সোমবার । ২৩শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ । ১০ই ফাল্গুন, ১৪৩২

ভাঙছে ‘আপ বাংলাদেশ’, আসছে নতুন রাজনৈতিক দল

গেজেট প্রতিবেদন

ইউনাইটেড পিপলস বাংলাদেশ বা আপ বাংলাদেশ নামে একটি রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম গড়ে ওঠে চব্বিশের জুলাই অভ্যুত্থানের পর। তরুণদের এই প্ল্যাটফর্ম ঘিরে আশা দেখছিলেন অনেকে। প্ল্যাটফর্মের নেতারাও জানিয়েছিলেন এটি একটি রাজনৈতিক দল হিসেবে যাত্রা শুরু করবে। কিন্তু মাত্র ৯ মাস না পেরোতে তাদের মধ্যে দেখা দিয়েছে ফাটল। রাজনৈতিক দল হিসেবে কার্যক্রম শুরু করা-না করা নিয়ে তৈরি হয়েছে বিরোধ।

সূত্র বলছে, এ অবস্থায় শিগগিরই আপ বাংলাদেশ ভেঙে নতুন একটি রাজনৈতিক দলের আত্মপ্রকাশ ঘটতে পারে। আর সেটি হলে এই প্ল্যাটফর্মের কেউ কেউ নতুন দলে না গিয়ে জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপিতে যোগ দিতে পারেন।

ফ্যাসিবাদ, আধিপত্যবাদ আর দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে ২০২৫ সালের ৯ মে আত্মপ্রকাশ করে আপ বাংলাদেশ। কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে আলী আহসান জুনায়েদের নেতৃত্বে ৮২ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়। আরেফিন মুহাম্মদ হিজবুল্লাহকে সদস্য সচিব, রাফে সালমান রিফাতকে প্রধান সমন্বয়কারী এবং নাঈম আহমাদকে করা হয় প্রধান সংগঠক। মুখপাত্র করা হয় শাহরিন ইরাকে। প্ল্যাটফর্মটির আত্মপ্রকাশের পর দেশের ৫২ জেলায় দেওয়া হয় আহ্বায়ক কমিটি। এ ছাড়া চারটি বিশ্ববিদ্যালয়সহ সবকটি মহানগরে আহ্বায়ক কমিটি দেন কেন্দ্রীয় নেতারা। এরই মধ্যে কমিটির মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ায় আগামী মার্চের শেষের দিকে কাউন্সিলের কথা ভাবছে সংগঠনটি।

গত ১৬ ফেব্রুয়ারি আপ বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় রাজনৈতিক দল গঠনের প্রস্তুতি হিসেবে ফিজিবিলিটি টেস্ট বা সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে ১০ জনের একটি কমিটি গঠন করা হয়। যার নেতৃত্বে রয়েছেন নাঈম আহমাদ। এ ছাড়া চূড়ান্ত করা হয় কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ এজেন্ডা। এর মধ্যে রয়েছে– গণভোটের রায় কার্যকরে জনমত তৈরি, জুলাই গণহত্যার বিচার, দুর্নীতিবিরোধী গণআন্দোলন, পুলিশ সংস্কার ও মেয়াদ শেষ হওয়া সাপেক্ষে সব কমিটি বিলুপ্ত করা।

সূত্র জানায়, আপ বাংলাদেশ ভেঙে নতুন রাজনৈতিক দল গঠনে মরিয়া হয়ে উঠেছেন প্রধান সংগঠক নাঈম আহমাদ। তবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন-পরবর্তী মুহূর্তে এমন কিছু চান না জুনায়েদ, হিজবুল্লাহ, ইরা, রিফাতসহ ৮০ শতাংশেরও বেশি নেতাকর্মী। গুটিকয়েক লোক নিয়ে দল গঠন করতে চাইছেন নাইম। এজন্য সর্বশেষ সাধারণ সভায় নিজেদের ভেতরে ফিজিবিলিটি টেস্ট করতে তাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। যার প্রতিবেদন এখনো হাতে পৌঁছায়নি বলে জানিয়েছেন কেন্দ্রীয় নেতাদের একজন।

একটি সূত্র বলছে, আপ বাংলাদেশের আহ্বায়ক জুনায়েদ, প্রধান সমন্বয়কারী রাফে সালমান রিফাত, মুখপাত্র শাহরিন ইরাসহ বেশ কয়েকজন নেতা জাতীয় নাগরিক পার্টিতে (এনসিপি) যোগ দিতে যাচ্ছেন। এরই মধ্যে দলটির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের সঙ্গে তাদের একাধিক বৈঠকের তথ্য পাওয়া গেছে বলে ওই সূত্রের দাবি। এ নিয়ে জানতে যোগাযোগের চেষ্টা করেও জুনায়েদকে পাওয়া যায়নি।
তবে সুযোগ থাকলে এনসিপিতে যাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি বলে জানিয়েছেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আপ বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ এক নেতা।

তিনি ঢাকা পোস্টকে বলেন, কেবল নির্বাচন শেষ হয়েছে। এর মধ্যেই আপ বাংলাদেশকে দল ঘোষণা করতে চাইছে কিছু লোক। কিন্তু আমাদের আহ্বায়ক জুনায়েদ, রিফাতসহ বেশিরভাগই প্ল্যাটফর্মে থাকতে মতামত দিয়েছেন। শুধু প্রধান সংগঠক নাঈমের নেতৃত্বে ছোট একটি অংশ দল গঠনের জন্য কাজ করছেন। এটি তার একক উদ্যোগ বলা যেতে পারে। অতএব চাইলে তিনি অন্য কোনো নামে দল আনতে পারেন। এর সঙ্গে আমরা থাকছি না।

প্ল্যাটফর্মের প্রধান নেতারা এনসিপিতে যাচ্ছেন– এমন গুঞ্জন নিয়ে কেন্দ্রীয় এ নেতা বলেন, বিষয়টি নিয়ে এখনো নিশ্চিত নই। তেমন কথাবার্তাও হয়নি। সুযোগ থাকলে আমরা যেতে পারি। তবে আপ বাংলাদেশ ভেঙে নতুন দল ঘোষণা করা হলে আমাদের কিছু সদস্য এনসিপিতে চলে যেতে পারেন। অর্থাৎ সক্রিয়রা এই প্ল্যাটফর্মে আর থাকতে চাইবেন না। এ ছাড়া প্ল্যাটফর্মের নামে যেহেতু রাজনৈতিক দল আসছে না, সেহেতু এখানেই সবাই থাকবেন।

শুধু ২৫-৩০ জন নিয়ে নাঈম আহমাদ একটি দল গঠন করতে চান জানিয়ে তিনি বলেন, প্ল্যাটফর্ম ভেঙে নতুন কোনো রাজনৈতিক দল এলেও আমরা ৯০ শতাংশ সদস্য অংশ নেব না। কারণ বর্তমানে আরেকটা দলের খুব প্রয়োজন নেই বলে আমরা মনে করছি। তবে এই মুহূর্তে এমন ফাটল আমাদের প্ল্যাটফর্মে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। কারণ, নতুন দল চাইলেও আমাদের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে তেমন কোনো ভূমিকা রাখতে পারবে না।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে আপ বাংলাদেশের প্রধান সংগঠক নাঈম আহমাদ ঢাকা পোস্টকে বলেন, আপ বাংলাদেশ প্ল্যাটফর্মে থাকতে চাই না, ব্যাপারটা তেমন না। রাজনৈতিক দল গঠনের আকাঙ্ক্ষা শুরু থেকেই ছিল। সেভাবেই আমাদের প্ল্যাটফর্মটি করা। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর দল গঠনের একটি সম্ভাব্য ডেডলাইন ছিল। নির্বাচনের পর হওয়া সাধারণ সভায়ও এ নিয়ে কথা হয়। একইসঙ্গে আমাকে প্রধান করে রাজনৈতিক দল গঠনের ফিজিবিলিটি অ্যানালাইসিস কমিটি দেওয়া হয়। এরই মধ্যে প্ল্যাটফর্মের অভ্যন্তরে কাজ শুরু করেছি। এখন পর্যন্ত প্রতিবেদন জমা না দিলেও ফিডব্যাক ভালো। আমরা ইতিবাচক কিছু দিতে পারব ইনশাআল্লাহ। আশা করি শিগগিরই একটি রাজনৈতিক দলের আত্মপ্রকাশ ঘটবে।

নতুন দলের নাম নিয়ে তিনি বলেন, কাছাকাছি কোনো একটি নামই থাকবে। হতে পারে ইউনাইটেড পিপলস পার্টি (ইউপিপি), যা এখন রয়েছে ইউপিবি। অর্থাৎ বাংলাদেশের স্থলে পার্টি হয়ে যেতে পারে। এমন আরও কিছু নামের প্রস্তাব আসছে। সবমিলিয়ে কাছাকাছি কোনো একটি নাম ব্যবহার করব।

নেতৃত্বের কাতারে কারা থাকবেন– জানতে চাইলে এ নেতা বলেন, এখন পর্যন্ত আপ বাংলাদেশের বর্তমান আহ্বায়ক জুনায়েদের থাকার সম্ভাবনা কম। অন্য কোনো নেতৃত্বই আসার সম্ভাবনা বেশি। কিন্তু বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন। অর্গানোগ্রাম বা সাংগঠনিক কাঠামো এখনো সাজানো হয়নি। তাই এখনই বলা যাচ্ছে না কারা নেতৃত্বে আসছে। দু-একদিনের মধ্যে আমরা প্রতিবেদন জমা দেব। যেহেতু প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে প্রক্রিয়াগত ব্যাপার রয়েছে, সেহেতু দল গঠনের আগপর্যন্ত এই নেতৃত্বই আমাদের মানতে হবে। অতএব তাদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমেই আমরা একটা তারিখ নির্ধারণ করব। আশা করছি এ সপ্তাহ বা আগামী মাসের শুরুর দিকে ঘোষণা আসবে।

অধিকাংশই চান আগের প্ল্যাটফর্মে থাকতে, আপনারা কিছু ব্যক্তি চান দল গঠন করতে, এটা ঠিক কি না? এমন প্রশ্নে নাঈম আহমাদ বলেন, আমাদের বৈঠকে দুই ধরনের আলাপ এসেছে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়ন তথা গণহত্যার বিচার, পুলিশ সংস্কারসহ অন্যান্য যেসব বিষয় রয়েছে, সেসব এখনো পুরোপুরি সুরাহা হয়নি। এজন্য জুলাইকেন্দ্রিক দাবি-দাওয়া নিয়ে প্ল্যাটফর্মের কর্মকাণ্ড অব্যাহত থাকবে বলে সিদ্ধান্ত হয়েছে। আর যারা রাজনৈতিক দলের দিকে যেতে চান, তারা যেতে পারবেন। সবমিলিয়ে শতাংশের হিসেবে এখন পর্যন্ত ৫০-৫০ বলা যায়।

কোন কোন ইস্যু সামনে রেখে দল গঠন করছেন– এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, কিছু কর্মসূচি নিয়ে আমরা ভাবছি। এর মধ্যে প্রথমেই হচ্ছে জুলাই সনদের পূর্ণ বাস্তবায়ন, পানি ও প্রাণ-প্রকৃতির সুরক্ষা, বিনামূল্যে কর্মসংস্থানমুখী শিক্ষাব্যবস্থা বাস্তবায়ন, বিনামূল্যে সর্বজনীন চিকিৎসা– এমন বেশকিছু কর্মসূচি আমরা হাতে নিচ্ছি। এসবের আদলে আমরা এগোতে চাই। এক কথায় বললে বাংলাদেশপন্থা ও সংস্কারপন্থার সম্মিলন ঘটাতে চাই আমরা।

এছাড়া আগামী পাঁচ বছরের একটি পরিকল্পনা রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমাদের লক্ষ্য থাকবে ৩০টি আসন। দেশের যেসব জায়গায় আমরা ভালো কাজ করতে পারব, সেসব আসন থেকে সংসদ সদস্য হওয়ার পূর্ণাঙ্গ প্রস্তুতি আমরা গ্রহণ করব। আর এই ৩০ আসন ধরে রেখে সম্মানজনকভাবে কোনো ধরনের নিজস্বতা বিলীন না করে যদি কারো সঙ্গে জোট করার সুযোগ হয়, তাহলে আমরা তখন ভেবে দেখব। তবে এটা নিয়ে এখনই চূড়ান্ত কিছু ভাবছি না।

খুলনা গেজেট/এমএনএস




আরও সংবাদ

খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন