সোমবার । ২২শে জুন, ২০২৬ । ৮ই আষাঢ়, ১৪৩৩

প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে হান্নান মাসউদের বক্তব্যে উত্তপ্ত সংসদ

গেজেট প্রতিবেদন

প্রধানমন্ত্রী ‘অসত্য’ বক্তব্য দিয়েছেন বলে সংসদ দাবি করেছেন এনসিপির সংসদ সদস্য হান্নান মাসউদ। বিষয়টির তীব্র বিরোধিতা করেছেন সরকারি দল। এর জের ধরে সংসদে সরকারি ও বিরোধী দলের মধ্যে বাহাস হয়েছে। হান্নান মাসউদের বক্তব্যকে অসত্য উল্লেখ করে তা এক্সপাঞ্জ করার দাবি করে সরকারি দল। অপরদিকে বক্তব্যের কোন অংশটি অসত্য তা সুনির্দিষ্ট করে করে উপস্থাপনের দাবি তুলেছে বিরোধী দল।

বিরোধী দল বলেছে, ঢালাওভাবে অসত্য বক্তব্যের কথা বলা হয়েছে। তথ্য উপাত্ত দিয়ে বলতে হবে কোন ইনফরমেশনটা ভুল ছিল। পরে বৈঠকে সভাপতির দায়িত্বে থাকা ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল এ বিষয় বিচার বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা জানান।

রবিবার (২১ জুন) জাতীয় সংসদে ২০২৬–২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর আলোচনার এক পর্যায়ে অনির্ধারিত বিতর্ক হয়।

বাজেট আলোচনায় আব্দুল হান্নান মাসউদ বলেন, প্রধানমন্ত্রী আজকে এখানে নেই। উনি যখন বিভিন্ন ভাষণে গিয়ে অসত্য তথ্য দিয়ে বলেন যে, বিরোধী দল মিছিল করতেছে মদের দাম কেন বৃদ্ধি করা হয়েছে। কেন সিগারেটের দাম বৃদ্ধি করা হয়েছে, এরকম অসত্য তথ্য দিয়ে যখন প্রধানমন্ত্রী বক্তব্য দেন, আমরা খুবই আশাহত হই।

এ সময় সরকারি দলের সংসদ সদস্যরা হইচই করে এর প্রতিবাদ জানান। হান্নান মাসউদ আরও বলেন, আমরা আশাহত হই, যখন ঋণ নিয়ে কথা বলতে গিয়ে, সংসদে যখন আমরা ঋণ নিয়ে কথা বলতে চাই, ব্যাংকের ঋণ নিয়ে, ইসলাম ব্যাংক দখল নিয়ে যখন আমরা কথা বলতে চাই, তখন প্রধানমন্ত্রী দাঁড়িয়ে যখন বলে আপনারা সবাই জমিদার যারা ঋণ নেন নাই, এর মধ্য দিয়ে মূলত প্রধানমন্ত্রী ঋণখেলাপিদেরকে উৎসাহিত করেন।

চব্বিশ পরবর্তী সংসদে খ্যাতির বিড়ম্বনা দেখা যাচ্ছে উল্লেখ করে হান্নান মাসউদ বলেন, আমরা একসময় যেদিকে তাকিয়েছি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নাম বলেন- বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম বলেন- রাস্তাঘাটের নাম বলেন- সব শেখ মুজিবুর রহমানের নামে শেখ মুজিবুর রহমান মৃত ছিলেন। উনি হয়তো জানতেন না। উনার নামে সব জায়গায় এত কিছুর নামকরণ করা হয়েছে। কিন্তু আমাদের এই সংসদেও একজন প্রতিমন্ত্রী সেই খ্যাতির নাম আমরা দেখতে পাচ্ছি। উনি কিছুই জানেন না, কিন্তু ১০–১২টা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নাম উনার পরিবারের নামে হয়ে যায়। রাস্তাঘাটের নাম হয়ে যায় এবং এমনকি ইউনিয়নের নাম পর্যন্ত হয়ে যায়। এটা একটা মিরাকল।

তিনি বলেন, আমরা এমন এক মিরাকল সংসদে আছি যে সংসদ আমরা ফ্যাসিবাদকে উৎখাত করে আমরা এই সংসদে এসেছি। সকলেই কম বেশি নির্যাতিত হয়েছে। কিন্তু আমরা দেখতে পাচ্ছি যে সীমান্ত নিয়ে ভারতের দালালি যেভাবে হচ্ছে, ভারতের দালালি যেভাবে আওয়ামী সরকার করত, ঠিক একইভাবে আমাদের এই সংসদের বিভিন্ন মন্ত্রীরাও একই ধরনের ভারতীয় ভাষায় কথা বলে এবং ফ্যাসিবাসী স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যেভাবে বক্তব্য দিতেন আমাদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী একইভাবে বক্তব্য দিচ্ছেন যে সকল সীমান্ত হত্যাকে সীমান্ত হত্যা বলা যাবে না। আমরা বলছি, প্রত্যেকটা সীমান্ত হত্যাই হত্যা। প্রত্যেকটা সীমান্ত হত্যাই আমাদের সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকি।’

এনসিপির সংসদ সদস্য হান্নান মাসউদের বক্তব্যের কিছু অংশ নিয়ে আপত্তি জানান বিএনপির সংসদ সদস্য জয়নাল আবদিন ফারুক। বক্তব্য এক্সপাঞ্জ করার দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, সংসদে কোন অসত্য বাক্য উত্থাপন করা হোক বা এমন কথা বলা না হোক যেই কথায় আমাদের মানসম্মান হানি হয়, সংসদ নেতাকে কটূক্তি করা হয়।

এরপর বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম বলেন, এখানে সংসদ সদস্য দাঁড়ালেন তিনি যদি স্পেসিফিকালি বলতেন কোন তথ্যটা এখানে অসত্য। উনি তো উনার বক্তব্যের প্রেক্ষিতে বলেছেন, উনি কিন্তু ঢালাওভাবে বলে গেলেন যে বক্তব্য অসত্য কথা বলা হয়েছে। উনাকে তো ফ্যাকচুয়ালি বলতে হবে কোন ইনফরমেশনটা এখানে ভুল ছিল।

নাহিদ বলেন, প্রধানমন্ত্রীও ভুল করতে পারেন। প্রধানমন্ত্রী এই সংসদে দাঁড়িয়ে বক্তব্য দেওয়ার সময় স্লিপ অব টাং হয়েছে, উনি তার ভুল সুধরে দিয়েছেন। উনার বক্তব্যের সমালোচনা করার অধিকারও বিরোধী দলের আছে। ফলে অবশ্যই উনাকে আমরা সম্মান করি। উনি জিয়াউর রহমানের সন্তান, খালেদা জিয়ার সন্তান, প্রাইম মিনিস্টার, সংসদ নেতা। কিন্তু তার মানে এই না যে তাকে নিয়ে কোন কথাই বলা যাবে না। তার কোন বক্তব্যের সমালোচনা করা যাবে না। আমরা তো গণতন্ত্রের দিকে যেতে চাচ্ছি। আমরা কোন ফ্যাসিবাদের দিকে আবার যেতে চাচ্ছি না।’

এরপর স্থানীয় সরকার মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, বিরোধী দলের চিফ হুইপ যা বলেছেন সেটা সঠিক নয়। বিরোধী দলের সদস্য (হান্নান মাসউদ) সুনির্দিষ্টভাবে বলেছেন যে সংসদ নেতা, প্রধানমন্ত্রী অসত্য বক্তব্য দিয়েছেন।

এ সময় বিরোধী দল হইচই শুরু করলে মির্জা ফখরুল বলেন, আমাদের বলতে দিন। আপনার ফ্যাসিস্টের কথা বলেন ফ্যাসিস্ট আচরণ তো আপনাদের কাছ থেকে আসছে। আমাদেরকে বলতে দিতে হবে। আপনারা যখন কথা বলেছেন আমরা কেউ কথা বলিনি।

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরও হান্নান মাসউদের বক্তব্যে যে অংশটুকু অসত্য আছে তা এক্সপাঞ্জ করার দাবি জানান।

এ সময় হান্নান মাসউদ কিছু বলতে চাইলেও ডেপুটি স্পিকার তাঁকে ফ্লোর দেননি। তারপরও তিনি মাইক ছাড়া কথা বলতে থাকলে ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল বলেন, এইভাবে সংসদে যখন খুশি তখন দাঁড়াবেন, ইজ নট নরমস, প্লিজ টেক ইউর সিট, মিস্টার হান্নান মাসুদ।

ডেপুটি স্পিকার বলেন, ‘হান্নান মাসুদ, দয়া করে বসুন এটা শাহবাগ চত্বর নয়। জাতীয় সংসদ।’

এ পর্যায়ে বিরোধী দলীয় নেতা শফিকুর রহমান বলেন, আমি আপনাকে অনুরোধ করব বাইরের কোন বিষয়কে টেনে এখানে এনে এক্সপাঞ্জ করা বা বক্তব্য দেওয়া কোনটাই যেন এলাও না করেন।

শফিকুর রহমান বলেন, বাইরের জবাব বাইরে দিব, সংসদের জবাব সংসদে হোক। তবে এটা সত্য, এটা অসত্য, এই ঝগড়ায় যদি আমরা যাই, তাইলে অনেক কিছু আমাদের জন্য হয়তোবা লজ্জাজনক হয়ে যাবে।

পরে ডেপুটি স্পিকার সব কিছু যাছাই করে দেখার কথা বলেন।

খুলনা গেজেট/এএজে




আরও সংবাদ

খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন