শুক্রবার । ২০শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ । ৭ই ফাল্গুন, ১৪৩২

সৌজন্যের রাজনীতি, পরিণত গণতন্ত্রের ইশারা

নিয়াজ মাহমুদ

বাংলাদেশের রাজনীতিতে কিছু ঘটনা কেবল তাৎক্ষণিক খবরের শিরোনাম হয়ে থাকে না, বরং সেগুলো ভবিষ্যতের রাজনীতির ভাষা ও আচরণ নির্ধারণ করে দেয়। সদ্যসমাপ্ত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর বিএনপির নিরঙ্কুশ জয়ের প্রেক্ষাপটে ঠিক তেমনই এক বিরল ও তাৎপর্যপূর্ণ দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন তারেক রহমান। ভূমিধস বিজয়ের পর বিজয়োৎসব কিংবা প্রতিপক্ষকে কোণঠাসা করার রাজনীতিতে না গিয়ে তিনি যে সৌজন্য ও রাজনৈতিক পরিণতবোধের পরিচয় দিলেন, তা বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক নতুন ধারার সূচনার ইঙ্গিত বহন করে।

নির্বাচনের পরপরই প্রতিদ্বন্দ্বী ও ভিন্ন রাজনৈতিক অবস্থানের দলনেতাদের বাসায় স্বশরীরে উপস্থিত হয়ে শুভেচ্ছা বিনিময়-বাংলাদেশের ইতিহাসে কার্যত নজিরবিহীন। এই সৌজন্য সাক্ষাৎ কোনো আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং এটি ছিল রাজনৈতিক সংস্কৃতির গভীরে প্রোথিত সংঘাতমুখী মানসিকতার বিপরীতে এক সচেতন বার্তা। এতে স্পষ্ট হয়েছে, ক্ষমতার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে রাজনীতির আচরণও বদলাতে পারে-যদি নেতৃত্বে থাকেন দূরদৃষ্টি সম্পন্ন রাষ্ট্রচিন্তক।

প্রথমে রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় ডা. শফিকুর রহমান, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীরের বাসায় যান তারেক রহমান। পরে তিনি সাক্ষাৎ করেন জাতীয় নাগরিক পার্টির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম-এর সঙ্গে। এই দুই সাক্ষাৎই ছিল সৌজন্য ও কুশলাদি বিনিময়ের আবহে, কিন্তু তার অন্তর্নিহিত তাৎপর্য ছিল অনেক গভীর।

বাংলাদেশের রাজনীতি দীর্ঘদিন ধরে ‘আমরা বনাম তারা’ বিভাজনের রাজনীতিতে বন্দী। ক্ষমতাসীন ও বিরোধী-এই দুই শিবিরের মাঝে পারস্পরিক অবিশ্বাস, প্রতিহিংসা ও প্রতিশোধপরায়ণতার সংস্কৃতি রাষ্ট্রকে বারবার সংকটে ফেলেছে। সেই প্রেক্ষাপটে তারেক রহমানের এই পদক্ষেপ একটি স্পষ্ট বার্তা দেয়-রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকবে, কিন্তু তা শত্রুতায় রূপ নেবে না।

রাজনীতিতে বিজয়ের পর সংযম ও নম্রতা নেতৃত্বের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। নির্বাচনে বিএনপির জয় কেবল আসনসংখ্যার বিচারে বড় নয়, বরং এটি দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম ও জনআকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন। এমন বিজয়ের পরও প্রতিপক্ষের দরজায় গিয়ে শুভেচ্ছা বিনিময় করা সহজ সিদ্ধান্ত নয়। এতে আত্মবিশ্বাস লাগে, লাগে গণতন্ত্রে বিশ্বাস।

এই আচরণ প্রমাণ করে, তারেক রহমান বিজয়কে দেখছেন দায়িত্ব হিসেবে, আধিপত্য হিসেবে নয়। তিনি বুঝতে পেরেছেন, রাষ্ট্র পরিচালনায় শুধু সংখ্যাগরিষ্ঠতা নয়, প্রয়োজন নৈতিক বৈধতা ও রাজনৈতিক ঐকমত্য। এটাই পরিণত গণতন্ত্রের ভিত্তি।

সৌজন্য সাক্ষাতের পর জামায়াত আমীরের ফেসবুক পোস্ট রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমানকে অগ্রিম অভিনন্দন জানিয়ে তিনি যে ভাষায় সংলাপ, দায়িত্বশীলতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার কথা বলেছেন, তা বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিরল। আরও তাৎপর্যপূর্ণ হলো-তিনি স্পষ্ট করেছেন, জামায়াত সরকারকে সহযোগিতা করবে জাতীয় স্বার্থে, কিন্তু বিরোধী দলের সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনে আপসহীন থাকবে।

এখানে বিরোধিতাকে আর ধ্বংসাত্মক শক্তি হিসেবে নয়, বরং সংশোধনমূলক ভূমিকা হিসেবে কল্পনা করা হয়েছে। সংসদীয় গণতন্ত্রের জন্য এটি এক ইতিবাচক দৃষ্টান্ত, যেখানে সরকার ও বিরোধী দল পরস্পরের অস্তিত্বকে স্বীকার করে, কিন্তু সমালোচনার অধিকার থেকেও সরে আসে না।

নাহিদ ইসলামের সঙ্গে সাক্ষাৎ বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ আরেকটি কারণে। জাতীয় নাগরিক পার্টি মূলত নতুন রাজনৈতিক চিন্তা ও তরুণ নেতৃত্বের প্রতিনিধিত্ব করে। এই সাক্ষাতে সংস্কার, বিচার এবং নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতার মতো বিষয় উঠে আসা প্রমাণ করে-আলাপটি নিছক সৌজন্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না।

এনসিপির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, দেশের প্রশ্নে সব রাজনৈতিক দল একসঙ্গে সিদ্ধান্ত নিতে পারবে-এমন পরিবেশ তৈরির প্রত্যাশা তাদের। এটি আসলে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্রচিন্তার প্রকাশ, যেখানে সরকার ও বিরোধী দল রাষ্ট্রের মৌলিক স্বার্থে একমত হতে পারে।

এই সফরে একটি প্রতীকী দৃশ্যও ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ-ছোট শিশুদের হাতে ফুল নিয়ে তারেক রহমানকে শুভেচ্ছা জানানো। রাজনীতির কঠিন বাস্তবতার ভেতরে এই দৃশ্য যেন ভবিষ্যতের বাংলাদেশের প্রতিচ্ছবি। শিশুদের সঙ্গে হাসিমুখে কুশলাদি বিনিময় এক ধরনের নীরব বার্তা দেয়-রাজনীতি যদি মানবিক না হয়, তবে তা টেকসই হয় না।

রাজনীতিতে প্রতীক কখনো কখনো বক্তব্যের চেয়েও শক্তিশালী হয়। এই দৃশ্যগুলো জনগণের মনে একটি নতুন প্রত্যাশা তৈরি করে-ক্ষমতা মানে দূরত্ব নয়, বরং সংযোগ।

অনেকেই বলছেন, এটি ’২৪ পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনীতিতে পরিবর্তনের বড় ইঙ্গিত। সত্যিই তাই। এই সৌজন্য সাক্ষাৎগুলো দেখিয়ে দিয়েছে, রাজনৈতিক পরিবর্তন মানে কেবল সরকার বদল নয়, বরং আচরণ ও সংস্কৃতির বদল। যদি এই ধারাবাহিকতা বজায় থাকে, তবে বাংলাদেশ একটি সংঘাতমুখী রাজনীতি থেকে ধীরে ধীরে সংলাপভিত্তিক রাজনীতির দিকে এগোতে পারে।

তারেক রহমানের এই পদক্ষেপ এক ধরনের নৈতিক মানদণ্ড স্থাপন করেছে। এখন প্রশ্ন হলো-এই মানদণ্ড কি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পাবে? সরকার ও বিরোধী দল কি ভবিষ্যতেও এই সৌজন্য ও দায়িত্বশীলতা বজায় রাখবে? উত্তর ভবিষ্যৎ দেবে, তবে সূচনা নিঃসন্দেহে আশাব্যঞ্জক।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে সৌজন্য কখনো দুর্বলতা ছিল না; বরং তা ছিল অনুপস্থিত। সেই শূন্যতায় তারেক রহমান যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন, তা প্রমাণ করে-শক্ত নেতৃত্ব মানে কণ্ঠ উঁচু করা নয়, বরং সেতু নির্মাণ করা। ক্ষমতার শীর্ষে থেকেও যদি কেউ সংলাপের দরজা খোলা রাখেন, তবে সেটিই রাষ্ট্রের জন্য সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ।

ইউরোপের প্রখ্যাত রাষ্ট্রচিন্তক এডমন্ড বার্ক একবার বলেছিলেন, “A state without the means of some change is without the means of its conservation.”

বাংলাদেশের রাজনীতিতে এই সৌজন্যমূলক পরিবর্তনই হয়তো রাষ্ট্রকে টিকিয়ে রাখার নতুন পথ দেখাচ্ছে।

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট
email: niazjournalist@gmail.com

 

খুলনা গেজেট/এনএম




খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন