সুন্দরবন ঘেষা দাকোপ ও খুলনা মহানগর ঘেষা বটিয়াঘাটা উপজেলা নিয়ে খুলনা-১ আসন গঠিত। আওয়ামী লীগের ঘাটি হিসেবে পরিচিত আসনটিতে এবার দলটির কোনো প্রার্থী নেই। এটাকে ‘সুযোগ’ মনে করে মাঠে নেমেছেন ১০টি রাজনৈতিক দলের ১২ জন প্রার্থী। সবাই নানান প্রতিশ্রুতি নিয়ে ভোটারদের কাছে যাচ্ছেন। তবে আলোচনা চলছে বিএনপির আমীর এজাজ খান, জামায়াতের কৃষ্ণ নন্দী ও সিপিবির কিশোর কুমার রায়কে নিয়ে।
খুলনা-১ আসনের ৩ লাখ ৭ হাজার ১০৩ ভোটারের মধ্যে অর্ধেকই নারী। ২০২২ সালের জনশুমারি অনুযায়ী দাকোপের ৫৪ শতাংশ মানুষ হিন্দু ধর্মের অনুসারী। বটিয়াঘাটায় এই হার ২৭ শতাংশ। ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি বাদে বাকি সব সংসদ নির্বাচনে আসনটি থেকে আওয়ামী লীগ প্রার্থীরা বিজয়ী হয়েছেন। নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বি ছিলেন বিএনপির প্রার্থী।
এলাকা ঘুরে ও কথা বলে ভোট নিয়ে স্থানীয়দের মাঝে তেমন আগ্রহ দেখা যায়নি। উত্তেজনাও নেই। অনেকটা নিরুত্তাপ নির্বাচনকে বিএনপি প্রার্থী আমীর এজাজ খানের সামনে আশার আলো হিসেবে দেখছেন তার সমর্থকরা। তারা জানান, ২০০১ সাল থেকে আসনটিতে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে অংশ নিচ্ছেন আমীর এজাজ খান। পরাজিত হলেও প্রতিবারই তিনি ভোটের ব্যবধান কমিয়েছেন। আওয়ামী লীগবিহীন মাঠে এবার তিনি সবচেয়ে ‘ফেবারেট’ প্রার্থী। ২৫ বছর পর এবার তার সামনে বিজয় হাতছানি দিচ্ছে।’
আমীর এজাজ খান বলেন, ‘অতীতে পরাজিত হলেও মাঠ ছাড়িনি। বিপদে-আপদে এলাকায় ছিলাম। মানুষের জন্য কাজ করে গেছি, এখনও কাজ করছি। মানুষ এর প্রতিদান দিবে। এবার আমি বিজয়ী হবো।’
কৃষ্ণ নন্দীকে নিয়ে সাড়া ফেলেছে জামায়াত
খুলনা-১ আসনে জামায়াতের অবস্থান ছিল বরাবরই দুর্বল। ১৯৯৬ সালের পরে জামায়াত এই আসনে আর প্রার্থী দেয়নি। সেবার জামায়াতের প্রার্থী শেখ মো. আবু ইউসুফ ২ হাজার ৩০৮ ভোট পান। এবারের নির্বাচনে প্রথমে শেখ আবু ইউসুফকে প্রার্থী করেছিল জামায়াত। গত ৩ ডিসেম্বর প্রার্থী করা হয় জামায়াতের ডুমুরিয়া উপজেলা হিন্দু কমিটির সভাপতি কৃষ্ণ নন্দীকে। প্রচারণা শুরুর পর তিনি বেশ ভালোই সাড়া ফেলেছেন।
জামায়াতের প্রার্থী কৃষ্ণ নন্দীর বাড়ি ডুমুরিয়ার চুকনগরে। অন্য এলাকা থেকে গিয়ে অল্প দিনেই দাকোপ-বটিয়াঘাটায় বেশ শক্ত অবস্থান তৈরি করেছেন তিনি। তার সাদাসিদে রসাত্মক কথাবার্তা সামাজিক মাধ্যমে হাস্যরস তৈরি করেছে। এতে তরুণ ভোটারদের কাছে পৌঁছেছেন তিনি। হিন্দু সম্প্রদায়ের ব্যক্তি জামায়াতের প্রার্থী হওয়ায় কিছুটা বাড়তি নজর কাড়ছেন এই প্রার্থী। আবার এনিয়ে ক্ষোভও দেখা গেছে কিছু জামায়াত সমর্থকদের মাঝে।
কৃষ্ণ নন্দী বলেন, ‘আমি প্রার্থী হয়ে জামায়াত নিয়ে হিন্দুদের ভুল ধারণা ভেঙে দিয়েছি। এজন্য আমার ওপর মানুষের ভালোবাসা বেড়েছে। মানুষ পরিবর্তন চাইছে, সেই পরিবর্তনের জন্য আমাকে ভোট দেবে। আমি নির্বাচিত হলে এলাকার হিন্দুদের ওপর কোনো আঘাত আসতে দেব না।’
সিপিবির প্রার্থী কিশোর কুমার রায় ইতোপূর্বে দাকোপ উপজেলার ভাইস চেয়ারম্যান ছিলেন। ২০২৪ সালের ৫ জুন অনুষ্ঠিত নির্বাচনে ২৪ হাজার ৫৭১ ভোট পেয়ে তিনি যুবলীগ নেতা জাহিদুর রহমানকে পরাজিত করেন। ভোটের মাঠে তাকে নিয়েও আলোচনা চলছে।
তিনি বলেন, ‘এলাকার মানুষ সুখে-দুখে সব সময় আমাকে পাশে পায়। গত নির্বাচনে তারা আমাকে ভোট দিয়ে বিজয়ী করেছে। জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও বিজয়ী করবে।’
আসনটির অন্য প্রার্থীরা হলেন বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্টের সুনীল শুভ রায়, জাতীয় পার্টির মো. জাহাঙ্গীর হোসেন, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মো. আবু সাঈদ, জেএসডির প্রসেনজিৎ দত্ত, বাংলাদেশ মাইনরিটি জাতীয় পার্টির প্রবীর গোপাল রায়, গণ অধিকার পরিষদের জি এম রোকনুজ্জামান, বাংলাদেশ সম অধিকার পরিষদের সুব্রত মণ্ডলসহ দুই স্বতন্ত্র প্রার্থী গোবিন্দ হালদার ও চালনা পৌরসভার সাবেক মেয়র অচিন্ত্য কুমার মণ্ডল। তাদের নিয়ে আলোচনা কম।
রিটার্নিং কর্মকর্তা ও জেলা প্রশাসক আ স ম জামশেদ খোন্দকার বলেন, নির্বাচনী এলাকার পরিবেশ শান্তিপূর্ণ রয়েছে। ভোটের দিন সেনাবাহিনী, পুলিশ, বিজিবির সঙ্গে উপকূলীয় কয়েকটি ইউনিয়নে নৌবাহিনী ও কোস্টগার্ড সদস্যরা নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকবে।
স্থানীয় ভোটাররা জানান, খুলনার সবচেয়ে বেশি ভোট পড়ে এই আসনে। ভোটে সহিংসতার রেকর্ডও খুব কম। বেশিরভাগ ভোটারই নীরব। কে জিতবে এটা ১২ ফেব্রুয়ারি রাতের আগে বলা কষ্টকর।
খুলনা গেজেট/এনএম

