বৃহস্পতিবার । ৯ই এপ্রিল, ২০২৬ । ২৬শে চৈত্র, ১৪৩২

স্থবির খুলনার স্বাস্থ্য সেবা

নিজস্ব প্রতি‌বেদক

দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কোটি মানুষের চিকিৎসার শেষ ভরসাস্থল খুলনার স্বাস্থ্য খাত বর্তমানে নানাবিধ সংকটে জর্জরিত হয়ে স্থবির হয়ে পড়েছে। একদিকে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নষ্ট যন্ত্রপাতি ও দালালের দৌরাত্ম্যে রোগীরা দিশেহারা, অন্যদিকে বিভাগীয় শিশু হাসপাতাল ও ডেন্টাল কলেজের মত বড় প্রকল্পগুলো আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় আলোর মুখ দেখছে না। আধুনিক সরঞ্জামের অভাব আর জনবল সংকটের কারণে নামমাত্র সেবায় সন্তুষ্ট থাকতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে, যা এই অঞ্চলের চিকিৎসা ব্যবস্থাকে এক চরম অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে।

খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল : রেডিওলজি বিভাগের সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন পাইকগাছা উপজেলা থেকে আসা রহিমা বেগম। হাসপাতালে ভর্তি স্বামীর সিটিস্ক্যান করার পরামর্শ দিয়েছেন চিকিৎসক। তাঁকে জানানো হয়েছে, সচল একটি সিটি স্ক্যান যন্ত্রে আপাতত শুধু মস্তিষ্কের স্ক্যান হচ্ছে। সিটি স্ক্যান করাতে তাঁকে বাইরে যেতে হবে। শুধু রহিমা বেগমই নন, খুমেক হাসপাতালে বর্তমানে ছোট-বড় মিলে অন্তত ৩৮৬টি অতি জরুরি চিকিৎসা যন্ত্র নষ্ট হয়ে পড়ে আছে।

হাসপাতাল সূত্র বলছে, বর্তমানে বিভিন্ন বিভাগের ৩৮৬ প্রকারের যন্ত্রপাতি নষ্ট বা অচল অবস্থায় পড়ে আছে। এর মধ্যে পালস অক্সিমিটার (শরীরের অক্সিজেনের মাত্রা পরিমাপের যন্ত্র), নেবুলাইজারের (শ্বাস গ্রহণ যন্ত্র) মতো ছোট যন্ত্র যেমন রয়েছে, তেমনি সিটি স্ক্যান, পোর্টেবেল এক্স-রে, ডায়ালাইসিস মেশিনের মতো বড় ও দামি যন্ত্রও রয়েছে। রেডিওলজি বিভাগে থাকা পাঁচটি এক্স-রে যন্ত্রের সবই ফিল্মের অভাবে এক মাস ধরে অচল পড়ে ছিল। কয়েকদিন আগে ফিল্ম আনায় যন্ত্রগুলো চালু হয়েছে। তাও সীমিত পরিসরে, অর্ধেক মেশিন নষ্ট। একই বিভাগে সিটি স্ক্যান মেশিন রয়েছে দুটি। দুইটি নষ্ট অবস্থায় রয়েছে।

প্যাথলজি বিভাগের অটো অ্যানালাইজার মেশিন সচল থাকলেও রি-এজেন্টের অভাবে অচল পড়ে আছে। ২০২০ সালে যন্ত্রটি স্থাপনের পর আর রি-এজেন্ট কেনা হয়নি। যন্ত্রটি সচল থাকলে অল্প টাকায় সব ধরনের হরমোন পরীক্ষার সুযোগ পেতেন রোগীরা।

ইলেকট্রো মেডিকেল টেকনিশিয়ান বিভাগ জানায়, ছয়টি ইসিজি মেশিনের তিনটি, ১৬টি ফটোথেরাপি মেশিনের সব, দুটি সিটি স্ক্যান মেশিনের একটি, তিনটি ১০০ এমএ পোর্টেবল এক্স-রে মেশিনের দুটি, ৫০০ এমএ এক্স-রে মেশিন একটি, ছয়টি আলট্রাসনোগ্রাম মেশিনের চারটি, ১৯টি অ্যানেসথেশিয়া মেশিনের ৯টি, ৩০টি ওটি টেবিলের ২০টি, ১১টি ওটি লাইটের ছয়টি, একটি ডায়ালাইসিস মেশিন, একটি ডায়ালাইসিস রিপ্রেসর, ১২টি কার্ডিয়াক মনিটর, তিনটি আইসিইউ শয্যাসহ অসংখ্য যন্ত্রপাতি অচল পড়ে আছে।

