বুধবার । ২৮শে জানুয়ারি, ২০২৬ । ১৪ই মাঘ, ১৪৩২

নামাজ ও খুশু খুজু

মোঃ আবদুর রহমান

প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ক ও জ্ঞানসম্পন্ন মুসলমানের জন্য দিনে ও রাতে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করা ফরজ। এই পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ হলো-ফজর, জোহর, আসর, মাগরিব ও এশা। রাসুল (সাঃ) যখন মিরাজে গমন করেন, তখন আল্লাহ তায়ালা পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ফরজ করেন রাসুল (সাঃ) ও তার উম্মতের ওপর। নামাজ এক প্রকারের নেয়ামত। এটি সর্বাপেক্ষা উত্তম দোয়া বা প্রার্থনা। মানুষের জন্য এ প্রার্থনার বিধান দান করে আল্লাহ তায়ালা মানুষের প্রতি অশেষ অনুগ্রহ করেছেন। নামাজ মুমিনদের আধ্যাত্মিক উন্নতির পাথেয় ও মেরাজ।

নামাজের গুরুত্ব বোঝাতে গিয়ে রাসুল (সাঃ) বলেছেন , “নামাজ বেহেশতের চাবি (তিরমিজি: ৪, মুসনাদে আহমাদ: ১৪৬৬২)।” কারো হাতে কোনো ঘরের চাবি থাকলে যেমন অতি সহজেই ঘরে প্রবেশ করতে পারে, তেমনি যে ব্যক্তি নামাজ আদায় করে সে অতি সহজেই জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে। দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায়ের মাধ্যমে মহান আল্লাহর সাথে তার বান্দার সরাসরি যোগাযোগ স্থাপন হয়। আর এ জন্যই একজন মুসলিমের জীবনে নামাজের গুরুত্ব অপরিসীম। কারণ আল্লাহ তায়ালার কাছে প্রিয় ইবাদত হলো নামাজ।

খুশু-খুজু বা বিনয় ও নম্রতা হচ্ছে নামাজের প্রাণ। নামাজের যাবতীয় ফজিলত, প্রভাব ও উপকারিতা এই খুশু-খুজুর সাথেই সম্পৃক্ত। খুশু-খুজুর সাথে নামাজ আদায় করলে নামাজ সতেজ ও প্রাণবন্ত হয়। আর খুশু-খুজুবিহীন নামাজ প্রাণহীন-আত্মাহীন লাশের মতো। তাই নামাজে খুশু-খুজু অবলম্বন করা একজন মুমিন বান্দার জন্য একান্ত আবশ্যক।

নামাজে খুশু-খুজুর গুরুত্ব অপরিসীম। খুশু বা একাগ্রতা নামাজের প্রাণ। খুশুহীন নামাজ প্রাণহীন ইবাদত। তাই ইবাদতের প্রকৃত স্বাদ আস্বাদনের জন্য খুশু তথা একাগ্রতার কোনো বিকল্প নেই। কিন্তু বর্তমানের যান্ত্রিক ও প্রযুক্তি নির্ভর জীবনে একাগ্রচিত্তে নামাজ আদায় করা বেশ কঠিন হয়ে পড়েছে। অথচ একাগ্রতাবিহীন নামাজ দায়সারা ও শারীরিক ব্যায়ামের উপকারিতা ছাড়া তেমন কিছুই বয়ে আনে না। মহান আল্লাহর কাছে এমন নামাজের মূল্য নেই। এসব নামাজিদেরকে আল্লাহ তায়ালা নিন্দা জ্ঞাপন করেছেন এবং শাস্তির অঙ্গীকার করেছেন।

পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন, “অতএব দুর্ভোগ সেসব নামাজির জন্য, যারা তাদের নামাজের ব্যাপারে উদাসীন (সুরা মাউন: ৪-৫)।”

এই আয়াতের ব্যাখ্যায় ইবনে কাসির (রহঃ) বলেন, “তারা নামাজের ব্যাপারে উদাসীন। অর্থাৎ প্রথম ওয়াক্তে নামাজ না পড়ে অধিকাংশ সময় শেষ ওয়াক্তে নামাজ পড়ে। অথবা উদ্দেশ্য হলো- নামাজের রুকন, শর্ত, ফরজ, ওয়াজিব ও সুন্নাহগুলো আদায়ের ব্যাপারে অলসতা দেখায় এবং যেভাবে আদেশ করা হয়েছে সেভাবে আদায় করে না। আরেকটি ব্যাখ্যাও এমন হতে পারে যে, তারা নামাজের মধ্যে মনোযোগ ঠিক রাখে না, আল্লাহ তায়ালার কাছে সমর্পিত হয় না এবং নামাজের মুহুর্ত নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করে না। মোটকথা ‘উদাসীন’ শব্দটি প্রতিটি ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হতে পারে। উপরোল্লিখিত যে কাজটি কেউ করবে সে এই আয়াতের অন্তর্ভুক্ত বলে গণ্য হবে। আর যার মাঝে সবগুলোই পাওয়া যাবে, সে এই আয়াতের পরিপূর্ণ প্রয়োগক্ষেত্র হিসেবে বিবেচিত হবে এবং বাস্তবিক ক্ষেত্রেই নিফাক ও কপটতা পূর্ণাঙ্গরূপে তার মাঝে প্রকাশ পাবে (তাফসিরে ইবনে কাসির: ৮/৪৯৩)।”

খুশু-খুজু অর্জনের জন্য নামাজের রুকনগুলো (রুকু, সেজদা, কিয়াম) শান্ত ও ধীরস্থিরভাবে আদায় করতে হবে। নামাজে রাসুল (সাঃ) অত্যন্ত ধীরস্থিরভাবে রুকনগুলো আদায় করতেন, যাতে প্রত্যেকটি অঙ্গ তার যথাযথ স্থানে অবস্থান করে (সিফাতুস সালাহ: ১৩৪, আল-ফাতহ: ২/৩০৮)। তিনি বলেন, “এই নিয়মে নামাজ আদায় না করলে তোমাদের কারো নামাজ সঠিক হবে না (সুনানে আবু দাউদ: ৮৫৮)।”

তড়িঘড়ি ও ঠোকর মারার মতো করে নামাজ আদায় করে কখনো নামাজে খুশু হাসিল করা যায় না। বরং ধীরতা-স্থিরতা ছাড়া কখনো খুশু অর্জন করাই সম্ভব হয় না। নামাজে মুসল্লির যত বেশি ধীরস্থিরতা বজায় থাকবে, তার খুশু-খুজু তত বেশি বাড়বে। খুশু-খুজুর পরিমাণ যত কম হবে, তাড়াহুড়োর পরিমাণ তত বেশি হবে। তাছাড়া নামাজে মুসল্লি এমনভাবে অহেতুক নড়াচড়া করবে যার সাথে ইবাদতের প্রতি ভালোবাসা, একাগ্রতা ও বিনয়ের আদৌ কোনো সম্পর্ক নেই। ইবাদাতের বাস্তবিক কোনো প্রাণ তাতে দেখা যাবে না।

একজন সফল মুমিনের প্রধান বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, সে খুশু-খুজু সহকারে নামাজ আদায় করবে। যারা খুশু সহকারে নামাজ আদায় করে, আল্লাহ তায়ালা তাদের প্রশংসা করেছেন। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন, “অবশ্যই মুমিনগণ সফল হয়েছে, যারা নিজেদের নামাজে বিনয় ও নম্রতা (খুশু-খুজু) অবলম্বন করে (সুরা মুমিনুন: ১-২)।”
আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে পরিপূর্ণ খুশু-খুজুর সাথে নামাজ আদায় করার তাওফিক দান করুন, আমিন।

লেখক : সম্পাদক মাসিক সারস পূর্ব রূপসা, খুলনা।

 

খুলনা গেজেট/এনএম




খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন