খুলনা মহানগরীর ব্যস্ততম এলাকা নিরালা মোড়। পাশে রয়েছে ময়লার স্তূপ। দুর্গন্ধে এলাকা পার হওয়া দায়। ওই ময়লার স্তুপ থেকে মানুষের ফেলে দেওয়া প্লাস্টিক সামগ্রী, লোহা, কাগজের প্যাকেট কুড়িয়ে বিক্রি করে চলে অনেকের সংসার। অনেকেই এ পেশায় জড়িতদের ঘৃণার চোখে দেখলেও নোংরা ঘেটেই চলে ওদের জীবন-জীবিকা।
ডাস্টবিনের ময়লা থেকে পরিত্যক্ত বস্তু সংগ্রহ করা নাজিরঘাটের আব্দুস সাত্তার গাজী বলেন, “কেউ বিপদে না পড়লে এই পেশায় আসে না। আমি ও বিপদে পড়ে এসেছি। ডাস্টবিনের ময়লা ঘেটে প্লাস্টিক, লোহা ও কাগজসহ ভাঙারি মালামাল সংগ্রহ করি। এগুলো বিক্রি করে উপার্জিত অর্থ দিয়ে চলে আমাদের তিন সদস্যের সংসার। শুধু আমার একার নয় আরো কয়েকটি পরিবারের সংসার চলে এই ডাস্টবিন থেকে।”
তিনি বলেন, “আগে আমরা নাজিরঘাট এলাকায় বসবাস করতাম। কিন্তু হঠাৎ বাবার মৃত্যুর পর আমার এসএসসি পরীক্ষা দেওয়া হয়নি। একপর্যায় লেখাপড়া বন্ধ হয়ে যাই। অবশেষে চলে যাই গ্রামের বাড়ি কয়রা। পরে ফিরে এসে নাজিরঘাট এলাকায় কিছুদিন ব্যাবসা করি। শুরু করি ছোট একটা ব্যাবসার। ব্যাবসায় লোকসান হওয়ার কারণে পুঁজি হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে যাই। অবশেষে বিনা পুঁজির এই পেশা বেছে নেই। গত চার বছর ধরে এ পেশায় আছি। দিনে ৪ থেকে ৫শ টাকা আয় হয়। রোজগার কম বেশি ময়লা আসার ওপর নির্ভর করে। সমাজের বিত্তশালী পরিবার থেকে আসে এসব ময়লা। এখানে আমরা তিনজন এ কাজের সাথে আছি।” অন্যান্য এলাকায় আরো বহু সংখ্যক মানুষ এ পেশায় জড়িত রয়েছে।
একই পেশায় কর্মরত আসমা বেগম বলেন, “শিশু সন্তানসহ আমাকে ছেড়ে স্বামী চলে গেছে। মেয়েটা পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ে। সংসার চালাতে অনেক কষ্ট হয়। বাবা-মা, দুই ভাই ও ভাবিদের নিয়ে একসাথে থাকি। সংসারের খরচ সামলাতে কৈয়া বাজার থেকে প্রতিদিন এখানে আসি। আমার বাবা আগে এ কাজের সাথে জড়িত ছিল। তার দেখাতেই এ পেশায় আসা। প্রতিদিন একই রকম আয় হয় না। ময়লা-আবর্জনা আসার উপর নির্ভর করে উপার্জন। ময়লা ঘেটে সংগ্রহ করা ভাঙারি মালামাল ক্রয় করতে ক্রেতারা এখানে আসে।”
গল্লামারি এলাকায় কাগজ ও বোতল কুড়ানো জামিলা বেগম বলেন, “আমর সংসার চালানের মত কেউ নেই। আয় রোজগার করতে না পারলে না খেয়ে থাকতে হবে। স্বামী নেই। রেললাইনের পাশের বস্তিতে অনেক কষ্ট থাকি। অনেক সময় না খেয়ে দিন কাটে। প্রথম প্রথম ময়লার ভিতর থেকে এগুলো কুড়াতে অনেক কষ্ট হত, ঘৃণা লাগতো, গন্ধে বমি আসতো। এখন এগুলো সয়ে গেছে, ঘৃণা লাগে না, বমিও আসে না। এক এক দিন এক এক রকম আয় হয়। কারো কাছে হাত পাতার চেয়ে কাজ করে খাওয়া ভালো।
শুকুর আলী শিকারি বলেন, “সকালে বস্তা নিয়ে বের হই। সারাদিন ড্রেন, ডাস্টবিন, রাস্তার পাশে ও খালের পাড় থেকে প্লাস্টিকের খালি বোতল সংগ্রহ করি। সেগুলো ভাঙারি দোকান বিক্রি করে সংসার চলে। কখনো কখনো দিনমজুরের কাজ পেলে সেদিন আর বোতল কুড়াই না।”
নিরালা আবাসিকের বাসিন্দা আবু বকর সিদ্দীক বলেন, “রিজিকের মালিক আল্লাহ। কার কখন কোন জায়গা থেকে রিজিকের ব্যবস্থা হবে তা আল্লাহ ভালো জানেন। এরা যে কারো কাছে হাত না পেতে ভাঙারি সংগ্রহ করে সংসার চালাচ্ছে এটা একটা ভালো কাজ। অন্যের উপর বোঝা না হয়ে নিজেরা আয় করছে।”
পথচারী আসদুজ্জামান বলেন, “এই ময়লার স্তূপের পাশ থেকে দুর্গন্ধে যাওয়া যায় না। এখান থেকে যাতায়াতকারীরা নাকে হাত দিয়ে রাস্তা পারাপার হয়। আর সেখানে জীবিকার তাগিদে ময়লার ভিতর দিয়ে প্লাস্টিকের বোতল কুড়িয়ে সংসার চালাচ্ছে ওরা। তারা চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই করছে না। কাজ করে খাচ্ছে।”
খুলনা গেজেট/এনএম



