বৃহস্পতিবার । ৫ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ । ২২শে মাঘ, ১৪৩২

ভাষা আন্দোলনে খুলনার আইনজীবীদের গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা

কাজী মোতাহার রহমান

খুলনা জেলা আইনজীবী সমিতির বয়স ১৪২ বছর। ব্রিটিশ, পাকিস্তান ও বাংলাদেশ আমলে শত আন্দোলনের ঐতিহ্যের দাবিদার আইনজীবী সমিতির সদস্যরা। ব্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলন, বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, ছয় দফা আন্দোলন, সত্তরের সাধারণ নির্বাচন, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ সর্বোপরি স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে খুলনার আইনজীবীদের ভূমিকা ছিল প্রশংসনীয়। দুর্যোগ, সিডর, আমলা, ঘূর্ণিঝড়, দুর্ভিক্ষ ও মহামারিতে গত একশ বছরের বিভিন্ন সময়ে সাহায্যের হাত বাড়িয়েছে আইনজীবীরা।

ইতিহাসের পাতায় সে সময়কার আইনজীবীরা স্মরণীয় হয়ে আছেন। যুগ যুগ ধরে তাদের স্মরণ করবে আজকের প্রজন্ম।

পাকিস্তান জমানায় কেন্দ্রীয় খাদ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন এড. এএইচ দেলদার আহমেদ ও পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক সরকারের শিক্ষামন্ত্রী এড. এসএম আমজাদ হোসেন। দেশ সেবায় তাদের জুড়ি নেই। উৎপাদন, উন্নয়ন ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অগ্রযাত্রায় তাদের ভূমিকা অনন্য।

বাংলাদেশে স্বাধীনতা উত্তরকালে এড. শেখ আব্দুল আজিজ কৃষি, তথ্য, এড. সালাউদ্দিন ইউসুফ স্বাস্থ্য ও এড. মোমিন উদ্দিন আহমেদ পানি সম্পদ, বিদ্যুৎ উন্নয়ন প্রতিমন্ত্রী ও জাপা সরকারের শিক্ষামন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৫৪ সালে এড. আব্দুল হাকিম ও ১৯৯১ সালে এড. শেখ রাজ্জাক আলী স্পিকার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৫৮ সালে খুলনায় পৌরসভায় এড. আব্দুল জব্বার চেয়ারম্যান, ১৯৯৪ ও ২০০২ সালে খুলনা সিটি করপোরেশনে শেখ তৈয়েবুর রহমান মেয়র নির্বাচিত হন। ১৯৭৬ সালে এড, মোঃ এনায়েত আলী অধুনালুপ্ত পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। খুলনার রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনে আইনজীবীদের ভূমিকা ছিল সাহসী ও প্রশংসনীয়। ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্টের মনোনয়নে এড. এএফএম আব্দুল জলিল প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। স্বাধীনতাপূর্ব ও স্বাধীনতা পরবর্তী এ এইচ দেলদার আহমেদ, শেখ আব্দুল আজিজ, সালাউদ্দিন ইউসুফ, আব্দুল গফ্ফার, মোঃ এনায়েত আলী, মোমিন উদ্দিন আহমেদ, শেখ আওছাফুর রহমান, এম মুনসুর আলী, স ম বাবর আলী, স ম আলাউদ্দিন, হাবিবুর রহমান খান, জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদের সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।

ভাষা আন্দোলনের পক্ষে জনমত গঠনে তমুদ্দুন মজলিসের ভূমিকা দেশবাসী স্মরণ করে। এই সংগঠনের খুলনা শাখার সভাপতি হিসেবে এসএম আমজাদ হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক হিসেবে মোমিন উদ্দিন আহম্মেদ দায়িত্ব পালন করেন। আমজাদ হোসেন ১৯৫৪ সালে ও মোমিন উদ্দিন আহমেদ ১৯৫৬ সালে আইন পেশায় যোগ দেন। আজকের মত শহরের বিভিন্ন স্থানে তখনকার দিনে সভা-সমাবেশের আয়োজন হতো না। আইনজীবী সমিতির সদস্যরা তমুদ্দুন মজলিস, নয়া সাংস্কৃতিক সংসদ ও ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণ করতেন। সক্রিয় আন্দোলন অংশগ্রহণকারীরা হচ্ছেন এ এইচ দেলদার আহমেদ, এ এফ এম আব্দুল জলিল, আব্দুল জব্বার, শেখ আওছাফুর রহমান, এম মনসুর আলী, আব্দুল হালিম, মোস্তা গাউসুল হক, আব্দুল হামিদ, আলী হাফেজ, আব্দুস সাত্তার, নকিব উদ্দিন সরদার, আব্দুল ওহাব মোক্তার, গোলাম সায়ীদ মোক্তার।

১৯৪৮ সালের ২১ মার্চ রমনা রেসকোর্স ময়দানে পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল কায়েদে আজম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর’ উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা’ উক্তির প্রতিবাদে ২৫ মার্চ বিএল কলেজের ছাত্র সমাজ ক্লাশ বর্জন করে। কলেজ গেটে পথসভার আয়োজন হয়। এ সভায় ছাত্রনেতাদের পাশাপাশি অন্যান্যের মধ্যে শেখ রাজ্জাক আলী, মোমিন উদ্দিন আহমেদ, এম মনসুর আলী, কাজী মাহবুবুর রহমান বক্তৃতা করেন। তারা ছাত্র সমাজকে উদ্ধুদ্ধ করেন।

শেখ রাজ্জাক আলী ১৯৫৮ সালে আইন পেশায় যোগ দেন। ১৯৫২ সালে দৌলতপুর মুহসীন স্কুলের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী এম বজলুর রহমান ভাষা আন্দোলনে অংশ নেন। তিনি ১৯৬৩ সালে আইন পেশায় যোগ দেন।

ভাষা আন্দোলনের সফলতার জন্য ছাত্র সমাজের পাশাপাশি জেলা আইনজীবী সমিতির অসামান্য অবদান দক্ষিণ জনপদ বাসী যুগ যুগ ধরে স্মরণ করছে। পূর্বসূরিদের সফলতার এই গর্বে গর্বিত আজকের প্রজন্মের আইনজীবীরা।

 

খুলনা গেজেট/এনএম




আরও সংবাদ

খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন