ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আর মাত্র নয় দিন বাকি। দেশব্যাপী নির্বাচনের জোয়ার চলছে। হরেক রকম প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। স্বাক্ষর দিতে পারে এমন ব্যক্তিও নির্বাচনে প্রার্থী হয়েছেন। সবচেয়ে মজার ব্যাপার, ঋণ খেলাপি, দ্বৈত নাগরিক, প্রবাসী ধনাঢ্য নাগরিক, ওরাও এই নির্বাচনে প্রার্থী। সবার ইচ্ছা পার্লামেন্টে যাবেন, জনগণের সেবা করবেন। কুলি মজুর, কিষান, শ্রমিক, নিম্নবিত্ত, মধ্যবিত্ত প্রত্যেকেই স্বপ্নে বিভোর এবার স্বাধীনভাবে নিজেদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করবে। এ নিয়ে দেশে-বিদেশের তোলপাড়। বিদেশে কর্মরত বাঙালি রেমিট্যান্স যোদ্ধারাও এই প্রথম ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন। নিজেদের চয়েজের প্রার্থীর অনুকূলে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা, অন্যান্য উপদেষ্টারা প্রত্যেকেই দেশের সর্বস্তরের নাগরিকদের কাছে গণভোট হ্যাঁ দেবার জন্য বিশেষ আকুতি আহ্বান জানাচ্ছেন।
পেছনে ফিরে তাকাই। ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লব ছিল ছাত্র শ্রমিক জনতা আপামর মানুষের রক্ত ঘামে ভেজা। আবরার ফাহাদ, আবু সাঈদ, মুগ্ধসহ সিরিয়ালি মৃত্যুর স্তূপ! সর্বশেষ ১২ই ডিসেম্বর ২০২৫, ঢাকা-৮ আসনের সম্ভাব্য প্রার্থী শরীফ ওসমান হাদীকে হত্যা করে ঘাতকরা দেখিয়ে দিল, এ দেশে সাধারণ মানুষের জীবন কখনো নিরাপদ নয়। নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার একদিনের মধ্যে এ ধরনের একটি হত্যাকাণ্ড কী আলামত বহন করে? রাজধানীর হৃৎপিণ্ডর উপর, প্রকাশ্য দিবালোকে, শত শত সরকারি এজেন্সির চোখের সামনে ঘাতকরা এমন নির্মম ঘটনা ঘটিয়ে, দুঃসাহস ও স্পর্ধা দেখিয়ে বীর দর্পে পালিয়ে গেল। কেউ ঘাতকদের কেশাগ্র পর্যন্ত স্পর্শ করতে পারল না। ২০২৪শে জুলাই বিপ্লবকে এখন মনে হয় একটা ছোটখাট তামাশা। এই বিপ্লবে যাঁরা বুক চিতিয়ে দিয়ে অকাতরে জীবন বিসর্জন দিয়েছে, ঘাতকরা তাদেরকে বলছে, এরা নাকি একাত্তরের চেতনাধারীদের শত্রু! দেশদ্রোহী! সমগ্র জাতি আজ এক মহাসংকটে। এক ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। আগামী ১২ ই ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট জাতির জন্য একটি গুরুতর চ্যালেঞ্জ। ১২ই ফেব্রুয়ারির গণভোট প্রমাণ করবে এই জাতি আজাদির পক্ষে নাকি গোলামির শিকল পরতে ভালোবাসে। ১২ ই ফেব্রুয়ারির গণভোট, যখন আমরা শতসস্ফূর্ত ভাবে হ্যাঁ-এর পক্ষে রায় দেব, কেবল তখনই প্রমাণ হবে আমরা জুলাই বিপ্লব বুকে ধারণ করি। হ্যাঁ, ভোট সম্পর্কে একটি মহল অবশ্য সাধারণ জনমনে দারুণ বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে। হ্যাঁ ভোট দিলে নাকি সংবিধানে বিসমিল্লাহ কথা থাকবে না। এসব সম্পূর্ণ অলীক কথাবার্তা রটনা করে জাতিকে বিভ্রান্ত করতে চাচ্ছে। মূল বিষয় হচ্ছে —
যখন দেশের নাগরিকরা ভোটকেন্দ্রে গিয়ে হ্যাঁ ভোট দেবে, তখনই প্রমাণ হবে তারা দেশের উন্নয়ন, অগ্রগতি, কল্যাণ এবং সামগ্রিক স্বার্থের পক্ষে। আগে যেমন ১০ জন ফাঁসির আসামিকে ক্ষমতাসীন সরকারি দলের প্রেসিডেন্ট কোনো প্রকার বাধা নিষেধ ছাড়াই বেকসুর খালাস দিয়ে দিত। এইবার হ্যাঁ ভোটের পর এখন তা যখন তখন ক্ষমতা দেখিয়ে করা যাবে না। একচেটিয়াভাবে কোনো কাজ সম্ভব হবে না। সকল প্রকার আধিপত্যবাদের দোসরদের স্বেচ্ছাচারিতা হ্যাঁ ভোট দানের মাধ্যমে বন্ধ হবে। গত পনেরো ষোলো বছর যাবৎ যে-সব নির্মম নৃশংস ঘটনা ঘটেছে, হ্যাঁ, ভোট সেসব ঘটনার বিচারের পথ খুলে দেবে। পিলখানায় বিডিআর হত্যাকাণ্ড, শাপলা চত্বরে হত্যাকাণ্ড, আয়না ঘরের অত্যাচার, জুলুম এবং গুমের ঘটনার বিচারের পথ খুলে যাবে। হ্যাঁ, ভোটের মাধ্যমে অর্থ পাচারকারী লুটেরা চক্র নতুন করে রাষ্ট্রীয় ব্যাংক থেকে অর্থ লোপাটের সুযোগ পাবে না। পরাজিত পলাতক আধিপত্যবাদী শক্তির পুতুল হাসিনার শাসনামলের সকল অপরাধীদের দুষ্কর্মের অবশ্যই বিচার হবে।
আমাদের দেশের তরুণ প্রজন্ম দিনের পর দিন, মাসের পর মাস কিংবা কয়েক দশক বিস্ময়ে দেখেছে, মেধার কোনো মূল্যায়ন নেই। দুর্নীতি এবং দলবাজির মাধ্যমে দলীয় লোক দিয়ে দেশের প্রশাসন সহ গুরুত্বপূর্ণ আসলগুলো নিয়ে স্বজন প্রীতি, দলীয় প্রীতি করা হয়েছে। এসব অনিয়ম নিরসনের জন্য আমাদের দেশের সকল পর্যায়ের ভোটারদের এই সুযোগটি সুন্দরভাবে কাজে লাগাতে হবে। একচেটিয়া আধিপত্যবাদ, স্বৈরাচার এবং ফ্যাসিস্ট শক্তি যাতে আর দন্ত নখর দিয়ে জাতিকে খামচে ধরতে না পারে। পার্শ্ববর্তী একটি দেশের পরিকল্পনা ও ইশারায় গণবিরোধী ধারা সংযুক্ত করে গত ৫৪ বছর যে নষ্ট সংবিধান বহাল রাখা হয়েছে, তার টুটি চেপে ধরতে হবে। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থাকে গণমুখী করতে হলে, নারীর অধিকার সমুন্নত রাখতে হলে, শহিদদের আত্মত্যাগের সুষ্ঠু মূল্যায়ন ও প্রতিকারের জন্য অবশ্যই গণভোট হ্যাঁ দিতে হবে।
বলা বাহুল্য, দেশে ৩ কোটি শিক্ষিত যুবতারণ্যের ভোট এবং ভাসমান আরও এক কোটি মিলে মোট ৪ কোটি ভোট রয়েছে। ওরা আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে কর্তৃত্বপরায়ণ স্বৈরাচারী শক্তি আর যাতে মাথা তুলতে না পারে তার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। দেশের ঐতিহ্যবাহী বিদ্যাপীঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ নির্বাচন চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে দেশ আজ কোন দিকে যাচ্ছে। কত প্রকার রক্ত চক্ষু, প্রতিক্রিয়াশীল চক্রের ঘৃণ্য তৎপরতা, উপেক্ষা করে উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়, পাঁচটির ছাত্র সংসদ নির্বাচন বলে দিয়েছে বাংলাদেশ কোন পথে হাঁটছে। অতীতে বিশ্ববিদ্যালয় হল গুলোতে গণরুম, গেস্ট রুম, চাঁদাবাজি সংস্কৃতির অবসান ঘটিয়ে ইতোমধ্যে শিক্ষার্থীবান্ধব পরিবেশ গড়ে উঠেছে। দেশের বিশ্ববিদ্যালয় যদি হয় বিদি পার্লামেন্ট, তাহলে পাঁচটি সেরা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী শিক্ষার্থীদের রায় কী ইঙ্গিত দেয়, তা বোধ হয় বুঝা কষ্টকর নয়।
যারা ঋণ খেলাপি, চাঁদাবাজি, টেন্ডার বাজি, ভূমি দখল, সিলেটের সাদা পাথর লুটপাটসহ সকল গণবিরোধী তৎপরতা চালিয়েছে, যারা এদেশের নিরীহ অসহায় মহিলাদের ওপর দলীয় রাজনীতির নামে লাঞ্ছনা গঞ্জনা করেছে, জনগণ তাদের চিহ্নিত করে রেখেছে। যে-সব রাজনৈতিক দলের ক্যাডাররা (?) নিজেদের বাড়িতে অবৈধ অস্ত্রাগার গড়ে তুলেছে, যে-কোনো মুহূর্তে নিরীহ মানুষের জান মালের নিরাপত্তার প্রতি হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে, বাংলাদেশের সর্বধর্ম মতের মানুষ তাদের বয়কটের ডাক দিয়েছে। আগামী ১২ ই ফেব্রুয়ারি নির্বাচন নতুন করে পথ দেখাবে, বাংলাদেশ তার সংবিধান কীভাবে রচনা করবে, শিক্ষা, সংস্কৃতি, বাণিজ্য, শিল্প বিকাশ কীভাবে হবে। আমাদের হতভাগা জাতির সামনে যে অগ্নিপরীক্ষা, এখানে নাগরিকদের অবশ্যই অনমনীয় সচেতনতার পরিচয় দিতে হবে। বাংলাদেশ যেন আর বারবার স্বৈরাচারের হিংস্র থাবায় ক্ষতবিক্ষত না হয়। ১৮ কোটি মানুষের এই জাতির দুর্দশা মোচনের জন্য অবশ্যই আমাদেরকে চেতনার ব্যারোমিটার খোলা রাখতে হবে।
লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট।
খুলনা গেজেট/এনএম

