মঙ্গলবার । ২৬শে মে, ২০২৬ । ১২ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩

পশ্চিমবঙ্গের চালু হলো ‘আটক শিবির’, একদিনে আটক ১২ ‘বাংলাদেশী’

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারের নির্দেশনা জারির ২৪ ঘণ্টার মধ্যে পশ্চিমবঙ্গের জেলায় জেলায় চালু হয়ে গেল ‘আটক শিবির’ বা ‘হোল্ডিং সেন্টার’। একদিন যেতে না যেতেই সেই হোল্ডিং সেন্টারে আটক করা হলো ১২ জন সন্দেহভাজন বাংলাদেশি নাগরিককে। পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ ও মালদা জেলার দুই হোল্ডিং সেন্টারে একদিনেই ঠাঁই হয়েছে সন্দেহভাজন ১২ বাংলাদেশী নাগরিকের।

পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির সরকার গঠনের ২ সপ্তাহের মাথায়, ভারতে অবৈধ অনুপ্রবেশকারী বাংলাদেশী ও রোহিঙ্গা নাগরিকদের রাখার জন্য জেলায় জেলায় হোল্ডিং সেন্টার তৈরির নির্দেশ দিয়েছিল স্বরাষ্ট্র দপ্তর।

পশ্চিমবঙ্গে অবৈধ অনুপ্রবেশের অভিযোগে আটক হওয়া বাংলাদেশি এবং রোহিঙ্গা নাগরিকদের প্রত্যর্পণ বা নিজেদের দেশে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া সুনির্দিষ্ট করতে জেলায় ‘হোল্ডিং সেন্টার’ তৈরির নির্দেশ দিয়েছে শুভেন্দু অধিকারীর বিজেপি সরকার। গত ২৩ মে রাইটার্স বিল্ডিংয়ের ফরেনার্স ব্রাঞ্চ থেকে রাজ্যের সমস্ত জেলাশাসকের কাছে এই সংক্রান্ত একটি জরুরি নির্দেশিকা পাঠানো হয়েছে। এরপরেই শুরু হয়েছে হোল্ডিং সেন্টার চালু ও ধরপাকড়ের প্রক্রিয়া।

মালদা জেলার ইংরেজ বাজারের হোল্ডিং সেন্টারে রাখা হয়েছে ৯ বাংলাদেশিকে। ধৃত সন্দেহভাজন বাংলাদেশির মধ্যে ৩ নারীসহ ৬ জন নাবালক ও নাবালিকা আছে। জানা গিয়েছে এই ৯ বাংলাদেশিকে গাজোল মহকুমার পান্ডুয়া এলাকা থেকে থেকে ধরে আনা হয়েছে।

পুলিশ সূত্রে জানা যায়, আটকদের জিজ্ঞাসাবাদ করার পর দেখা যায় তারা অবৈধ অনুপ্রবেশকারী। আটকরা স্বীকার করেন, তাদের বাড়ি বাংলাদেশের রংপুর ডিভিশনের মিঠাপুকুর থানা এলাকার একটি গ্রামে। তাদের মধ্যে তিনজন প্রাপ্তবয়স্ক নারী তিনজন নাবালক এবং তিন জন নাবালিকা রয়েছে। রবিবার বিকাল নাগাদ তাদের আটক করে পুলিশ। এরপরেই তাদের হোল্ডিং সেন্টারে নিয়ে আসা হয়। প্রাথমিকভাবে জানা গিয়েছে ধৃতরা দীর্ঘদিন ধরে পান্ডুয়াতে ছিল। দক্ষিণ দিনাজপুরের হিলি সীমান্ত দিয়ে তারা এ রাজ্যে অনুপ্রবেশ করেছিল।

হোল্ডিং সেন্টারের নিরাপত্তায় মালদায় নিযুক্ত করা হয়েছে ১২ জন সশস্ত্র পুলিশ, তিন জন সিভিল ডিফেন্সের কর্মী, তিনজন সিভিক ভলান্টিয়ার, এছাড়াও বন্দিদের খাওয়া দাওয়ার ব্যবস্থার জন্য নিয়োগ করা হয়েছে তিনজন রাধুনীকে।

অন্যদিকে মুর্শিদাবাদের লালগোলার পদ্মাভবনের তিনতলায় যে হোল্ডিং সেন্টারটি গড়ে উঠেছে, সেখানে রয়েছেন ৩ জন বাংলাদেশি পুরুষ। তাদের বয়স ৩০ থেকে ৪০ বছরের মধ্যে।

আটককৃত ব্যক্তিদের নাম মহম্মদ সেলিম, মহম্মদ রুবেল ও শরিফুল ইসলাম।

পুলিশ সূত্রে খবর, ভারতে থাকার কোনও বৈধ নথি তাদের কাছে মেলেনি।তবে তাদের বাংলাদেশী পরিচয়ের বিষয়ে বিস্তারিত পরিচয় বা অন্য কোনও তথ্য এখনও জানা যায়নি।

এ প্রসঙ্গে উত্তর মালদার বিজেপি সাংসদ খগেন মুর্মু বলেন, ‘আমাদের ভারতীয় নাগরিক নন, এরকম যে সমস্ত ব্যক্তি আছেন, তাদের আমাদের দেশ থেকে তাদের নিজের দেশে ফিরতে হবে। এটা তো খুবই জরুরি। প্রথম হচ্ছে, আমাদের রাজ্যকে সুরক্ষিত করব। আমাদের দেশকে সুরক্ষিত করব। যা এতদিন ধরে তৃণমূল কংগ্রেস…আমাদের রাজ্যটাকে রোহিঙ্গাদের, সন্ত্রাসবাদীদের, জেহাদিদের একটা করিডর হিসাবে ব্যবহার করার সুযোগ করে দিয়েছে।’