এ বিষয়ে খুমেক হাসপাতালের পরিচালক ডা. কাজী আইনুল ইসলাম বলেন, অচল যন্ত্রপাতির তালিকা এবং দ্রুত মেরামতের জন্য উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি। ঢাকা থেকে টেকনিশিয়ানরা এসে দেখে গেছেন।

হাসপাাতালের চিকিৎসকের ২৮৮টি পদের মধ্যে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ পদ খালি। এছাড়া নার্স এবং চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের পদেও বড় ধরনের শূন্যতা রয়েছে।

খুলনা বিভাগীয় শিশু হাসপাতাল: শিশুদের স্বাস্থ্যসেবা প্রসারের লক্ষ্যে প্রায় এক বছর আগে সম্পন্ন হয়েছে খুলনা বিভাগীয় শিশু হাসপাতালের নির্মাণ প্রকল্প। কিন্তু সরকারি দপ্তরগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের অভাবে এখনো হস্তান্তর হয়নি ১১৪ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই হাসপাতাল। চিকিৎসক, নার্সসহ প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগও হয়নি। ভবন নির্মাণ করে এখন দায়িত্ব নিচ্ছে না কেউই। একাধিকবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতল এবং খুলনার সিভিল সার্জনকে এ ভবনের দায়িত্ব নেয়ার জন্য চিঠি দিলেও কেউ তাতে কর্ণপাত করেনি।

গণপূর্ত বিভাগ সূত্রের দাবি, ২০১৭ সালে খুলনা বিভাগীয় শিশু হাসপাতাল নির্মাণ প্রকল্পের অনুমোদন মেলে। বটিয়াঘাটার কৃষ্ণনগর ও ডুমুরিয়ার চকমথুরাবাদ মৌজার সংযোগস্থলে, অর্থাৎ কেডিএর ময়ূরী আবাসিক এলাকার বিপরীতে জমি চূড়ান্ত করা হয়। ২০১৯ সালে জেলা প্রশাসন ৫২ কোটি টাকায় ৪ দশমিক ৮ একর জমি অধিগ্রহণ করে গণপূর্ত বিভাগের কাছে হস্তান্তর করে। গণপূর্ত বিভাগ ২০২০ সালে প্রথম পর্যায়ে হাসপাতালের বেজমেন্ট ও একতলা ভবন নির্মাণের জন্য দরপত্র আহ্বান করে। টেন্ডারে নির্বাচিত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান রৈতি এন্টারপ্রাইজ ২০২০ সালের ১৪ মে কার্যাদেশ পায়। ২৬ কোটি টাকা ব্যয়ের এই কাজের মেয়াদ ছিল ২০২১ সালের ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত।

দ্বিতীয় পর্যায়ে, সংশোধিত প্রস্তাবনায় ৩৭ কোটি টাকা ব্যয়ে হাসপাতাল ভবনের দ্বিতীয় থেকে পঞ্চমতলা পর্যন্ত ঊর্ধ্বমুখী সম্প্রসারণের অনুমোদন মেলে। প্রথম ও দ্বিতীয় পর্যায়ের কোনো কাজই নির্ধারিত সময়ে সম্পন্ন হয়নি। বারবার মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে। সর্বশেষ ২০২৪ সালের জুনে কাগজে-কলমে প্রকল্পের কাজ সমাপ্ত দেখানো হয়।

গণপূর্ত বিভাগ-১-এর নির্বাহী প্রকৌশলী কামরুল হাসান বলেন, ‘জমি অধিগ্রহণে বিলম্বের কারণে দরপত্র আহ্বানেও দেরি হয়। কাজ শুরুর পর প্রবেশপথ নিয়ে জটিলতায় কিছুদিন কাজ বন্ধ ছিল। তবে ২০২৪ সালের জুনে প্রকল্পের কাজ সম্পন্ন হয়। এরপর নির্মাণকাজ বুঝে নিতে খুলনা সিভিল সার্জনকে একাধিক চিঠি দেওয়া হয়েছে, কিন্তু কোনো সাড়া মেলেনি।’

খুলনা সিভিল সার্জন ডা. মাহফুজা খাতুন চিঠি পাওয়ার কথা স্বীকার করে বলেন, ‘কাগজে-কলমে প্রকল্প শেষ দেখানো হলেও হাসপাতালের একপাশে প্রাচীর ও প্রধান ফটকে গেট নেই। ফলে হাসপাতালটি অরক্ষিত রয়েছে। এ ছাড়া কার্যক্রম শুরুর জন্য আসবাবপত্র ও জনবলের ব্যবস্থা নেই। গণপূর্তের সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’

 

খুলনা গেজেট/এনএম




আরও সংবাদ

খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন