বুধবার । ২৮শে জানুয়ারি, ২০২৬ । ১৪ই মাঘ, ১৪৩২

গণভোট : সিদ্ধান্তের মালিক জনগণ, সরকার নয়

পলাশ রহমান

গণতন্ত্র মানে শুধু পাঁচ বছর পরপর ভোট দেয়া নয়। গণতন্ত্র মানে দেশের বড় বড় সিদ্ধান্তে জনগণের কথা শোনা। সেই সুযোগটা তৈরি করে দেয় গণভোট। যখন কোনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সরাসরি জনগণের মত জানতে চাওয়া হয়, তখন সেটাই হয় প্রকৃত গণতন্ত্রের চর্চা।

বাংলাদেশে রাজনীতি নিয়ে মানুষের আস্থার সংকট নতুন কিছু নয়। বহুবার দেখা গেছে, ক্ষমতার সিদ্ধান্ত জনগণের ঘাড়ে চাপিয়ে দেয়া হয়েছে। এই অনৈতিক বন্দোবস্ত থেকে বেরিয়ে ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় নির্বাচনের দিনে- ‘জুলাই সনদ’ নিয়ে গণভোটের উদ্যোগ একটি ইতিবাচক এবং গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। কারণ এতে জনগণ শুধু প্রতিনিধি নয়, দেশের ভবিষ্যৎ নিয়েও সরাসরি মত দেয়ার সুযোগ পাচ্ছে।

গণভোটের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো- এখানে সিদ্ধান্তের মালিক জনগণ। সংসদে বসে কয়েকজন রাজনীতিক নয়, দেশের গণমানুষ বলে দেয় তারা কী চায়। রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা একে বলেন, জনগণের সার্বভৌম ক্ষমতার প্রকাশ। সহজ কথায়, এটি জনগণের হাতে দেশের চাবি তুলে দেয়া।

অনেকে বলেন, গণভোট অপব্যবহারের ঝুঁকি আছে। হ্যাঁ, কিছু ঝুঁকি আছে। কিন্তু সেই ঝুঁকির ভয়ে জনগণকে সিদ্ধান্তের বাইরে রাখা কি ঠিক? কোনো কিছু ভুলভাবে ব্যবহৃত হতে পারে বলে কি আমরা সেই জিনিস ব্যবহার করব না? বরং স্বচ্ছতা, নিরপেক্ষতা এবং সবার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করা জরুরি।

অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে গণভোটের গুরুত্ব আরো বেশি। কারণ এই সরকারের প্রধান কাজ জনগণের হাতে ক্ষমতা ফিরিয়ে দেয়া। রাজনৈতিক সংস্কারের মাধ্যমে জনআকাঙ্ক্ষার বাংলাদেশ তৈরি করার পদক্ষেপ নেয়া। জনগণ যদি গণভোটে ‘হ্যাঁ’ বলে, তাহলে সেটি হবে সংস্কারের পক্ষে স্পষ্ট সমর্থন। আর যদি ‘না’ বলে, তা মেনে নেয়া গণতন্ত্রের সৌন্দর্য।
গণতন্ত্র মানে শুধু নিজের পছন্দের রায় পাওয়া নয়; গণতন্ত্র মানে জনগণের রায় মেনে নেয়ার মানসিকতা থাকা। গণভোট সেই মানসিকতার একটি সাধারণ পরীক্ষা।

অন্তর্বর্তী সরকার হ্যাঁ বা না’র পক্ষে সরাসরি অবস্থান না নিয়ে- গণভোটের মূল বিষয়টি সহজভাবে জনসম্মুখে তুলে ধরা উচিত, যাতে জনগণ প্রভাব মুক্তভাবে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারে। হ্যাঁ বা না’র পক্ষে অবস্থান নিয়ে জনমত গঠন করবে রাজনৈতিক দলগুলো। এর মাধ্যমে জনগণ বুঝতে পারবে কারা নতুন বন্দোবস্তের বাংলাদেশ চায়, কারা চায় না। কাদের হাতে আগামীর বাংলাদেশের নেতৃত্ব নিরাপদ বা অনিরাপদ।

সব মিলিয়ে বলা যায়, গণভোট কোনো ভয়ের বা প্রভাব বিস্তারের বিষয় নয়। এটি জনগণের ওপর রাষ্ট্রের আস্থার প্রকাশ। সিদ্ধান্ত সঠিক না ভুল, তা পরে বিবেচ্য হবে। সিদ্ধান্ত নেয়ার অধিকার যদি জনগণের হয়, সেটাই হবে নতুন বন্দোবস্তের প্রথম পদক্ষেপ।

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক, কলামিস্ট।

 

খুলনা গেজেট/এনএম




খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন