ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোট গ্রহণ ১২ ফেব্রুয়ারি। যশোরে সহিংসতা নাকি স্বস্তির ভোট হবে, সেটি নিয়ে এখন আলোচনা তুঙ্গে। ভোটের নিরাপত্তায় উদ্বেগের বড় কারণ সন্ত্রাসীদের কাছে থাকা অবৈধ অস্ত্র, গুলি ও বিস্ফোরকদ্রব্য।
যদিও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, “নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা বেড়েছে। কঠোর নজরদারিতে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র-গুলি, বিস্ফোরক উদ্ধার হচ্ছে। ভোটাররা যাতে নির্বিঘ্নে ভোট দিয়ে বাড়ি ফিরতে পারে, সেই ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।
অবৈধ অস্ত্র ও গুলি নিয়ে আতঙ্ক : গত রবিবার অভয়নগর আর্মি ক্যাম্পের কমান্ডার মেজর মাহফুজের নেতৃত্বে যৌথ বাহিনী অভয়নগর উপজেলা চলিশিয়া ইউনিয়নের মারুফ হোসেনের বাড়িতে অভিযান চালায়। এ সময় যৌথ বাহিনীর উপস্থিতি টের পেয়ে মারুফ হোসেন পালিয়ে যায়। পরে বাড়িটি তল্লাশি করে পরিত্যক্ত অবস্থায় দেশিয় অস্ত্র ও পেট্রোল বোমা উদ্ধার করা হয়। অভিযানে পরিত্যক্ত অবস্থায় বিপুল পরিমাণ দেশিয় অস্ত্র ও বোমা উদ্ধার করা হয়। উদ্ধারকৃত সামগ্রীর মধ্যে রয়েছে ৪টি পেট্রোল বোমা, ২টি অ্যামোনেশন, ১টি চাইনিজ কুড়াল, একটি হকি স্টিক, পাঁচটি চাপাতি, তিনটি মাঝারি ছুরি, দুটি মাঝারি রাম দা এবং একটি বড় রাম দা। উদ্ধারকৃত অস্ত্র ও বোমা পরবর্তীতে অভয়নগর থানা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
গত ৭ ফেব্রুয়ারি রাতে যশোর শহরের বারান্দি মোল্লাপাড়ায় আরিফের বাড়িতে যৌথবাহিনীর অভিযানে দুটি বিদেশি পিস্তল, ম্যাগজিন ও গুলিসহ একই পরিবারের চারজনকে আটক করা হয়। এ সময় আরিফ পালিয়ে যায়। তার স্ত্রী লোপা খাতুন (৩২), ভাই জাকির হোসেন সাগর (৫২), আরেক ভাই জোয়েব হাসান সাকিব (৫৫), জাকির হোসেন সাগরের স্ত্রী তাহেরা আক্তার তানিয়াকে (৪৫) আটক করা হয়। তার বাড়িতে অভিযান চালিয়ে দুটি ইউএসএ-র তৈরি পিস্তল ও দুটি ম্যাগজিন, এক রাউন্ড তাজা গুলি, এক বক্স এয়ারগানের গুলি, দ্ুিট চাপাতি, দুটি চায়না ব্যাটন স্টিক, দুটি চাকু, একটি চাকু ধার দেওয়ার র্যাদ ও একটি সাইড টেলিস্কোপ এবং পাঁচটি সিসি ক্যামেরা, পাঁচ বোতল মদ ও দুটি অ্যান্ড্রয়েড ফোন উদ্ধার করা হয়।
৩১ জানুয়ারি বাঘারপাড়া উপজেলার দড়িআগ্রা গ্রামে চুন্নু মোল্লার বাড়িতে যৌথবাহিনীর বিশেষ অভিযানে বিপুল পরিমাণ অবৈধ অস্ত্র ও বিস্ফোরক উদ্ধার করা হয়েছে। অস্ত্রের মধ্যে ছিল ১০টি গ্রেনেড, ৩টি বিদেশি পিস্তল, ১৯ রাউন্ড পিস্তলের গুলি, একটি চাপাতি, একটি ছুরি, একটি খুর। অভিযান শুরু হওয়ার আগেই বাড়ির সদস্যরা পালিয়ে যায়। অভিযানে মূল সন্দেহভাজন হিসেবে শনাক্ত করা হয় চুন্নু মোল্লার ছেলে রায়হান মোল্লাকে (২৮)। তিনি দড়িআগ্রা গ্রামের বাসিন্দা এবং তার বিরুদ্ধে অস্ত্র আইনে একাধিক অভিযোগ রয়েছে বলে নিশ্চিত করেছে পুলিশ।
যৌথ বাহিনীর কর্মকর্তারা জানান, উদ্ধারকৃত অস্ত্র ও বিস্ফোরকগুলো অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এবং এগুলো দিয়ে বড় ধরনের নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড ঘটানো সম্ভব ছিল। বিশেষ করে সামনে জাতীয় নির্বাচন থাকায় এসব অস্ত্র জননিরাপত্তার জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে উঠতে পারত।
চৌগাছা ও বেনাপোল সীমান্ত দিয়ে ঢুকছে অবৈধ অস্ত্র : ৯ ফেব্রুয়ারি সোমবার ভোরে শার্শা উপজেলার বেনাপোল পোর্ট থানাধীন গাতিপাড়া গ্রামের একটি পরিত্যক্ত বাড়ির গেট সংলগ্ন গাতিপাড়া-দৌলতপুর সড়কের পাশ থেকে পরিত্যক্ত অবস্থায় অস্ত্র ও গুলি উদ্ধার করা হয়। উদ্ধারকৃত অস্ত্রের মধ্যে রয়েছে দুটি বিদেশি পিস্তল, একটি ম্যাগাজিন ও দুই রাউন্ড গুলি।
৭ ফেব্রুয়ারি ভোরে বিজিবির অভিযানে যশোরের চৌগাছা উপজেলার দৌলতপুর গ্রামের একটি মাঠে অভিযান চালিয়ে মালিকবিহীন অবস্থায় ৪টি ভারতীয় এয়ার গান, ১টি বিদেশি গ্যাস পিস্তল, ৩০টি ট্রিগার স্প্রিং, ১৪টি ব্যাক সাইড ইউ এবং ২৯টি ফ্রন্ট সাইড টিপ উদ্ধার করা হয়।
শুধু এই দুটি ঘটনা নয়, যে পরিমাণ অবৈধ অস্ত্র দেশে ঢুকছে তার খুব সামান্যই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে ধরা পড়ছে বলে দাবি স্থানীয়দের। বিপুল পরিমাণ অস্ত্র সীমান্তরক্ষী বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে দেশে ঢুকছে। শার্শার পুটখালী, গোগা, কায়বা, শিকারপুর, চৌগাছার শাহাজাদপুর, মাসিলা, হিজলী, আন্দুলিয়া, পাঁচপীরতলাসহ অন্তত ১১টি রুট অবৈধ অস্ত্র চোরাচালানের কাজে ব্যবহার হচ্ছে বলে একটি সূত্র জানিয়েছে।
অস্ত্র-গুলি উদ্ধার প্রসঙ্গে ৪৯ বিজিবি যশোর ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্ণেল সাইফুল্লাহ সিদ্দিকী জানান, আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে সীমান্ত এলাকায় সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা ও যে কোনো ধরনের সহিংসতা প্রতিরোধের লক্ষ্যে নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় সীমান্ত এলাকায় নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে সফল হচ্ছে বিজিবি। দেশের নিরাপত্তা ও সীমান্ত সুরক্ষায় বিজিবির এ ধরনের আভিযান অব্যাহত থাকবে বলে তিনি জানান।
খুলনা গেজেট/এনএম

