সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে বাগেরহাট-১ সংসদীয় আসনে (ফকিরহাট, মোল্লাহাট ও চিতলমারী) রাজনৈতিক উত্তাপ ক্রমেই বাড়ছে। আওয়ামী লীগের প্রার্থী না থাকায় দীর্ঘদিনের একচ্ছত্র রাজনৈতিক প্রভাব ভেঙে এবার নতুন সমীকরণে দাঁড়িয়েছে আসনটি। মাঠ পর্যায়ের পরিস্থিতি ও ভোটারদের মতামতে ধানের শীষ, দাঁড়িপাল্লা ও ঘোড়া প্রতীকের মধ্যে ত্রিমুখী লড়াইয়ের আভাস মিলছে। আলোচনায় রয়েছে ফুটবল প্রতীকও।
এই আসনে মোট আটজন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও মূল আলোচনায় রয়েছেন চারজন। বিএনপি’র মনোনীত ধানের শীষ প্রতীকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন মতুয়া মহাসংঘের নেতা কপিল কৃষ্ণ মন্ডল। সংখ্যালঘু অধ্যুষিত এই আসনে তাকে ঘিরে বিএনপি’র কৌশলগত হিসাব স্পষ্ট বলে স্থানীয় নেতাকর্মীরা মনে করছেন। হিন্দু সম্প্রদায়ের ভোটে তার শক্ত অবস্থান তৈরি হয়েছে বলেও আলোচনা রয়েছে।
১১ দলীয় জোটের প্রার্থী হিসেবে জামায়াতে ইসলামী মনোনীত দাঁড়িপাল্লা প্রতীক নিয়ে মাঠে রয়েছেন অধ্যক্ষ মশিউর রহমান খান। ইসলামী মূল্যবোধ ও দুর্নীতিমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দিয়ে তিনি নিয়মিত গণসংযোগ চালাচ্ছেন। ভোট বিশ্লেষকদের মতে, নারী ভোটারদের একটি অংশ তার প্রতি আগ্রহ দেখাচ্ছেন।
স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছেন সাবেক সংসদ সদস্য ও শিল্পপতি এম এ এইচ সেলিম, যিনি ঘোড়া প্রতীক নিয়ে নির্বাচনে নেমেছেন। বিএনপি থেকে মনোনয়ন না পাওয়ায় তিনি স্বতন্ত্রভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন এবং উন্নয়ন ও অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরছেন। পাশাপাশি বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী প্রকৌশলী শেখ মাছুদ রানা ফুটবল প্রতীক নিয়ে নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন। তাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে এবং ইসলামী আন্দোলন তার প্রতি সমর্থন দিয়েছে।
এ ছাড়া জাতীয় পার্টির লাঙ্গল প্রতীকে স. ম গোলাম সরোয়ার, মুসলিম লীগের পাঞ্জা প্রতীকে আ. সবুর শেখ, মুসলিম লীগের হারিকেন প্রতীকে এমডি শামসুল হক এবং আমার বাংলাদেশ পার্টির ঈগল প্রতীকে মো. আমিনুল ইসলাম প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। বিশ্লেষকদের মতে, এবি পার্টির প্রার্থীর কারণে জামায়াতের ভোটেও কিছুটা বিভাজনের আশঙ্কা রয়েছে।
ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, “এবারের ভোটের পরিবেশ অতীতের তুলনায় ভিন্ন। অনেক ভোটার এটিকে পরিবর্তনের সুযোগ হিসেবে দেখছেন। সংখ্যালঘু ভোটারদের বড় অংশ ধানের শীষের দিকে ঝুঁকতে পারে বলে ধারণা করা হলেও নারী ভোটারদের একটি অংশ দাঁড়িপাল্লার প্রতি আগ্রহ দেখাচ্ছেন। তরুণ ভোটাররাও বড় ফ্যাক্টর হয়ে উঠতে পারে। অতীতের নির্বাচনে ভোট দিতে না পারার ক্ষোভ থাকলেও শান্তিপূর্ণ ও সুষ্ঠু ভোট হলে কেন্দ্রে গিয়ে ভোট দেওয়ার আগ্রহ রয়েছে বলে জানিয়েছেন তারা। অনেকের ধারণা, এবারের নির্বাচন হবে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ।
পরিস্থিতি বিবেচনায় বাগেরহাট-১ আসনে ১৪৭টি ভোট কেন্দ্রের মধ্যে ৯৬টি কেন্দ্রকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, যার মধ্যে ৪০টি অতি ঝুঁকিপূর্ণ। ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রের হার ৬৫ দশমিক ৩০ শতাংশ। নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, এই আসনে মোট ভোটার ৩ লাখ ৭৫ হাজার ৫৬০ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ১ লাখ ৯০ হাজার ৮৩৮ জন, নারী ভোটার ১ লাখ ৮৪ হাজার ৭২০ জন এবং তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার ২ জন। ১৮ থেকে ২৯ বছর বয়সী তরুণ ভোটার রয়েছেন ১ লাখ ৩ হাজার ৮৮০ জন, যা মোট ভোটারের প্রায় ২৭ দশমিক ৬৬ শতাংশ। হিন্দু ভোটারের সংখ্যা প্রায় ৮৭ হাজার।
প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন নিশ্চিত করতে সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। সেনাবাহিনী, বিজিবি, পুলিশ ও আনসার সদস্যরা মাঠে সক্রিয় রয়েছে এবং ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রগুলোতে বাড়তি নজরদারি থাকবে। সব কেন্দ্রে সিসি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে।
সব মিলিয়ে বিদ্রোহী প্রার্থী, ভোট বিভাজন এবং আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে বাগেরহাট-১ আসন। শেষ পর্যন্ত কার গলায় উঠবে বিজয়ের মালা, সে অপেক্ষায় ভোটাররা।
খুলনা গেজেট/এনএম

