শুক্রবার । ২০শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ । ৭ই ফাল্গুন, ১৪৩২

মধ্য ফেব্রুয়ারিতে বদলে যাওয়া নতুন বাংলাদেশের যাত্রা শুরু!

বিশেষ প্রতিনিধি

নতুন এক বাংলাদেশের যাত্রা শুরু করতে যাচ্ছে মধ্য ফেব্রুয়ারিতে। ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের মাধ্যমে যে সরকার গঠিত হতে যাচ্ছে তা হবে স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশের সবচেয়ে ‘গণমুখি, কল্যাণকামী ও গণতান্ত্রিক’ একটি সরকার। এক কথায় বলা যায়, জনগনের সরকার। গত দেড় দশকে দেশের মানুষ যেখানে ভোট দিতে পারেনি, দিলেও ফলাফলে তার প্রতিফলন ছিল না। মানবাধিকার ও আইনের শাসন ছিল নির্বাসিত। ভিন্নমত দমনে শাসকশ্রেণি ছিল নিষ্ঠুর, বেছে নেয়া হতো খুন-গুমের মতো মানবতাবিরোধী পথ। চাঁদাবাজি, সিন্ডিকেট, দখলবাজিসহ দেশটা যেন মগের মুল্লুকে পরিণত হয়েছিল। এমন অবস্থায় বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের মাধ্যমে শুরু হওয়া ছাত্রদের আন্দোলন রূপ নেয় ছাত্র-জনতার গণঅভ্যত্থানে। পালিয়ে যায় স্বৈরশাসক।

অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণের দেড় বছরের মাথায় আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে বহু প্রত্যাশিত জাতীয় নির্বাচন। দেশের প্রায় সাড়ে ৪ কোটি তরুণ ভোটার বিপুল সংখ্যক প্রবাসী এই প্রথম তাদের ভোটারাধিকার প্রয়োগ করবেন। তারাসহ আপামর জনগনের আশা আকাঙ্খার প্রতি খেয়াল রেখে প্রতিদ্বন্দ্বিকারী প্রধান তিনটি দল বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপি তাদের নির্বাচনী ইশতেহার জাতির সামনে উপস্থাপন করেছে।
বিএনপির ইশতেহারে দেশের প্রতিটি পরিবারের নারী সদস্যের নামে ‘ফ্যামিলি কার্ড’, কৃষক কার্ড ও কৃষি বীমা, এক লাখ স্বাস্থ্য কর্মী নিয়োগের পরিকল্পনা, শিক্ষাক্ষেত্রে ‘মিড ডে মিল’ বা দুপুরের খাবার, বিনামূল্যে স্কুল ড্রেস এবং বাধ্যতামূলক তৃতীয় ভাষা শিক্ষার পাশাপাশি ২০৩৪ সারের মধ্যে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি গড়ার লক্ষ্যের কথা জানানো হয়েছে।

মোট ৫১টি বিষয়ে বিভিন্ন প্রতিশ্রুতির কথা উল্লেখ করে চেয়ারম্যান তারেক রহমান অবশ্য বলেছেন, “কোনো পরিকল্পনাই বাস্তবায়ন করা যাবে না যদি না দুর্নীতি দমন, আইনের শাসন ও জবাবদিহিতায় সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার না দেওয়া যায়।”

এই ইশতেহারে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনা, উপ-রাষ্ট্রপতি পদ সৃষ্টি, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ ১০ বছর, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, সংসদে উচ্চকক্ষ প্রবর্তন, উচ্চকক্ষে ১০ শতাংশ নারী, বিরোধীদলীয় ডেপুটি স্পিকার, ৭০ অনুচ্ছেদ সংশোধন, জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে প্রধান বিচারপতি নিয়োগ প্রদান, জুলাই হত্যার বিচার এবং গণঅভ্যুত্থানকারীদের আইনি সুরক্ষাসহ আরও অনেক বিষয়কে স্থান দিয়েছে বিএনপি। এছাড়া পাঁচ লাখ সরকারি শূন্য পদে কর্মচারী নিয়োগ, বেসরকারি চাকরিজীবীদের জন্য বেসরকারি সার্ভিস রুল প্রণয়ন করা, পেনশন ফান্ড গঠন ও বেকারভাতা চালু, আইটি খাতে ১০ লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টির কথা বলা হয়েছে।

অন্যদিকে ক্ষমতায় গেলে দুর্নীতি ও চাঁদাবাজিমুক্ত একটি ইনসাফভিত্তিক রাষ্ট্র ব্যবস্থা গঠনেও ঘোষণা দিয়েছে জামায়াতে ইসলামী। ইশতেহারে জামায়াত জানিয়েছে, আগামীতে সরকার ক্ষমতায় গেলে রাষ্ট্র পরিচালনায় ২৬টি বিষয়ে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। ইশতেহারে আলাদা করে ৪১ দফা প্রতিশ্রুতির কথাও তুলে ধরেছে দলটি। তাদের অগ্রাধিকারের তালিকায় চার নম্বরে রাখা হয়েছে- নারীদের জন্য নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও অংশগ্রহণমূলক রাষ্ট্র গঠন। বিশেষ করে মাতৃত্বকালীন সময়ে মায়েদের সম্মতি সাপেক্ষে কর্মজীবী নারীদের কর্মঘণ্টা তিন ঘণ্টা কমানোর বিষয়টি ইশতেহারে রেখেছে দলটি।

ইশতেহারে দলটি বলেছে, জামায়াতে ইসলামী ক্ষমতায় গেলে সততা, ঐক্য, ইনসাফ, দক্ষতা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করবে। আর এর বিপরীতে দুর্নীতি, ফ্যাসিবাদ, আধিপত্যবাদ, বেকারত্ব ও চাঁদাবাজিমুক্ত বাংলাদেশ গঠন করবে।

“সাত কোটি কর্মক্ষম যুবকের জন্য দুই ভাগে কর্মসংস্থান তৈরি করা হবে এবং সেটি দেশে ও দেশের বাইরে দুই জায়গাতেই করা হবে”- এমন প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হয়েছে ইশতেহারে।

আর জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া তরুণদের দল জাতীয় নাগরিক পার্টি বা এনসিপি তাদের দলের ৩৬ দফা নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করেছে। যদিও নতুন এই দলটি জামায়াতে ইসলামীর সাথে জোট বেঁধে অংশ নিচ্ছে সংসদ নির্বাচনে। তারা তাদের ইশতেহারে যেসব বিষয় উল্লেখ করেছে, তাতে শুরুতেই আছে জুলাই সনদের প্রসঙ্গ। পাশাপাশি, ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানে এবং আওয়ামী লীগের টানা ১৬ বছরের শাসনামলে সংঘটিত সব হত্যাকা- ও গুমের বিচারের প্রতিশ্রুতিও দিয়েছে।

এছাড়া, ভোটাধিকারের বয়স ১৬ বছর করা, আগামী পাঁচ বছরে দেশে এক কোটি সম্মানজনক কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা, চাঁদাবাজি সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করা, ছয় মাসের ইন্টার্নশিপ বাধ্যতামূলক করা, মেধাবীদের দেশে ফেরানোসহ মোট ১২টি বিষয়ে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে ৩৬ দফার ইশতেহারে।

সেখানে তারা আরও বলেছে- সংসদে নিম্নকক্ষে ১০০টি সংরক্ষিত আসনে সরাসরি নির্বাচনের ব্যবস্থা করা হবে। এছাড়া পূর্ণ বেতনে ছয় মাস মাতৃত্বকালীন ও এক মাস পিতৃত্বকালীন ছুটি বাধ্যতামূলক, সরকারি কর্মক্ষেত্রে ঐচ্ছিক পিরিয়ড লিভ ও ডে-কেয়ার সুবিধা থাকার কথা প্রতিশ্রুতিতে রাখা হয়েছে।

নির্বাচনের অংশগ্রহণকারী প্রধান তিনটি রাজনৈতিক দলের ইশতেহার পর্যালোচনা করলে এই প্রতিবেদনের ভূমিকায় যে ‘গণমুখি, কল্যাণকামী ও গণতান্ত্রিক সরকার’র আকাঙ্খার কথা উল্লেখ করা হয়েছে তা কি বাস্তবসম্মত নয়? তবে যারাই সরকার গঠন করুক, সরকার পরিচালনায় জনগনের কাছে দেওয়া ওয়াদার প্রতিফলন ঘটবে-এমনটাই প্রত্যাশা করে সবাই। তবেই বদলে যাবে বাংলাদেশ।

খুলনা গেজেট/এএজে




আরও সংবাদ

খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন