২০২৫ সালের ৩০ নভেম্বর। ঘড়ির দুপুর ১টার কাছাকাছি। একজন যুবক একটি মোটরসাইকেলে আর অপর যুবক আদালতে প্রবেশ পথের ডান পাশে দাঁড়িয়ে কথা বলছিল। কিছু বুঝে ওঠার আগেই দু’যুবককে গুলি ও ধারালো অস্ত্র দিয়ে কোপাতে থাকে একদল অস্ত্রধারী। মুহূর্তে মুহুর্মুহু গুলির শব্দ আর আত্মচিৎকারে আশপাশের মানুষ বিভিন্ন দিকে ছুটাছুটি করতে থাকে। গুলির শব্দ থামার কিছু সময়েরে মধ্যে আদালতে প্রবেশ পথের মুখে দেখা যায় দুই যুবকের মরদেহ পড়ে রয়েছে।
সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায় জোড়া হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীরা উদয়ন স্কুলের রাস্তা হয়ে ঘটনাস্থল ত্যাগ করে। প্রকাশ্য দিন দুপুরে ঘটে যাওয়া দু’টি হত্যাকাণ্ড মানুষের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করে।
খুলনার আদালত পাড়ার চাঞ্চল্যকর এ জোড়া হত্যাকাণ্ডের পাঁচ মাসের অধিক সময় পার হলেও মূল পরিকল্পনাকারী ও নির্দেশ দাতাকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ। হাতে গোনা কয়েকজনকে এ মামলায় গ্রেপ্তার করা হলেও তদন্ত কার্যক্রম এগোচ্ছেনা। উদঘাটন হয়নি হত্যাকাণ্ডের মূল রহস্য। দিনদুপুরে আদালতের গেটে সংঘটিত চাঞ্চল্যকর এ জোড়া হত্যাকাণ্ডের তদন্তে ধীরগতির কারণে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন খুলনার নাগরিক নেতারা।
একাধিক সূত্র জানায়, ঘটনার আগের দিন ২৯ নভেম্বর রাত ৮টার দিকে রূপসার আইচগাতি ইউনিয়নের রাজাপুরের একটি অফিসে বসে হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা করা হয়। সেখানে খুলনার একটি বাহিনী প্রধানের আস্থাভাজন ও রূপসার শীর্ষ সন্ত্রাসী ইমরানের পরিকল্পনায় মিশন সাজানো হয়। ওই রাতেই খুনিদের দায়িত্ব ভাগ করে দেওয়া হয়। ৩০ নভেম্বর সকালে খুনিরা একে একে নগরীতে একত্রিত হতে থাকে। আদালত চত্বরের বিভিন্নস্থানে অবস্থান করতে থাকে তারা।
দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে নগরীর নতুন বাজার এলাকার হাসিব হাওলাদার ও রূপসার বাগমারা গ্রামের ফজলে রাব্বি রাজন মামলার হাজিরা দিয়ে বের হয়ে আদালতের গেটের ডান পাশে অবস্থান করে। তাদের দু’জনের একজন মোটরসাইকেলে বসে এবং অপরজন দাঁড়িয়ে হাসিখুশি মুখে কথা বলতে থাকে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই সন্ত্রাসীরা তাদের ওপর পরপর ৬ রাউন্ড গুলি চালায়। দু’জনের মৃত্যু নিশ্চিত করতে শরীরে চাপাতি দিয়ে আঘাত করা হয়। সন্ত্রাসীদের তাণ্ডবে মুহূর্তের মধ্যে আদালতপাড়া ফাঁকা হয়ে যায়।
আদালত প্রাঙ্গণের এক চা বিক্রেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, হত্যা মিশনে ৮-৯ জন অংশ নেয়। হত্যাকারীরা খুব দক্ষ। তিন মিনিটের মধ্যে তারা মিশন সম্পন্ন করে। পরে খুনিরা অস্ত্র উঁচু করে আদালতের পাশের উদয়ন স্কুলের রাস্তা দিয়ে বের হয়ে যায়। শ’ শ’ মানুষের সামনে দিনে দুপুরে এমন হত্যাকাণ্ড আগে তিনি দেখেননি।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও খুলনা থানার ওসি (তদন্ত) মিজানুর রহমান বলেন, ‘জোড়া হত্যা মামলায় এ পর্যন্ত পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তারা হলো, রিপন, এজাজ, চিংড়ি পলাশ, হৃদয় ও আলিফ হোসেন। তাছাড়া গত কয়েকদিন আগে সাইফি নামে এক সন্ত্রাসীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাকে এ মামলায় গ্রেপ্তার দেখানোর জন্য আদালতে আবেদন করা হয়েছে। আদালত অনুমতি দিলে তাকে এ মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘নিহত দু’যুবক খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের পুরস্কার ঘোষিত শীর্ষ সন্ত্রাসী পলাশের সহযোগী ছিল। আধিপত্য বিস্তার ও মাদক কারবার নিয়ে খুলনার বিশেষ একটি বাহিনীর সাথে তার দ্বন্দ্ব ছিল। সেই দ্বন্দ্বের জেরে এই জোড়া হত্যাকাণ্ড সংগঠিত হয়।’
ওসি তদন্ত আরও বলেন, ঘটনাস্থলে লবি, ইমরান ও এজাজ ওই দু’জনকে গুলি করে। পরে তাদের কুপিয়ে মৃত্যু নিশ্চিত করে তারা। ঘটনাস্থল থেকে বিস্ফোরিত চারটি গুলির খোসা, একটি চা-পাতি ও চা-পাতির ভাঙা বাট উদ্ধার করা হয়। মৃত দেহের পাশ থেকে একটি নম্বর বিহীন ও আরও একটি মোটরসাইকেল উদ্ধার করা হয়।’
তিনি বলেন, নিহতদের পরিবার মামলা না করায় পুলিশ বাদি হয়ে মামলা দায়ের করে। মামলার তদন্তে ধীরগতির কথা স্বীকার করে তদন্তকারী কর্মখর্তা বলেন, ‘কেউ সাক্ষী দিতে এগিয়ে আসছে না। ফলে তদন্ত কিছুটা ধীরগতিতে চলছে।’
বৃহত্তর খুলনা উন্নয়ন সংগ্রাম সমন্বয় কমিটির সভাপতি শেখ আশরাফ উজ জামান বলেন, ‘প্রকাশ্যে খুনের ঘটনায় জড়িতরা গ্রেপ্তার না হওয়ায় অপরাধীরা বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। একই ঘটনা বার বার ঘটছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উচিত সবার আগে তাদের গ্রেপ্তারের দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেওয়া।’
খুলনা গেজেট/এনএম

