১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার দাবিতে সারাদেশে হরতাল আহ্বান করা হয়। যশোরের ছাত্রসমাজ মার্চ মাসের শুরু থেকে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা ঘোষণার দাবিতে আহুত হরতাল সফল করার প্রস্তুতি নিতে থাকে। স্থানীয় রাজনীতিকদের একাংশ ছাত্রদের এ কর্মসূচির সাথে একাত্মতা ঘোষণা করে।
রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের ডাকা ১১ মার্চ হরতাল প্রতিহত করতে জেলা প্রশাসন যশোরে ১৪৪ ধারা জারি করে। ১১ মার্চ কোনো অঘটন ছাড়াই শহরের স্কুল কলেজে ছাত্র ধর্মঘট পালিত হয়। ১৪৪ ধারা ভেঙে ছাত্র সমাজ মিছিল করে (কলকাতা থেকে প্রকাশিত যুগান্তরের ১৫ মার্চের সংখ্যায় বলা হয় ১১ মার্চ মুসলিম ছাত্রদের নেতৃত্বে শহরে ছাত্র সমাজ হরতাল পালন করে একটি শোভাযাত্রা বের করে এবং শেষ পর্যন্ত একটি প্রতিবাদ সভাও অনুষ্ঠিত হয়। সরকার এই প্রকার সভা নিষিদ্ধ করে আদেশ জারি করেন। পুলিশ পনেরো জনকে গ্রেপ্তার করে।
আনন্দবাজার পত্রিকার এক প্রতিবেদনে উল্লেখ ছিল তিন জন হিন্দুসহ ১৫ জন গ্রেপ্তার। ১২ মার্চ যশোর শহরের স্কুল কলেজের ছাত্ররা আগেরদির গ্রেপ্তার হওয়া ছাত্রদের মুক্তির দাবিতে কোনো বাধা-বিপত্তি ছাড়াই পালন করে হরতাল। মিছিলও বের করে তারা। ১৩ মার্চ বন্দিদের মুক্তির দাবিতে আবারও মিছিল করে ছাত্র সমাজ। এদিন ছাত্রদের সাথে পাকিস্তানের পুলিশের সংঘর্ষ হয়। ছাত্রদের ওপর লাঠিচার্জ ও গুলিবর্ষণ করে পুলিশ। ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসে এই প্রথম ঘটে গুলি বর্ষণের ঘটনা।
ঢাকা থেকে প্রকাশিত দৈনিক আজাদের ১৫ মার্চের সংখ্যায় এক প্রতিবেদনে বলা হয় ‘আজ তেরো মার্চ প্রায় বেলা ১০টার সময় বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করা ও ধৃত বন্দি নেতাদের মুক্তির দাবিতে শহরে স্কুল-কলেজে ধর্মঘট করিয়া ছাত্র-ছাত্রীরা ১৪৪ ধারা ভেঙে মিছিল বের করে।’ তাহারা মিছিলে আজাদ পাকিস্তান জিন্দাবাদ, আমাদের দাবি মানতে হবে, নেতাদের মুক্তি চাই, বাংলা ভাষাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা চাই, পুলিশের জুলুম চলবে না ইত্যাদি ধ্বনি করিয়া মিছিলটি ধীরে ধীরে কোর্টের দিকে লইয়া যাইতে থাকে। কিন্তু পুলিশ বাঁধা দেয়। পুলিশের লাঠি চালনায় কয়েকজন ছাত্র-ছাত্রী আহত হইয়াছে। গ্রেপ্তারের সংখ্যা ১৫০ জন। ১৮ মার্চ কলকাতা থেকে প্রকাশিত যুগান্তরের সংখ্যায় বলা হয় বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে ১৩ মার্চ যশোর শহরে যে আন্দোলন হয় জেলা কর্তৃপক্ষ কীভাবে তাহা দমন করেন সে সম্পর্কে উদ্বেগজনক বিবরণ এখন পাওয়া গিয়াছে। ১৩ মার্চ আরও অধিক সংখ্যা ছাত্র এক শোভাযাত্রা করিয়া মহকুমা হাকিমের আদালতে উপস্থিত হয় এবং ১১ মার্চ ধৃত ছাত্রদের মুক্তির দাবি করে।
পুলিশ ছাত্রদের ওপর লাঠি চার্জ করে এবং প্রকাশ যে, প্রতিশোধ স্বরূপ কিছু ছাত্রও পুলিশের ওপর ইস্টক বর্ষণ করে। তখন পুলিশ উন্মত্ত ও বেপরোয়া হইয়া গুলি বর্ষণ করিতে থাকে। কিন্তু সৌভাগ্যবশত গুলিবর্ষণের ফলে কেহ আহত হয় নাই। অতঃপর শহরের নাগরিকদের বালক-বৃদ্ধ নির্বিশেষ চড়াও হইয়া মারিতে থাকে। দশ বছরে অনধিক বয়স্ক বালক এবং ষাট বছরের অধিব বয়স্ক বৃদ্ধকে গুরুতর আঘাত করা হয়। প্রায় দুইশ’ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। ধৃত ব্যক্তিদের অধিকাংশই মুসলমান। আবার আনন্দবাজার পত্রিকার ১৭ মার্চের সংখ্যায় ভিন্ন প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এই প্রতিবেদনে বলা হয় শেষ পর্যন্ত ৭০ জন ছাত্রকে জেল হাজতে প্রেরণ করা হয়। উহাদের প্রায় অর্ধেকই হিন্দু, যদিও তারা আন্দোলনে কিছুমাত্র যোগ দেয় নাই।
যশোরের ১৩ মার্চ যে গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটে, সেই ঘটনায় সরকারের পক্ষ থেকে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। যশোর জেলার তৎকালীন মহকুমা প্রশাসক এসএ চৌধুরী এ তদন্ত কাজ পরিচালনা করেন। তিনি ১৬ এপ্রিল তারিখে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করেন। তার প্রতিবেদনের সারমর্ম হচ্ছে, ১৩ মার্চ বন্দিদের মুক্তির দাবিতে যশোর এমএম কলেজ থেকে ছাত্রদের একি বড় মিছিল শহর প্রদক্ষিণ শেষে এসডিও অফিসের সামনে সমাবেশ করে।
সমাবেশের কারণে আদালতের কাজে বিঘ্ন ঘটে। ছাত্রদের শান্ত করার সব প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়। সমাবেশ ধীরে ধীরে উগ্র হয়ে ওঠে। পরে লাঠিচার্জ করে তাদের ছত্রভঙ্গ করা হয়। এ সময় অন্য একদল উচ্ছৃখল জনতা আদালত সংলগ্ন ট্রেজারিতে দায়িত্বরত পুলিশের ওপর চড়াও হলে, থানা থেকে ওসিসহ বেশ কিছু পুলিশ এসে জনতার ওপর লাঠিচার্জ করে। এতেও জনতাকে নিরস্ত্র করা যায়নি। অগত্যা ওসি গুলির আদেশ দেন। গুলিতে কেউ হতাহত হয়নি। তদন্ত কর্মকর্তা-এ মত প্রকাশ করেন, ট্রেজারি রক্ষা জন্য পুলিশের কাছে এছাড়া কোনো বিকল্প ছিল না। তিনি পুলিশের গুলিবর্ষণকে আইনানুগ বলে উল্লেখ করেন।
খুলনা গেজেট/এনএম

