ফি বছর গণমাধ্যমের পাতায় প্রকাশিত হয় ভারত পেঁয়াজ, সেদ্ধ চাল, কাঁচা পাট আমদানি রপ্তানি নিষিদ্ধ সংক্রান্ত প্রতিবেদন। পেঁয়াজ একসময় ভারত নির্ভরশীল ছিল। ড. ইউনুস সরকার ভিনদেশ থেকে এ পণ্য আনার অনুমতি দেয়। এতে বাজার স্থিতিশীল হয়। এরপরও ভরা মৌসুমে ৫০ টাকা দরে কিনতে হচ্ছে। আমাদের রাজনীতিকদের চিৎকারে তিস্তা ও ফারাক্কার পানির ইস্যু আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডল পর্যন্ত গড়ায়। তারপরও কূটনৈতিক পর্যায়ে আলোচনায় বারবার বলা হয় দু’দেশের মধ্যে পনেরো বছর পর বাংলাদেশ নামক ভূখণ্ডের মানুষ সীমান্তে ফেলানী হত্যার কথা ভোলেনি।
পশ্চিমবঙ্গ সীমান্ত দিয়ে দিনে রাতে পুশ-ব্যাক হচ্ছে। সীমান্তে বিজিবি হত্যা ও নিরীহ মানুষ হত্যা থেমে নেই। সময় ও প্রসঙ্গ নিয়ে এ বিষয়গুলো আলোচনায় আনতে হয়েছে। দিল্লি ছয় মাস ধরে বলছে বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় জাতীয় নির্বাচনে যারা ক্ষমতায় আসবে তাদের সঙ্গে বন্ধুত্ব সম্পর্ক বজায় রাখবে সরকার। গেল মাসে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুর শোক জাতি এখনও কাটিয়ে উঠতে পারেনি। বেগম জিয়ার মৃত্যুর পর ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর শোকার্ত চিঠি বয়ে নিয়ে আসেন সেদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয় শঙ্কর। ভারতের প্রধানমন্ত্রীর লেখা চিঠিটি তিনি তারেক রহমানের হাতে তুলে দেন। চিঠির ভাষা ছিলো বেগম জিয়ার আদর্শের ওপর ভিত্তি করে তার দল এগিয়ে যাবে। দু’দেশের গভীর ও অংশীদারিত্বকে আরও সমৃদ্ধ করতে তারেক রহমানের নেতৃত্বদানকারী ভূমিকা নিয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করেন (প্রথম আলো, ২ জানুয়ারি, ২৬)।
বিএনপি’র তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের সাথে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সংক্ষিপ্ত আলোচনা করেন। বৈঠকে আলোচনা হয় দু’দেশের একসঙ্গে কাজ করার কোনো বিকল্প নেই।
জয় শঙ্কর বলেছেন, দু’দেশের মধ্যে সমস্যা থাকতে পারে কিন্তু আলোচনার মাধ্যমে সম্পর্ক এগিয়ে নেয়া সম্ভব। এ আলোচনার পর সপ্তাহ পর না হতেই আইপিএল’এ কলকাতা নাইট রাইডার্স থেকে তারকা ক্রিকেটার মোস্তাফিজকে বাদ দেওয়ার রীতিমতো হৈ চৈ পড়েছে। খোদ সরকারও সোচ্চার হয়েছে। আইপিএল’র সম্প্রচার নিষিদ্ধ করেছে। বাঙালি বিষয়টি ইতিবাচক হিসেবে দেখেছে। বিসিবির দৃষ্টিতে তারকা ক্রিকেটারের মর্যাদার ওপর আঘাত হানা। বিএনপি’র মহাসচিব মির্জা ফকরুল ইসলাম আলমগীর সামাজিক অনুষ্ঠানে এ প্রসঙ্গ নিয়ে বলেছেন, এটি জাতির মর্যাদার ওপর আঘাত।
ক্রিকেট বিশ্লেষকরা বলেছেন, “বিষয়টি যদি দ্রুত সমাধান না হয়, তাহলে বাংলাদেশ-ভারত ক্রিকেট সম্পর্কের ইতিহাসের এ নজিরবিহীন অধ্যায় হয়ে উঠতে পারে।” পাকিস্তান ক্রিকেট দলের সাবেক অধিনায়ক শহীদ আফ্রিদির অভিমত মোস্তাফিজকে আইপিএল থেকে বাদ দেওয়া শুধু বাংলাদেশ নয়, পুরো ক্রিকেট বিশ্বের জন্য লজ্জাকর (যুগান্তর, ৭ জানুয়ারি ২৬)। প্রসঙ্গটি ভারতের ক্রিকেট জগতেও আলোচনায় এসেছে। ২০০৮ সালে মুম্বাই হামলার পর ২০০৯ সাল থেকে আইপিএল’এ পাকিস্তানের ক্রিকেটারদের অংশগ্রহণ নিষিদ্ধ হয়। বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের বিরুদ্ধে কিন্তু তারা কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। মোস্তাফিজ ছাড়া আরও ছয়জন ক্রিকেটারকে এবার নিলামে অংশগ্রহণ নিতে দিয়েছে। এক্ষেত্রে প্রশ্ন বিসিআইসি কেন আটকালো না। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুথানের পর ভারতের ক্রিকেট দলের বাংলাদেশ সফর স্থগিত করে। সব জেনেও বিসিআইসি আইপিএল’র নিলামে বাংলাদেশের খেলোয়াড়দের অংশগ্রহণ আটকায়নি।
বাংলাদেশে হিন্দু নিধন ও নির্যাতনের নানা গুজব দেড় বছর ধরে ভারত থেকে আসছে। বিশেষ করে বিজিবির বিধায়ক সুভেন্দু অধিকারী এ নিয়ে বেশ জোরেশোরে কথা বলেন। ভারত সরকার বাংলাদেশিদের ঢালাও ভিসা দেওয়া বন্ধ করেছে। ভারত যে যুক্তিটি প্রদর্শন করছে সেটি খোঁড়া। ২০১২ সালের শেষ দিকে পাকিস্তানি ক্রিকেট দলের ভারত সফর বন্ধ করার চেষ্টা করা হয়।
খেলাধুলা, সংস্কৃতি ও রাজনীতিকে একই দৃষ্টিতে দেখা ঠিক নয়। বেগম জিয়ার মৃত্যুর পর ভারতের সরকার প্রধানের চিঠিতে বন্ধুত্বের সম্পর্কের যে আলো উঁকি দিয়েছিলো তা খানিকটা ম্লান হয়েছে। বার্তা বাহক এস জয় শঙ্করের দীর্ঘ নিশ্বাস ছাড়া আর কোনো উপায় থাকলো না। আগামী দূর্গাপূজায় ইলিশ ও গ্রীষ্ম মৌসুমে আম উপহার দেওয়ার বিষয়টি যেন গণতান্ত্রিক সরকার আমলে নেন। এতকিছুর পরও মোংলা সমুদ্র বন্দর ব্যবহারের বিষয়টিও গুরুত্ব সহকারে দেখতে হবে।
খুলনা গেজেট/এনএম
