি একই সাথে প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন করেন।
বাঙালির দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৭০ সালের ৭ ডিসেম্বর জাতীয় পরিষদের ও ১৭ ডিসেম্বর প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন লাভ করে। পাকিস্তানী শাসক গোষ্ঠী ক্ষমতা হস্তান্তরের তালবাহানা শুরু করে। ৭১ এর ৩ মার্চ থেকে শুরু হয় অসহযোগ আন্দোলন। বাঙালির কন্ঠ স্তব্দ করার জন্য ২৫ মার্চ পাকিস্তানী বাহিনী গণহত্যা চালায়। ফলে মুক্তিযুদ্ধ অনিবার্য হয়ে ওঠে। মুক্তিযুদ্ধ বাঙালি জাতির অমর চেতনা এবং প্রেরণার কেন্দ্র স্থল। সাড়ে ৭ কোটি বাঙালির কন্ঠে শ্লোগান ছিল স্বাধীনতা। এ দেশের মুক্তিকামী মানুষ স্বায়ত্বশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য ৯ মাস স্বশস্ত্র সংগ্রাম করে। মুক্তিযুদ্ধ শুধুমাত্র দু’পক্ষের যুদ্ধ ছিল না। বাঙালির জাতির ভাষা, সংস্কৃতি, রাজনৈতিক অধিকার, ভোটাধিকার, ন্যায় বিচার, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা, অন্ন-বস্ত্র-বাসস্থান-চিকিৎসা-শিক্ষা ও মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্যেই ছিল মুক্তিযুদ্ধ।
১৬ ডিসেম্বরের বিজয় ভোরের আলোর মত স্পষ্ট। পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে শুধুমাত্র ইসলাম ধর্মের ক্ষেত্রে মিল ছিল। তারা বাঙালির ওপর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্য চাপিয়ে দিত। পশ্চিম পাকিস্তানের হাতে ছিল সকল ধরনের ক্ষমতা, পূর্বপাকিস্তানের মানুষ নিজেদের ভাগ্য নির্ধারণ এবং মতামত প্রকাশের সুযোগ পেত না। বাঙালি প্রতিনিয়ত উপেক্ষিত, নির্যাতিত এবং শোষিত হচ্ছিল। পূর্ব পাকিস্তানকে তারা অঙ্গরাজ্যের বেশি মনে করতেন না। চব্বিশ বছরের পুঞ্জিভূত ক্ষোভ থেকে বাঙালি ’৭১ সালে স্বশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে জয়ী হয়।
সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশ ১৯৭২ সালে সরকারী চাকরির ক্ষেত্রে কোটা ব্যবস্থার প্রবর্তন হয়। সে সময়ে মেধা তালিকায় ৩০ শতাংশ বরাদ্দ রেখে ৪০ শতাংশ জেলা ভিত্তিক, ৩০ শতাংশ মুক্তিযোদ্ধা ও তাদের পরিবারের সদস্যদের জন্য এবং ১০ শতাংশ মুক্তিযুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্থ নারীদের জন্য বরাদ্দ করা হয়। পরবর্তী সময়ে বেশ কয়েকবার এ কোটা ব্যবস্থা সংস্কার করা হয় (উবায়দুল্লাহ শাকির রচিত চব্বিশের স্বাধীনতা)।
২০১৮ সালে জানুয়ারীতে কোটা সংস্কারের দাবিতে চাকরি প্রত্যাশী ও সাধারণ শিক্ষার্থীরা ধারাবাহিকভাবে বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করেন। আন্দোলনের অংশ হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীরা মানববন্ধন আয়োজন করে। বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার পরিষদ নামক সংগঠন এ আন্দোলনের সূচনা করে। তাদের আন্দোলনের পক্ষে ব্যাপক জনমত গড়ে ওঠে। ৩১ জানুয়ারী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ও দুই জন সাংবাদিক কোটা পদ্ধতি বাতিল করে সংস্কারের দাবিতে হাইকোর্টে রীট করেন। সরকারী চাকুরীতে ৫৬ শতাংশ কোটা বিদ্যমান। যা বাংলাদেশ সংবিধানের ১৯, ২৮, ২৯, ২৯/৩ অনুচ্ছেদের সাথে সাংঘর্ষিক। পরবর্তীতে ১৪ ফ্রেব্রুয়ারি রাজধানী শাহবাগে পাবলিক লাইব্রেরীর সামনে বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ নামে কমিটি গঠন করা হয়। ১৬ ফেব্রুয়ারী শিক্ষার্থীরা শাহবাগে ১০ দফা দাবিতে মানববন্ধনের কর্মসূচির ঘোষণা দিলেও তা একদিন পিছিয়ে যায়। কোটা সংস্কারের লক্ষ্যে ১০ দফা দাবি উত্থাপন করলেও শিক্ষার্থীরা পরবর্তীতে মূলত ৫ দফা দাবিতে আন্দোলন গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নেয়। ২৫ ফেব্রুয়ারী পুনরায় দেশের বিভিন্ন স্থানে মানববন্ধন কর্মসূচি পালিত হয়।
লাগাতার আন্দোলনের ফলশ্রুতিতে আওয়ামী লীগ সরকারের জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ২০১৮ সালের ৪ অক্টোবর প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির সরকারি চাকরিতে কোটা প্রথা বাতিল করে। এ বিষয়ে সরকার পরিপত্র জারি করে দেশবাসীকে অবহিত করে। সেই পরিপত্র বহাল চেয়ে জুলাই আগস্টে আবারও আন্দোলন করে শিক্ষার্থীরা। তৎকালীন সময় বিদ্যমান ৫৬ শতাংশ কোটা বাতিলে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের ফলে কোটা বাতিল করে পরিপত্র জারি করা হয়।
শিক্ষার্থীদের তীব্র আন্দোলনে ২০১৮ সালের ৩ অক্টোবর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে কোটা বাতিলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
একদিন পর ৪ অক্টোবর জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় এ সংক্রান্ত পরিপত্র জারি করে।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সেই সময়ের সচিব ফয়েজ আহম্মদের সই করা ওই পরিপত্রে বলা হয়, সরকার সব সরকারি দপ্তর, স্বায়ত্তশাসিত/আধা-স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান এবং বিভিন্ন করপোরেশনের চাকরিতে সরাসরি নিয়োগের ক্ষেত্রে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের ১৭/০৩/১৯৯৭ তারিখের সম(বিধি-১)এস-৮/৯৫(অংশ-২)-৫৬(৫০০) নম্বর স্মারকে উল্লিখিত কোটা পদ্ধতি নিম্নোক্তভাবে সংশোধন করে।
(ক) নবম গ্রেড (পূর্বতন প্রথম শ্রেণি) এবং ১০ম-১৩তম গ্রেডের (পূর্বতন দ্বিতীয় শ্রেণি) পদে সরাসরি নিয়োগের ক্ষেত্রে মেধার ভিত্তিতে নিয়োগ দেওয়া হবে; এবং
(খ) নবম গ্রেড (পূর্বতন প্রথম শ্রেণি) এবং ১০ম-১৩তম গ্রেডের (পূর্বতন দ্বিতীয় শ্রেণি) পদে সরাসরি নিয়োগের ক্ষেত্রে বিদ্যমান কোটা পদ্ধতি বাতিল করা হলো। এটি অবিলম্বে কার্যকর হবে।
কোটা সংস্কারের দীর্ঘ আন্দোলনের ওই সময় সরকারি চাকরিতে নবম থেকে ১৩তম গ্রেডে নিয়োগের ক্ষেত্রে কোটা তুলে দিয়ে মেধার ভিত্তিতে নিয়োগে সিদ্ধান্ত নেয় সরকার।
২০১৮ সালের ৩ অক্টোবর সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার নিয়মিত বৈঠকে কোটা পর্যালোচনা কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
মন্ত্রিসভার ওই বৈঠক শেষে সচিবালয়ে ব্রিফিংয়ে তৎকালীন মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ শফিউল আলম বলেন, প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির পদে কোটা থাকবে না।
সরকারি চাকরিতে কোটা পদ্ধতি বাতিলের দাবিতে আন্দোলনের মধ্যে ২০১৮ সালের ২ জুলাই মন্ত্রিপরিষদ সচিবকে প্রধান করে সাত সদস্যের কমিটি গঠন করে সরকার। প্রাথমিকভাবে ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হলেও পরে আরও ৯০ কার্যদিবস সময় পায় এ কমিটি।
এরপর ১৭ সেপ্টেম্বর কোটা সংস্কার বা পর্যালোচনা কমিটির প্রধান মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ শফিউল আলম প্রধানমন্ত্রীর কাছে কোটা তুলে দেওয়ার সুপারিশ করে প্রতিবেদন জমা দেন।
কমিটির প্রতিবেদন ওই সময় মন্ত্রিসভার বৈঠকে উপস্থাপন করা হয় জানিয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, প্রজাতন্ত্রের চাকরিতে প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণিতে কোনো কোটা পদ্ধতি থাকবে না। সরাসরি মেধার ভিত্তিতে নিয়োগ হবে।
তবে সময়ের প্রেক্ষাপটে কোনো অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর জন্য কোটার প্রয়োজন দেখা দিলে বা কোটার অপরিহার্যতা দেখা দিলে সরকার ব্যবস্থা নিতে পারবে বলে জানান মন্ত্রিপরিষদ সচিব। তিনি আরও বলেন, তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণিতে যে ব্যবস্থা আছে তা বহাল আছে।
সরকারি চাকরিতে কোটা ব্যবস্থা দীর্ঘ দিনের। ১৯৭২ সালের ৫ নভেম্বর এক নির্বাহী আদেশে সরকারি, আধা-সরকারি, প্রতিরক্ষা এবং জাতীয়করণকৃত প্রতিষ্ঠানে জেলা ও জনসংখ্যার ভিত্তিতে ৩০ শতাংশ মুক্তিযোদ্ধা কোটা এবং ক্ষতিগ্রস্ত নারীদের জন্য ১০ শতাংশ কোটা পদ্ধতি প্রবর্তন করা হয়। পরে বিভিন্ন সময়ে এ কোটা পদ্ধতির সংস্কার, পরিমার্জন ও পরিবর্তন করেছে সরকার। (বাংলা নিউজ চব্বিশ, ৮ জুলাই ২০২৪)
সরকারি চাকরিতে প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে মুক্তিযোদ্ধার সন্তান ও নাতি-নাতনি ৩০ শতাংশ, প্রতিবন্ধী ১ শতাংশ, নারী ১০ শতাংশ, পশ্চাৎপদ জেলাগুলোর জন্য কোটা ১০ শতাংশ, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ৫ শতাংশ কোটা পদ্ধতি সংরক্ষিত ছিল। সব মিলিয়ে শতকরা ৫৬ ভাগ কোটা ছিল।
২০১৮ সালের পরিপত্রে কোটা বাতিল হয়। ২০২১ সালের ৬ ডিসেম্বর সেই পরিপত্রে মুক্তিযোদ্ধা কোটা বাতিলের অংশটিকে চ্যালেঞ্জ করে ৭ জন মুক্তিযোদ্ধার সন্তান হাইকোর্টে রিট করেন।
২০২৪ সালের ৫ জুন বিচারপতি কে এম কামরুল কাদের ও বিচারপতি খিজির হায়াতের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোট বেঞ্চ এ প্রজ্ঞাপনের একাংশ বাতিল করে রায় দেয়। ২০১৮ সালের কোটা বাতিল করে জারি করা প্রজ্ঞাপনের একটি অংশ (মুক্তিযোদ্ধা কোটা) অবৈধ ঘোষনা করেন। এর মাধ্যমে সরকারী চাকুরীতে ৩০ শতাংশ মুক্তিযোদ্ধা কোটা ফিরে আসার আশংকা তৈরী হয়। ২০১৮ সালের আগে সরকারী চাকুরীতে ৫৬ শতাংশ কোটা ছিল। শিক্ষার্থীরা তখন কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলন করে। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জেদের বসে পুরো কোটাই বাতিল করেন (আসিফ হাওলাদার রচিত প্রবন্ধ সবাইকে একত্র করতে পেরেছিল বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলন, প্রথম আলো, ৭ নভেম্বর ২০২৪)। তারপর দিন ৬ জুন ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা হাইকোর্টের দেয়া রায় বাতিলের দাবিতে বিক্ষোভ করে।
৯ জুন
হাইকোর্টের রায় স্থগিত চেয়ে চেম্বার আদালতে আবেদন করলে বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম হাইকোর্টের রায় বহাল রেখে আপিল বিভাগে নিয়মিত বেঞ্চে শুনানীর জন্য পাঠিয়ে দেন। কোটা ব্যবস্থা পুনবর্হালের প্রতিবাদে আবারও বিক্ষোভ সমাবেশ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা।
খুলনা গেজেট/এনএম