তৃণমূল কংগ্রেস নেতা কৃষ্ণেন্দু নারায়ণ চৌধুরীর বক্তব্য, কেন্দ্রীয় সরকার এবিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতেই পারেন। কিন্তু, সাধারণ ভারতীয়রা যাতে দমন পীড়নের শিকার না হন তাও দেখা উচিত।

এদিকে রাজ্যে প্রশাসন সূত্রে খবর, জেলায় জেলায় জেলাশাসকের দপ্তর সংলগ্ন এলাকায় হোল্ডিং সেন্টার করা হচ্ছে। যারা বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী বলে চিহ্নিত হয়েছেন, তাদের এখানে এনে রাখা হবে। ধীরে ধীরে তাদের ডিপোর্টে করার ব্যবস্থা করা হবে।

২০২৫ সালে অনুপ্রবেশকারীদের চিহ্নিত করে ফেরৎ পাঠানোর নির্দেশিকা জারি করেছিল ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার। কিন্তু সেসময়ের মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার সেই নির্দেশিকা আমলে নেয়নি।

অন্যদিকে ক্ষমতায় এসেই অনুপ্রবেশ রুখতে ‘ডিটেক্ট, ডিলিট, ডিপোর্ট’— এই তিনটি স্তরের নীতির কথা বলেছেন নয়া মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী।

তার বক্তব্য ছিল, প্রথমে অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের চিহ্নিত করতে হবে, তারপর প্রশাসনিক ও আইনি প্রক্রিয়ায় তাদের নাম সরকারি নথি থেকে বাদ দিতে হবে এবং শেষে নিজ নিজ দেশে ফেরত পাঠাতে হবে। ইতোমধ্যে ফেরত পাঠানোর চূড়ান্ত প্রক্রিয়ার অংশ হিসাবে রাজ্যের ২৩জেলায় ‘হোল্ডিং সেন্টার’ এর কার্যক্রম শুরু হল। এর আগে অনুপ্রবেশকারীদের কারাগারে প্রেরণ করা হয় থাকলেও, রাজ্য সরকারের নতুন নির্দেশিকা জারির পর ভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হলো।

তবে অনেকের মনেই প্রশ্ন উঠছে— এই হোল্ডিং সেন্টার আসলে কী? আর এটি কি অসমের ডিটেনশন সেন্টার-এর মতোই?

দুইয়ের মধ্যে মূল পার্থক্য রয়েছে উদ্দেশ্য ও আইনি কাঠামোয়। ডিটেনশন সেন্টার সাধারণত দীর্ঘ সময়ের জন্য তৈরি হয়, যেখানে বিদেশি ট্রাইব্যুনাল বা আদালতের নির্দেশে ‘অবৈধ বিদেশি’ ঘোষিত ব্যক্তিদের আটকে রাখা হয়। অসমে এনআরসি ও বিদেশি ট্রাইব্যুনাল প্রক্রিয়ার পরে বহু মানুষকে এমন কেন্দ্রে রাখা হয়েছিল। সেই কেন্দ্রগুলি কার্যত জেল সদৃশ ব্যবস্থার মধ্যে পড়ে এবং সেখানে দীর্ঘদিন আটকে থাকার নজিরও রয়েছে।

অন্যদিকে হোল্ডিং সেন্টারের ধারণা তুলনামূলকভাবে অস্থায়ী। প্রশাসনের দাবি অনুযায়ী, কাউকে চিহ্নিত করার পর তাকে ডিপোর্টেশন বা পুশব্যাকের আগে সাময়িকভাবে সেখানে রাখা হবে। অর্থাৎ এটি দীর্ঘমেয়াদি বন্দিশিবির নয়, বরং প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত একটি ট্রানজিট বা অস্থায়ী হেফাজত কেন্দ্র। সন্দেহভাজনদের আটক করে ‘হোল্ডিং সেন্টার’-এ ৩০ দিন পর্যন্ত রাখা যাবে।

এছাড়া এ দেশে অবৈধভাবে বসবাসকারী রোহিঙ্গা বা বাংলাদেশি যারা আগে ধরা পড়েছিলেন এবং বন্দি ছিলেন, যাঁদের দেশের বাইরে পাঠানোর প্রক্রিয়া চলছে, তাঁদেরও ‘হোল্ডিং সেন্টার’-এ রাখা যাবে।

সরকারি সূত্রের বক্তব্য, সীমান্তবর্তী রাজ্যে অনুপ্রবেশ রুখতে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের গাইডলাইন মেনেই এই ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। ধৃত বিদেশিদের পরিচয় যাচাই, সংশ্লিষ্ট দেশের সঙ্গে যোগাযোগ এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সম্পূর্ণ করার পর তাঁদের ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া এখান থেকেই চালানো হবে। ধৃতদের হোল্ডিং সেন্টার থেকেই ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) হাতে তুলে দেওয়া হবে। এরপর এক এক করে দেশের বাইরে ডিপোর্ট করা হবে।

খুলনা গেজেট/এএজে




আরও সংবাদ

খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন