ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান পরবর্তী পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে দোরগোড়ায় কড়া নাড়ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এই নির্বাচনকে ঘিরে দেশের সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা আকাশচুম্বী, বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের। একটি সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের মাধ্যমে কেমন বাংলাদেশ দেখতে চান তারা? আসন্ন নির্বাচন ও ভবিষ্যৎ সরকার নিয়ে নিজেদের ভাবনা ও দাবির কথা জানিয়েছেন খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বর্ষের শিক্ষার্থীরা।
চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী তানবীরা তাবাসসুম বলেন, “সবার আগে আমি দেশের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত হওয়ার প্রত্যাশা করি। বর্তমানে দিনে দুপুরেই চুরি, ডাকাতি, মারামারি ও হত্যাকাণ্ড যেন নিত্যদিনের ঘটনায় পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে নির্বাচনের সময় ভোটকেন্দ্রগুলোতে বিশৃঙ্খলা ও সহিংসতা খুবই সাধারণ বিষয়, যা বিগত দিনে দেখেছি। এর ফলে নিরাপত্তাহীনতার ভয়ে অনেক নাগরিক ভোট দিতে যেতে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছে। যদিও ৫ আগস্টের পরে মানুষ আবার একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের প্রত্যাশা করছে। তাই একটি সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন সম্পন্ন করার জন্য কঠোর থেকে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি। যাতে আমরা নির্বিঘ্নে ভোটাধিকার প্রয়োগ করে যোগ্য ও দায়িত্বশীল নেতা নির্বাচন করতে পারি। পাশাপাশি প্রার্থীরা যে ইশতেহার দিচ্ছেন, নির্বাচিত হওয়ার পরেও যেন তাঁদের ইশতেহার অনুযায়ী কাজ করেন, সেই প্রত্যাশা থাকবে।”
শিক্ষার্থী তানভীর কবীর সোহান বলেন, “সকল রাজনৈতিক দলের উচিত সহিংসতা ও উগ্রতার পথ পরিহার করে একটি সুষ্ঠু, স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন নিশ্চিত করা, যেখানে জনগণ নির্বিঘ্নে ও নির্ভয়ে তাদের পছন্দের প্রতিনিধিকে ভোট দেওয়ার সুযোগ পাবে। একই সঙ্গে গণভোটের বিষয়টি নিয়ে সাধারণ জনগণের মাঝে স্পষ্ট ও বিভ্রান্তিমুক্ত ধারণা প্রদান করা জরুরি, যাতে তারা সচেতনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারে। এছাড়া রাজনৈতিক দলগুলোকে কেবল ক্ষমতার রাজনীতিতে সীমাবদ্ধ না থেকে শিক্ষা, বিদেশি বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, সরকারি চাকরিতে স্বচ্ছ ও মেধাভিত্তিক নিয়োগ, দুর্নীতি দমন, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং ব্যাংকিং ব্যবস্থার সংস্কারসহ গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলোতে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। যে-সব ব্যক্তি বিভিন্ন ক্ষেত্রে উচ্চশিক্ষিত এবং নিজ নিজ ফিল্ডে দক্ষ যেমন : শিল্প, ক্রীড়া, বাণিজ্য, শিক্ষা কিংবা অন্যান্য পেশাগত ক্ষেত্রে তাদের সমন্বয়ে একটি দক্ষ ও যোগ্য মন্ত্রীপরিষদ গঠনের সুস্পষ্ট অঙ্গীকার রাজনৈতিক দলগুলোর কাছ থেকে প্রত্যাশিত। প্রকৃত অর্থে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় অনুষ্ঠিত একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনই পারে দেশকে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার পথে এগিয়ে নিতে এবং তরুণ প্রজন্মের মনে ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে আশার সঞ্চার করতে।”
তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী মোছাঃ শ্রাবণী বলেন, “একজন নতুন ভোটার হিসেবে আমি এমন একটি নির্বাচন প্রত্যাশা করি, যেখানে ভোটাধিকার প্রয়োগ হবে সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণভাবে। নির্বাচন যেন ভয়মুক্ত পরিবেশে অনুষ্ঠিত হয় এবং প্রত্যেক নাগরিক নির্ভয়ে তার পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিতে পারে, এটাই আমার নতুন ভোটার হিসেবে চাওয়া। নির্বাচনের পর দেশের যে বড় রাজনৈতিক জোটই জনগণের রায়ে ক্ষমতায় আসে, তাদের কাছে প্রত্যাশা থাকবে কিছু মৌলিক বিষয়ে আন্তরিকভাবে কাজ করার। বিশেষ করে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, মানসম্মত শিক্ষা ব্যবস্থা, স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়ন এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ, এই বিষয়গুলোতে বেশি ফোকাস দেওয়া জরুরি। পাশাপাশি বিরোধী দলেরই মতপ্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষা করা এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার দিকেও গুরুত্ব দিতে হবে। এছাড়া একজন নারী নাগরিক হিসেবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে বিষয়টি আমি চাই, তা হলো নারীদের নিরাপত্তা। রাস্তাঘাটে চলাচল, কর্মক্ষেত্র কিংবা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যেন নারীরা নির্ভয়ে ও সম্মানের সঙ্গে চলতে পারে এ জন্য কার্যকর আইন প্রয়োগ ও সামাজিক সচেতনতা জরুরি। একজন নতুন ভোটার হিসেবে আমি চাই নির্বাচিত সরকার জনগণের কথা শুনুক, শুধু প্রতিশ্রুতি নয় বরং বাস্তব কাজের মাধ্যমে মানুষের আস্থা অর্জন করুক এবং দেশের ভবিষ্যৎ গঠনে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করুক।”
শিক্ষার্থী মোঃ রেজোয়ানুল হক রাদ বলেন, “আমার দৃষ্টিতে, আমি আগামী নির্বাচনে যেন সহিংসতা না হয় সেটি প্রত্যাশা রাখবো। তারই সাথে সবাই যেন নির্বিঘ্নে ভোটকেন্দ্রে গিয়ে তার নিজের ভোট নিজে দিতে পারে, সেই আশা রাখবো এবং সেটি হওয়ার জন্য প্রত্যেক রাজনৈতিক দলকে নিজ নিজ নেতা কর্মীদের ঐভাবে নির্দেশনা দিয়ে রাখতে হবে। যেন ভোট কেন্দ্রে কোনো বিশৃঙ্খলা না হয়। প্রথম ভোটার হিসাব এ আমার অনুভূতি মিশ্র। কারণ এই জুলাই গণঅভ্যুত্থান এ সম্মুখে থেকে আন্দোলন করার পর ভোট দেওয়ার সুযোগ পাচ্ছি। আমার মাঝে এই ভোট দেওয়ার উৎসাহ ও উদ্দীপনা অনেক কিন্তু একটু ভীতি ও কাজ করছে, কারণ নির্বাচনী সহিংসতা আমরা সবাই যদি নিজ নিজ জায়গা থেকে সচেতন বা সতর্ক না থাকি, যেমন ভোট এর প্রচারণা থেকে শুরু করে ভোট শেষ হয়ে সরকার গঠন পর্যন্ত, তাহলে যে-কোনো সময় পতিত শক্তি দেশ এর মানুষের ক্ষতি করার জন্য চেষ্টা করতে পারে। বড় যে ২টা জোট রয়েছে তাদের প্রত্যেক এর কাছেই প্রত্যাশা থাকবে, তাদের প্রতিশ্রুতি গুলো তারা ৩ টি ভাগে ভাগ করে জনগণ এর সামনে তুলে ধরুক। সব সময় সব দল স্বল্পমেয়াদি প্রতিশ্রুতি দিয়ে নির্বাচন এ ইশতেহার গুলা সাজিয়ে জনগণ এর ভোট নেওয়ার চেষ্টা করে কিন্তু আমরা তরুণ প্রজন্ম এবার চাই, তারা ৩ টি ভাগে তাদের পরিকল্পনা জনগণ সহ তরুণ প্রজন্মের ভোটারদের মাঝে তুলে ধরুক এবং এই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন হয়েছে কিনা সেটা আমরা তরুণ প্রজন্ম লক্ষ্য রাখবো এবং প্রতিশ্রুতি পূরণ না হলে সরকার এর কাছে জবাব চাইবো।”
চতুর্থ বর্ষের আদিবাসী শিক্ষার্থী সুজীব চাকমা বলেন, “একজন বাংলাদেশি হিসেবে আমি চাই নির্বাচন সুষ্ঠু হোক। আমরা দেখেছি পূর্ববর্তী সময়ে নির্বাচনগুলোতে ভোট কারচুপি হতো যার ফলে জনগণ তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারত না। কিন্তু পাঁচ তারিখের পর আমরা স্বৈরাচার পতনের পর একটু সুষ্ঠু নিরপেক্ষ নির্বাচনের আশা করছি। এছাড়া আমি একজন আদিবাসী হিসেবে চাইব দলীয় প্রার্থীরা তারা যেন আদিবাসীদের নিয়ে ভাবেন। বিশেষ করে পাহাড় এবং সমতল উভয়ে যেন সমান অধিকার পাই। বিশেষ করে চিকিৎসা, শিক্ষা, বাসস্থান। নির্বাচিত হওয়ার পর দলগুলো এগুলো নিয়ে কাজ করবেন বলে আমি প্রত্যাশা করি।”
চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী মোঃ মারুফ মোল্লা বলেন, “একজন শিক্ষার্থী ও এদেশের সচেতন নাগরিক হিসেবে এটাই প্রত্যাশা যে, যাঁরাই ক্ষমতায় আসবে তারা যেন শহিদ শরীফ ওসমান হাদী ভাইয়ের খুনিদের বিচার করে মৃত্যুদণ্ড নিশ্চিত করে। এদেশের মানুষের পাঁচটি মৌলিক অধিকার শিক্ষা, স্বাস্থ্য, খাদ্য, বাসস্থান ও বস্ত্র নিশ্চিতে কাজ করে। আর এদেশের প্রত্যেকটা সেক্টরে যে পরিমাণ দুর্নীতি, ঘুস ও চাঁদাবাজি হয় সেগুলো প্রতিরোধে যেন ভবিষ্যৎ ক্ষমতাসীন ব্যক্তিবর্গ ও এদেশের প্রশাসন কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করে। এদেশের দুই-তৃতীয়াংশ বেকার মানুষ হলো এদেশের শিক্ষিত যুবসমাজ। ক্ষমতাসীনরা যেন বেকারদেরকে তাদের যোগ্যতানুসারে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে। প্রবাসীদের হয়রানি কমাতে যথোপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করে। আর সবচেয়ে এলার্মিং বিষয় হলো প্রকৃত অপরাধীদের সঠিক বিচার ও শাস্তি কার্যকরের মাধ্যমে আইন সবার জন্য সমান হয় সেটা নিশ্চিত করা। অপরাধীকে যেন একজন অপরাধী হিসেবেই ট্রিট করে বিচার নিশ্চিত ও শাস্তি কার্যকর করা হয়। এর মধ্যে যেন তার রাজনৈতিক, সামাজিক বা ধর্মীয় পরিচয় বিচারকার্য ও শাস্তি কার্যকরকে ত্বরান্বিত না করে। দিনশেষে শহিদ শরীফ ওসমান হাদী ভাইয়ের ইনসাফের বাংলাদেশ গড়ার জন্য কাজ করে। তবে একজন মুসলিম হিসেবে আমি এদেশে খিলাফত প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখি, যেটা আব্রাহাম লিংকনের এই গণতন্ত্র দিয়ে প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব না।”
খুলনা গেজেট/এনএম



