সোমবার । ১৮ই মে, ২০২৬ । ৪ঠা জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩
প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সম্পাদক পরিষদ নেতাদের বৈঠক

বিভিন্ন মামলায় অভিযুক্ত ২৮২ সাংবাদিকের তালিকা হস্তান্তর

গেজেট প্রতিবেদন

হত্যা মামলাসহ বিভিন্ন মামলায় অভিযুক্ত ২৮২ সাংবাদিকের তালিকা প্রধানমন্ত্রীর কাছে হস্তান্তর করেছেন সম্পাদক পরিষদের নেতারা। রবিবার (১৭ মে) বিকেলে সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক শেষে এ কথা জানান তারা।

বৈঠক শেষে দ্য ডেইলি স্টারের সম্পাদক ও প্রকাশক মাহফুজ আনাম বলেন, ২৮২ জন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরনের মামলা হয়েছে। এর মধ্যে ৯৪ জন হত্যা মামলার আসামি। প্রধানমন্ত্রীর কাছে আমরা এই তালিকা দিয়েছি। এই তালিকা যে একেবারেই সম্পূর্ণ, সেটা আমরা বলছি না। অসম্পূর্ণ থাকতে পারে, কিন্তু আমরা আন্তরিকভাবে এটা দিয়েছি। প্রধানমন্ত্রীও এটা গ্রহণ করেছেন। তিনি তথ্যমন্ত্রীকে নির্দেশ দিয়েছেন বিষয়টি দেখার জন্য এবং এ ব্যাপারে তারা একটি উদ্যোগ নেবেন বলেও আশ্বস্ত করেছেন।

তিনি বলেন, আমরা দৃঢ়ভাবে বলেছি, এই সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা এবং এত মামলা, গণতান্ত্রিক পরিবেশের জন্য ভালো নয়। এমনকি সরকারের ভাবমূর্তির জন্যও ভালো নয়। প্রধানমন্ত্রী খুবই আন্তরিকতার সঙ্গে এটা গ্রহণ করেছেন, এটা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে বিষয়টি দেখবেন বলে আশ্বস্ত করেছেন।

এসময় তথ্যমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, সম্পাদক পরিষদের নেতারা সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মামলার বিষয়টি উপস্থাপন করলে প্রধানমন্ত্রী তাদের অনুভূতির সঙ্গে একমত পোষণ করে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য নির্দেশ দিয়েছেন। একইসঙ্গে সরকার গঠন থেকে এ পর্যন্ত সংবাদ মাধ্যমে কোনো ধরনের কোনো হস্তক্ষেপ সরকার থেকে না থাকায় সিনিয়র সাংবাদিক ও সম্পাদকমণ্ডলীর নেতারা প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন।

এ সময় উপস্থিত ছিলেন তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরী, প্রধানমন্ত্রীর তথ্যবিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান, সম্পাদক পরিষদের সভাপতি ও নিউএজ সম্পাদক নুরুল কবির, সাধারণ সম্পাদক বণিক বার্তার সম্পাদক দেওয়ান হানিফ, মানবজমিন সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী, প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমান, দ্য ফিনান্সিয়াল এক্সপ্রেস সম্পাদক শামসুল হক জাহিদ, দৈনিক ইনকিলাব সম্পাদক এএমএম বাহাউদ্দিন, সুপ্রভাত বাংলাদেশ সম্পাদক রুশো মাহমুদ ও দৈনিক করতোয়া সম্পাদক মো. মোজাম্মেল হক।

বৈঠক শেষে প্রধানমন্ত্রী সাংবাদিকদের নিয়ে মধ্যাহ্নভোজ করেন। এতে প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব সালেহ শিবলী ও অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন উপস্থিত ছিলেন।

সম্পাদক পরিষদের প্রেস বিজ্ঞপ্তি:
এদিকে, সম্পাদক পরিষদের এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে: গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিতের জন্য আইনের অগণতান্ত্রিক ধারা বাতিল ও পরিবর্তনের দাবি জানিয়েছে সম্পাদক পরিষদ।

১৭ মে, রবিবার প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সম্পাদক পরিষদের নির্বাহী কমিটির সদস্যদের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। বাংলাদেশ সচিবালয়ের মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের জনপ্রশাসন সভাকক্ষে এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিতের জন্য আইনের অগণতান্ত্রিক ধারা বাতিল ও পরিবর্তনের দাবি জানিয়েছে সম্পাদক পরিষদ। বৈঠকে সম্পাদক পরিষদ গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার পরিবেশ নিশ্চিত করতে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উত্থাপন করে।

বৈঠকে সম্পাদক পরিষদ জানায়, গণমাধ্যম বিষয়ক আইনগুলো অনেক পুরোনো এবং সংবাদপত্রের স্বাধীনতার প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে। এগুলো বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের গণমাধ্যমের ভাবমূর্তিকেও প্রশ্নবিদ্ধ করে।

বিশেষ করে পত্রিকা প্রকাশের ঘোষণাপত্রের ফর্ম ‘বি’-তে প্রকাশকদের ঘোষণা ও স্বাক্ষর দিয়ে বলতে হয়:

‘আমি, এই মর্মে আরও ঘোষণা করিতেছি যে, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের স্বার্থের পরিপন্থী বা কোনো আপত্তিকর বিষয় আমার উক্ত পত্রিকায় প্রকাশে বিরত থাকিব এবং ১৯৭৩ সনের ছাপাখানা ও প্রকাশনা (ডিক্লারেশন ও রেজিস্ট্রেশন) আইনের সমুদয় নিয়মাবলি মানিয়া চলিতে বাধ্য থাকিব।’

এই ধারাটি সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক এবং এতে অগণতান্ত্রিক চরিত্র রয়েছে। সম্পাদক পরিষদ এ ধারা বাতিলের দাবি জানিয়েছে।

বৈঠকে দ্রুততম সময়ের মধ্যে গণমাধ্যম সংস্কারের জন্য গণমাধ্যম কমিশন গঠন অথবা প্রেস কাউন্সিলকে শক্তিশালী করার বিষয়গুলো সম্পাদক পরিষদের পক্ষ থেকে উত্থাপন করা হয়। প্রধানমন্ত্রী তথ্যমন্ত্রীকে আগামী জুন মাসের মধ্যে এ সংক্রান্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষা সম্পন্ন করে জুলাই মাসের মধ্যেই সরকার যেন একটি দৃশ্যমান পদক্ষেপ নিতে পারে, সে অনুযায়ী উদ্যোগ গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছেন।

প্রধানমন্ত্রী গণমাধ্যমের স্ব-নিয়ন্ত্রিত কাঠামোর প্রয়োজনীয়তার বিষয়ে জোর দেন। এর প্রেক্ষিতে সম্পাদক পরিষদ ২০২৬ সালের জুলাই মাসের মধ্যে সাংবাদিকদের জন্য একটি ‘কোড অব কন্ডাক্ট’ বা আচরণবিধি প্রণয়ন ও গ্রহণের উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানায় এবং বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীকে অবহিত করে।

বৈঠকে সম্পাদক পরিষদের কয়েকজন সদস্য সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া হয়রানিমূলক মামলার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে উত্থাপন করেন। সম্পাদক পরিষদ মনে করে, ন্যায়বিচারের স্বার্থেই সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে অভিযোগের যথাযথ অনুসন্ধান ও আইনি প্রক্রিয়া নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন; কিন্তু হয়রানিমূলক ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। তারা জানিয়েছেন, কোনো সাংবাদিকের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট ও প্রমাণসাপেক্ষ অভিযোগ থাকলে তা অবশ্যই প্রচলিত আইন ও স্বচ্ছ বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই নিষ্পত্তি করতে হবে।

প্রধানমন্ত্রী সম্পাদক পরিষদকে আশ্বস্ত করেছেন যে তিনি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে এ বিষয়ে আলাপ করবেন। প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, সরকার গণমাধ্যমের নিয়ন্ত্রক নয়; বরং সহায়ক হিসেবে কাজ করতে চায়। তিনি বিশ্বাস ব্যক্ত করেন যে, শক্তিশালী গণমাধ্যম রাষ্ট্রের একটি অপরিহার্য অংশ এবং তাঁর সরকার এ ব্যাপারে আন্তরিকভাবে কাজ করবে।

খুলনা গেজেট/এএজে




আরও সংবাদ

খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন