হাসেন শহিদ সোহরাওয়ার্দীকে বলা হয়, এ উপমহাদেশের গণতন্ত্রের মানসপুত্র। সোহরাওয়ার্দী বলেছিলেন, ‘গণতন্ত্রের প্রশ্নে জনগণের রায়ই শেষ কথা।’ নির্বাচনের মাধ্যমে গণতন্ত্র বিকশিত হয়। দেশের জনগণের আকাক্সক্ষা, অভিমত, প্রতিফলিত হয়, সুষ্ঠু অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনে। যোগ্য মেধাবী সৎ ও দুর্নীতিমুক্ত প্রার্থী নির্বাচিত হয়ে গণমানুষের দাবি ও অধিকার বাস্তবায়ন করে। আমাদের ৫৪ বছর পাওয়া স্বাধীন এ দেশে বহুবার গণতন্ত্র মানুষের স্বাধীন মত প্রকাশের আকাক্সক্ষা, বারবার উবে গেছে। তাই ১৯৭১ এর নয় মাসের মুক্তিযুদ্ধ শেষে ১৬ই ডিসেম্বরের বিজয় আমাদের মনে স্বপ্ন জাগিয়েছিল। স্বাধিকার, স্বাধীনতা, মত প্রকাশের অধিকার কেউ আর কেড়ে নিতে পারবে না। কিন্তু কি হলো? ১৯৭১, এর ১৬ ডিসেম্বর থেকে ১৯৭৫, ১৯৮২, ১৯৯১, ১৯৯৬, ২০০১, ২০০৭, ২০০৮-বারবার এ জাতির সামনের সংকট ঘনীভূত হলো। উচ্চ মূল্য দিতে হল রাজপথের মানুষগুলোকে।
২০০৮ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত সময় গোটা জাতি ১৫ বছর যাবত বাক স্বাধীনতা, ব্যক্তি স্বাধীনতা এবং মত প্রকাশের স্বাধীনতা হারিয়ে ফেলে, শাসক গোষ্ঠীর তৈরি করা পেটুয়া বাহিনীর কাছে। ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লবে গুম খুন অপহরণ নির্যাতন জুলুম উপেক্ষা করে এদেশের নতুন প্রজন্মের তরুণরা, ছাত্র শ্রমিক জনতা কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে স্বৈরশাসককে উৎখাতের জন্য নিরন্তর লড়াই করেছে। এদেশের মসনদে চেপে বসা লুটেরা শাসক গোষ্ঠী, ছাত্র-জনতার একটানা লড়াইয়ে অবশেষে দেশ ছেড়ে পালিয়েছে পার্শ্ববর্তী একটি দেশে। ওরা এদেশে শাসকের ছদ্মবেশে আধিপত্যবাদী দেশের গোলাম ছিল। ২৪ শের জুলাই বিপ্লব ওদের চিরদিনের জন্য উৎখাত করেছে লাল কার্ড দেখিয়েছে।
কথা ছিল বিপ্লব পরবর্তী বাংলাদেশে ন্যায় ও ইনসাফ ভিত্তিক সমাজ হবে। দেশ চব্বিশের জুলাই বিপ্লবের শহীদ, পঙ্গু এবং অন্ধদের জন্য কিছু একটা করবে। এই প্রেক্ষাপটে ২০২৪ এর ৮ আগস্ট থেকে ২০২৬ এর ১২ ফেব্রুয়ারি অনেক পথ। ১৮ মাস ধরে দায়িত্ব গ্রহণ করা শান্তিতে নোবেল বিজয়ী ডক্টর প্রফেসর মোঃ ইউনুস একের পর এক বিদ্রোহ মোকাবেলা করলেন। শেষমেষ, এক অংশগ্রহণমূলক অবাধ, নিরপেক্ষ নির্বাচনও দিলেন। কিন্তু ‘ডাল মে কুচ কালা রয়ে গেল’…মাত্র ১৮ মাস ক্ষমতা গ্রহণ করার পর ডক্টর প্রফেসর মোহাম্মদ ইউনুসের সরকার যে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠান করলেন, সেখানে বাংলাদেশের সর্ব বৃহৎ রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বা বিএনপি নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে দলের চেয়ারপারসন তারেক জিয়ার নেতৃত্বে সরকার গঠন করছে। এখন আমরা দীর্ঘ দেড় দশক পর আবারো গর্জন মুখর সংসদ অধিবেশন দেখতে পাবো। বিভিন্ন মত পাল্টা মত, দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বিবিধ বিষয়ে আলোচনা হবে। এর সবকিছুই সুখকর বিষয়।
তবে একটি বিষয় অবশ্যই লক্ষণীয়। নির্বাচন পরবর্তী সময়ে এখন দরকার বেশি মাত্রায় পরমত সহিষ্ণুতা। বিজয়ী বিজিতের মধ্যে এবং সমর্থকদের মধ্যে সখ্যতা বিরাজ করা। রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে প্রত্যেকের স্বাধীন মত প্রকাশের অধিকার রয়েছে। নির্বাচন প্রসঙ্গে বলা হয়, ‘আমার ভোট আমি দেব যাকে খুশি তাকে দেব।’ কিন্তু এখন এটাই কাল হয়েছে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ক্ষুদ্র-মত পার্থক্য থেকে সাথে সাথে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ছে। এ ব্যাপারে সরকারের আইন প্রয়োগকারী সংস্থা এবং গোয়েন্দা বিভাগের নজরদারি অবশ্যই বৃদ্ধি করতে হবে।
পেছনে ফিরে তাকালে আমরা দেখতে পাই, বিগত ১৫-১৬ বছর যাবৎ ভিন্ন মতের নাগরিকরা নানা অজুহাতে তৎকালীন সরকারের কোপানলে পড়েছে, তাও আবার প্রতিবাদী নিরীহ মানুষেরা। কয়েকদিন গেল, এখনতো বিভিন্ন দলের প্রার্থীরা নির্বাচিত হয়েছেন, তারা সংসদে মানুষের সুখ দুঃখের ভাব ভাবনার কথা বলবেন। এখানে চিন্তা-মত প্রকাশে ভিন্নতা থাকতেই পারে। তা বলে, তা তো হিংস্রতা বা সহিংসতায় রূপ নিতে পারে না। পত্রিকান্তরে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে: মুন্সীগঞ্জে নির্বাচন পরবর্তী সহিংসতায় একজন নিহত হয়েছে। নির্বাচনের ফল নিয়ে বিএনপি এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে কথা কাটাকাটির জের ধরে সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়। পরে প্রতিপক্ষের হামলায় জসিম (৩০) নামক এক যুবক কে কুপিয়ে গুরুতর জখম করা হয়। জসিমকে পরে চিকিৎসার জন্য মুন্সিগঞ্জ হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে অবস্থার অবনতি হলে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পথে তার মৃত্যু হয়। যে নির্বাচন মানুষের অধিকার সমুন্নত রাখার জন্য, আমাদের হয়ে সংসদে প্রতিনিধিত্ব করার জন্য, সেখানে যদি সহিংসতা হয়, তাহলে প্রশ্ন ওঠে দেশ যাচ্ছে কোথায়? এই মুহূর্তে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, মানবাধিকার কর্মী, সুশীল সমাজের দায়িত্ব হবে নির্বাচন পরবর্তী সকল প্রকার উত্তাপ উত্তেজনা প্রশমনে সদা তৎপর থাকা।
১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনে যারা বিজয়ী হয়েছেন, বেশ কিছু এলাকায় দেখেছি পরাজিত প্রার্থীর বাড়িতে গিয়ে বিজয়ী প্রার্থীরা দেখা-সাক্ষাৎ ও মতবিনিময় করে সখ্যতা বাড়িয়েছেন। আবার নেগেটিভ এক ধরনের চিত্র চোখে পড়ছে। কোনো কারণ নেই, কথা নেই অহেতুক প্রভাব দেখানোর জন্য, কোনো কোনো দলের স্থানীয় মাঝারি ধরনের নেতা বা তাদের সমর্থকরা নিরীহ কোনো কোনো নাগরিককে দেখে নেওয়া হবে বলে হুমকি ধামকি দিচ্ছেন, শাসাচ্ছেন। ইতোমধ্যে আমরা লক্ষ্য করেছি কুমিল্লার দেবিদ্বার-৪ চার নির্বাচনি এলাকায় বিএনপি থেকে ধানের শীষে প্রার্থী হিসেবে নমিনেশন পেপার জমা দেন, নিয়তির নিগ্রহ, মনজুরুল আহসান মুন্সী নামক হাই প্রোফাইলের এক নেতা। উনি ইতঃপূর্বে ওই নির্বাচনি এলাকায় চারবার এমপি নির্বাচিত হয়েছেন। উনি খুব দাপুটে নেতা। কিন্তু এবার তিনি ১৭০০ কোটি টাকা ঋণ খেলাপি হবার কারণে রিটার্নিং অফিসারের কাছে ধরা খেয়েছেন। পরে তিনি প্রার্থী হিসেবে টিকে থাকার জন্য পর্যায়ক্রমে উচ্চ আদালতে আবেদন করেও প্রার্থিতা ফিরে পাননি। পরবর্তীতে তিনি হুংকার ছেড়ে এলাকাবাসীকে বলেছেন, আমার নির্দেশিত প্রতীকে ভোট না দিলে এলাকার সেইসব মানুষের বাড়িঘর জ¦ালিয়ে পুড়িয়ে দেবো, ভেঙে দেব। কথাটি ভীষণভাবে ভাইরাল হবার সাথে সাথে জনগণ প্রতিবাদ মুখর হয়েছে। অবশেষে ওই লোকটিকে বিএনপি থেকে সম্ভবত বহিষ্কার করা হয়েছে বলে শোনা যাচ্ছে।
এই যদি হয় চার বারের নির্বাচিত একজন সাবেক এমপির রুচি ও মানসিকতা, তাহলে জনগণ তার কাছ থেকে কোন স্বচ্ছ সেবা পাবে কীভাবে? প্রশ্ন এখানেই। এ ধরনের ঘটনা হলে দলের পক্ষ থেকে সুলভে একটি পদক্ষেপ নেওয়া হয়, বহিষ্কার, তাও আবার ক্ষণকালের জন্য। আমাদের সমাজে সংসারে বহু মনজুরুল আহসান মুন্সি রয়েছে, যারা নিরীহ নাগরিক ও ভোটারদের নানাভাবে হয়রানি ও হুমকি দিয়ে আসছেন। এদেরকে শুধু দল থেকে বহিষ্কার করলে হবে না বরং আর যাতে দলে ঢুকতে না পারে তার ব্যবস্থা করতে হবে। গণতন্ত্রের সৌন্দর্য হচ্ছে আপনি বলেন আমাকেও বলতে দেন। কিন্তু রাজনীতির নামে আমাদের দেশীয় সংস্কৃতিতে কি দেখছি? দুর্বল মানুষকে নানাভাবে টার্গেট করে, জুলুম নির্যাতন করা হচ্ছে, হুমকি ধামকি দেয়া হচ্ছে! এসব ব্যাপারে পুলিশকে আরও দায়িত্বশীল হতে হবে। নজরদারি আরও বাড়াতে হবে। যেখানে অপরাধ, সেখানেই তৎক্ষণাৎ প্রতিরোধ হতে হবে। যেখানে আইন হাতে তুলে নিয়ে জুলুম হবে, প্রভাবশালীরা হুমকি ধামকি দেবে, সেখানেই তাদের বিরুদ্ধে সতর্ক বার্তা দিতে হবে। পরিস্থিতি কঠোরভাবে মোকাবিলা করতে হবে। আমরা আশা করবো, গণতন্ত্রের সৌন্দর্য বিকশিত করতে নিজের মতের পাশাপাশি পরমতকে সহিষ্ণুভাবে মূল্যায়ন করা হবে। তাহলে সমাজে নির্বাচন পরবর্তী সহিংসতা বা সন্ত্রাস আর মাথা চাড়া দিয়ে উঠতে পারবে না। বিষয়টি আইন প্রয়োগকারী সংস্থাসহ সুশীল সমাজের সবার ই হৃদয়ঙ্গম করার সময় বোধ হয় এসে গেছে!
লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলামিস্ট।
খুলনা গেজেট/এনএম

