রবিবার । ২৮শে জুন, ২০২৬ । ১৪ই আষাঢ়, ১৪৩৩

এবার আদ-দ্বীন হাসপাতাল নিয়ে সংসদে মুখ খুললেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী

গেজেট প্রতিবেদন

ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় আদ্-দ্বীন হাসপাতালের লাইসেন্স স্থগিত প্রসঙ্গে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেছেন, হাসপাতালটিতে অক্সিজেনের অভাব ও অবহেলার কারণে নবজাতকদের মৃত্যু হয়েছে। এজন্য তাই হাসপাতালগুলোকে শৃঙ্খলার মধ্যে আনতে সরকার ব্যবস্থা নিয়েছে। এই অবস্থার জন্য মালিকপক্ষকে দায়ী করে তিনি বলেন, এই কাজ করেছে মালিক। একটা দিন দেখতে যায়নি। মালিকের অবহেলার কারণে, তার একগুঁয়েমির কারণে সেই পরিচালনা পর্ষদ পরিবর্তন করে তার স্ত্রীকে চিফ এক্সিকিউটিভ করা হয়েছে।

রবিবার (২৮ জুন) জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে এসব কথা বলেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী।

রাজধানীর মগবাজারে আদ্-দ্বীন হাসপাতালে গত ২৭ মে ভোরে ছয় নবজাতকের মৃত্যু হয়। সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, হাসপাতালের দ্বিতীয় তলার পোস্ট-অপারেটিভ ওয়ার্ডে এ ঘটনা ঘটে; পরদিন অবহেলার অভিযোগে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে আসামি করে মামলা হয়।

আদ-দ্বীন হাসপাতাল ইস্যুতে বিরোধী দলীয় সংসদ সদস্যদের সমালোচনার জবাবে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সাখাওয়াত হোসেন বলেন, “আজকে অনেক সংসদ সদস্য আদ্-দ্বীন নিয়ে কথা বলেছেন। বলেছেন, ২০০ থেকে ২৫০ টাকায় তারা ডায়ালাইসিস করায়, সত্য।

এরপর তিনি বলেন, “মাথাব্যথায় কি মাথা কেটে ফেলা যায়? না, কাটা যায় না। তবে যারা মাথা কাটে, তাদেরকে বিচারের আওতায় আনতে হবে না কি? অস্বীকার করবেন? করতে পারেন না। আনতে হবে।

ইউনাইটেড হাসপাতাল ও বার্ন ইউনিটে আগুনের ঘটনার সঙ্গে আদ্-দ্বীন হাসপাতালের ঘটনার তুলনার জবাবও দেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, উনারা কোভিড টাইমে ইউনাইটেড হসপিটালে আগুন লেগে ছয়জন মারা গেছে, তখন তো ইউনাইটেডের লাইসেন্স সরকার বন্ধ করেনি, এটা বলেছেন। বার্ন ইউনিটের আগুনের কথা বলেছেন। আমি তাদের সঙ্গে একমত।

তিনি বলেন, ইউনাইটেড এবং বার্ন ইউনিটের ঘটনা ছিল দুর্ঘটনা, বিদ্যুতের কারণে। কিন্তু আদ্-দ্বীনে যে ঘটনা ঘটেছে..। শিশুরা যখন বাঁচার জন্য ছটফট করছিল, তখন ওয়ার্ডে অক্সিজেন ছিল না। ছয়টা শিশু যখন হাত-পা বাইরে বের করে বাঁচার জন্য কাঁদতেছিল, সেই হাইপারক্যাপনিয়ায়, এসি বন্ধ করে দিয়েছে, ঘরে জানালা নেই, কাচ বন্ধ, কোনো অক্সিজেন নেই। ১৬-১৭ জন মানুষ, মায়েরা কাঁদছে, ছোটাছুটি করছে; একজন ডাক্তার আসেনি। সেই বাচ্চাগুলি ছটফট করতে করতে কার্বন ডাই-অক্সাইডের জন্য তারা মৃত্যুর কোলে পড়েছে।”

আদ-দ্বীন কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে অবহেলার অভিযোগ এনে মন্ত্রী বলেন, মালিক দেখতে পর্যন্ত যাননি। কিন্তু ঘটনার পরের দিন আমি গিয়েছি। আমি দুইজন ডাক্তারের সাথে কথা বলেছি। তারা একমত হয়েছেন, এটা অবহেলার কারণে, অক্সিজেনের অভাবে বাচ্চাগুলি মারা গেছে।

এ অবস্থায় সরকার বসে থাকতে পারে না মন্তব্য করে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, আমরা কি বসে থাকব, মাননীয় স্পিকার? আমরা সব হাসপাতালকে শৃঙ্খলার মধ্যে আনতে চাই। সবার আগে বাংলাদেশ, সবার আগে দেশের ১৮ কোটি মানুষ।

মানুষের স্বাস্থ্য ও জীবনের মূল্য সরকারকে দেখতে হবে মন্তব্য করে তিনি বলেন, সে বাচ্চাগুলি মারা গেল, কয়েকটা টাকা দেওয়ার ঘোষণা করেছে; তাও পুরো দেয়নি। ওরা আমার কাছে এসেছে।

বিরোধী দলের সমালোচনা করে সাখাওয়াত বলেন, সরকার মাত্র লাইসেন্স স্থগিত করেছে, হাসপাতাল বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়নি। আপনারা প্রতিটি জিনিসকে কেন নিজেদের দলীয় আদর্শের সাথে একীভূত করেন? দলীয় আদর্শ দিয়ে দেশের বিরোধিতা করা যায় না, যা করেছেন ৭১ সালে।”

নিজেকে মুক্তিযোদ্ধা উল্লেখ করে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, “আমি একজন মুক্তিযোদ্ধা। আই মাস্ট ডাই ফর মাই নেশন। আমি প্রধানমন্ত্রীর নিয়োজিত স্বাস্থ্যমন্ত্রী। আই মাস্ট লুক আফটার দ্য ওয়েলফেয়ার অব হেলথ অব মাই পিপল। আমার বাচ্চাগুলো মরে যাবে বিনা চিকিৎসায়, দ্যাট ক্যান্ট বি।”

সাখাওয়াত বলেন, “যেখানে হাসপাতালের অনুমতি নিয়েছে, সেই হাসপাতালের ভেতরে ছয় তলার মধ্যে একটা বেকারি কারখানা করেছে। গন্ধে ঢোকা যায় না। এমন বেকারি, এমন স্তূপ, প্লাস্টিকের বর্জ্য, একটা আগুন লাগলে একটা রোগী, একটা অভিভাবক, একটা অ্যাটেনডেন্ট বাঁচতে পারবে না।”

বিরোধী দলের উদ্দেশে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, “তারপরও আপনারা বলবেন, ওরা ঠিক, আমরা ঠিক না? মাথা তো কাটতে বলিনি, মাত্র লাইসেন্স স্থগিত করেছি। সরকার দেখবে। কিন্তু এটা নিয়ে আপনারা দলীয়করণ করছেন।

চিকিৎসা ব্যয় বৃদ্ধির বিষয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করে বাজেট আলোচনায় অংশ নিয়ে স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ডা. এম এ মুহিত বলেন, বাংলাদেশে স্বাস্থ্যসেবায় মোট ব্যয়ের প্রায় ৮০ শতাংশই রোগীদের নিজেদের পকেট থেকে বহন করতে হয়। তিনি জানান, থাইল্যান্ডে এই হার মাত্র ১০ শতাংশ এবং মালদ্বীপে প্রায় ১৮ শতাংশ।

এম এ মুহিত বলেন, আমাদের বিরোধী দল মাঝেমধ্যেই সংস্কারের কথা বলেন, জুলাই সনদের কথা বলেন। কিন্তু তাঁরা শুধু সেই সংস্কারের কথা বলেন, যে সংস্কার তাঁদের ক্ষমতার ভাগ দেবে। তাঁরা স্বাস্থ্য খাতের সংস্কার নিয়ে আজ পর্যন্ত একদিনও কথা বলেননি। একটি স্বাস্থ্য সংস্কার কমিশন হয়েছিল। তারা অনেক চিন্তাভাবনা করে অনেক সুপারিশ দিয়েছে। আমি খুশি হতাম যদি আমাদের বিরোধী দল সেই স্বাস্থ্য খাত সংস্কার কমিশনের রিপোর্ট নিয়ে এখানে আলোচনা করতেন।

প্রতিমন্ত্রী বলেন, এই বাজেটের লক্ষ্য হলো ভেঙে পড়া স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে পুনর্গঠন করা এবং এমন একটি সমন্বিত স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা গড়ে তোলা, যেখানে আর্থিক অবস্থান নির্বিশেষে সবাই বিনামূল্যে ও সহজে চিকিৎসাসেবা পাবেন।

তিনি স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করা, স্বাস্থ্যসেবা বিকেন্দ্রীকরণ এবং স্বাস্থ্য খাতে ক্রয় প্রক্রিয়ায় আরও বেশি স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার ওপর জোর দেন। এম এ মুহিত বলেন, ‘আমরা এমন একটি স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তুলব, যেখানে শহর ও গ্রামের মানুষ একই মানের স্বাস্থ্যসেবা পাবে। আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থার ভিত্তি হবে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা।’

তিনি বলেন, স্বাস্থ্য খাতের বাজেট এবার ১০০ শতাংশ বৃদ্ধি করা হয়েছে। তাই সরকার চিকিৎসার চেয়ে রোগ প্রতিরোধে বেশি গুরুত্ব দেবে। উন্নত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে আমরা একটি কার্যকর রেফারেল নেটওয়ার্ক গড়ে তুলব।

খুলনা গেজেট/এএজে




আরও সংবাদ

খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন