ব্রিটিশ শাসন আমলে ভারতবর্ষের স্বাধীনতার জন্য আলীপুর জেলে ফাঁসিকাষ্ঠে জীবন উৎসর্গ করেন চারুচন্দ্র বসু। তিনি খুলনার সন্তান। প্রগতিশীল রাজনীতির পথিকৃৎ। ভারতের স্বাধীনতার জন্য দীর্ঘ সংগ্রাম করেছেন, অত্যাচার নির্যাতন সহ্য করেছেন। তাকে ফাঁসতে ঝোলানোর দিনটি ১৯ মার্চ, ১৯০৯ সাল। তাঁর সুযোগ্য উত্তরসূরি খুলনার ছাত্রনেতা সরদার আনোয়ার হোসেন। তিনি দৌলতপুর বিএল কলেজের ছাত্র। ছাত্র ফেডারেশনের রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন। ভাষা আন্দোলনে তিনি প্রথম শহিদ। রাজশাহী কারাগারের খাপড়া ওয়ার্ডে পুলিশের গুলিতে তিনি শহিদ হন। দিনটি ২৪ এপ্রিল, ১৯৫০ সাল।
১৯৪৮ সালে পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল কায়েদে আযম মোহাম্মাদ আলী জিন্নাহ ঘোষণা করেন, উর্দু এবং উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা। এই ঘোষণার পর পূর্ব পাকিস্তানের ১৭ জেলায় ছাত্রসমাজ ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। শিক্ষক ও আইনজীবীরা প্রতিবাদের ঝড় তোলেন। এই আন্দোলনের ঢেউ এসে পড়ে খুলনার দৌলতপুর বিএল কলেজে। তখন মুসলিম লীগ শাসন আমল। বিরোধী দল বলতে কিছুই ছিল না। কমিউনিস্ট পার্টির অস্তিত্ব, তাও গোপনে। মুসলিম লীগের একচেটিয়া আধিপত্য। দেশ বিভাগের পর কংগ্রেসের নেতাকর্মীরা দেশ ত্যাগ করায় রাজনৈতিক অঙ্গনের শূন্যতা বিরাজ করে।
দৌলতপুর বিএল কলেজে তখন পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ, ছাত্র কংগ্রেস ও ছাত্র ফেডারেশনের তৎপরতা ছিল। ছাত্র ফেডারেশনের রাজনীতির সাথে সম্পৃক্তরা হচ্ছেন স্বদেশ বসু, সন্তোষ দাস গুপ্ত, উমাপদ গাঙ্গুলী, সরদার আনোয়ার হোসেন, পরমেশ্বর ব্যানার্জী, পরিতোষ দাস গুপ্ত, জ্যোতিষ মন্ডল, ধনঞ্জয় দাস প্রমুখ। তারা ১৯৪২ সাল থেকে বঙ্গীয় প্রাদেশিক ছাত্র ফেডারেশনের সাথে যুক্ত। ঢাকা থেকে আন্দোলনরত ছাত্র সমাজ ভাষা আন্দোলনকে বেগবান করতে ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ সারাদেশে ধর্মঘট আহ্বান করে। এই ধর্মঘট সফল করতে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সদস্য ছাত্রনেতা শেখ মুজিবুর রহমান বিএল কলেজে আসেন (অসমাপ্ত আত্মজীবনী)। তিনি দৌলতপুর রেল স্টেশনে নামলে ছাত্রসমাজ তাকে ফুলেল শুভেচ্ছা জানায়। ছাত্রনেতা শেখ মুজিবুর রহমানের ছাত্র সভাকে প- করার চেষ্টা করে মুসলিম লীগের অনুসারীরা। মুসলিম লীগ নেতা খান এ সবুর ছাত্রসভা সফল করতে পরোক্ষভাবে ভূমিকা রাখেন।
পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ ও ছাত্র ফেডারেশন খুলনার মাধ্যমিক পর্যায়ের স্কুল গুলোতে ধর্মঘট সফল করার জন্য কয়েকদিন ধরে ক্লাস ক্যাম্পিং করে। ১১ মার্চ বিকেলে তৎকালীন গান্ধী পার্ক (আজকের শহীদ পার্ক) ছাত্রসভার আয়োজন করে। ছাত্র সভায় বিএল কলেজের ছাত্র, ¯ানীয় মাধ্যমিক স্কুলের ছাত্ররা, খালিশপুর শিল্পাঞ্চলের শ্রমিকরা অংশ নেয়।
পাকিস্তান শাসনের প্রথমদিকে খুলনায় ছাত্র সমাজের এটাই প্রথম সরকারবিরোধী সমাবেশ। জনসভায় স্লোগান ওঠে ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’ মোদের গর্ব মোদের আশা, আমরি বাংলা ভাষা, রাজবন্দিদের মুক্তি চাই। ছাত্রসভার সিদ্ধান্তবলি পাঠ করেন ছাত্র ফেডারেশন নেতা সরদার আনোয়ার হোসেন। পার্কের ছাত্রসভা শেষে সন্ধ্যায় পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে। তার ওপর দীর্ঘদিন ধরে গোয়েন্দা নজরদারি ছিল। পাকিস্তান সরকার প্রথম দফায় তাকে ছ’মাসের আটকাদেশ দেয়। জেল থেকে মুক্তি পেয়ে তিনি ছাত্র ফেডারেশনের সাথে আবারও সম্পৃক্ত হন। মুসলিম লীগ সরকার গোয়েন্দা রিপোর্টের ভিত্তিতে তার এই তৎপরতাকে স্বাভাবিকভাবে নেয়নি। তার নামে হুলিয়া জারি করে। তিনি মুসলিম লীগ নেতা এম এ মজিদ ও এখানকার খ্যাতিমান আইনজীবী মরহুম এ এইচ দেলদার আহমেদের (পরবর্তীতে পাকিস্তান সরকারের কেন্দ্রীয় খাদ্যমন্ত্রী) স্নেহভাজন ছিলেন। বিভিন্ন সময় আনোয়ার হোসেনের বিরুদ্ধে মামলা মোকর্দমায় তাঁরা আইনগত ও আর্থিক সাহায্য করতেন। ছাত্রসভায় আনোয়ার হোসেনের বক্তব্য সবার কাছে প্রিয় ছিল। তাঁর নীতি আদর্শের প্রতি আনুগত্য পোষণ করে ছাত্রনেতা মালিক আতাহার উদ্দিন পরবর্তীতে বাম রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত হন। ছাত্র ফেডারেশনের নেতা আনোয়ার হোসেনের নামে হুলিয়া জারি ছিল।
১৯৫০ সালের জানুয়ারি বাগেরহাট জেলার ফকিরহাট এলাকা থেকে পুলিশ আবারও তাকে গ্রেপ্তার করে। তাকে রাজশাহী কারাগারে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। ২৪ এপ্রিল জেল সুপার মি. বিল জেলখানা পরিদর্শনে আসেন। কারাবন্দিরা তাকে জিম্মি করার চেষ্টা করলে ব্যর্থ হয়। একজন চিকিৎসক ও ডেপুটি জেলারকে বন্দিরা জিম্মি করে। পরি¯িতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পাগলা ঘণ্টা বাজানো এবং পুলিশ গুলি চালায়। এতে আনোয়ার হোসেনসহ সাতজন নিহত হয়। মীর আমির আলী খুলনা শহরের ইতিকথা নামক ইতিহাসে উল্লেখ করেছেন, আনোয়ার হোসেন বুকের রক্ত দিয়ে চিরঞ্জীব হয়েছেন।
সংক্ষিপ্ত পরিচিতি : ছাত্রনেতা আনোয়ার হোসেন সাতক্ষীরা জেলার আশাশুনি উপজেলার বুধহাটার কাছে হাবাশপুর গ্রামের সন্তান। তার পিতার নাম কানাই সরদার। তিনি মেধাবী ও দরিদ্র পরিবারের সন্তান। প্রথমে জিলা স্কুলে পরবর্তীতে বিএল কলেজে ভর্তি হন। ১৯৪৭-৪৮ সালে খুলনায় কর্ডন প্রথার বিরুদ্ধে আন্দোলন, ১৯৪৪ সালে পতিত জমি উদ্ধার ও খালকাটা আন্দোলনে অংশ নেন।
খুলনা গেজেট/এনএম

