আসন্ন টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের (আইসিসি) নিরাপত্তা বিভাগের চিঠি প্রকাশের পর বিশ্ব ক্রিকেট যেন নতুন এক বিতর্কে ঢুকে পড়েছে। বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) শুরু থেকেই ভারতের ভেন্যু নিয়ে নিরাপত্তা শঙ্কার কথা জানিয়ে আসছিল। বিসিবি আনুষ্ঠানিকভাবে ই-মেইলের মাধ্যমে ভেন্যু পরিবর্তনের অনুরোধ জানায়। আইসিসি পাল্টা জানতে চায়-কী ধরনের নিরাপত্তা ঝুঁকি? বিসিবি তথ্যসহ সেই ব্যাখ্যাও দেয়। কিন্তু এরপর যে উত্তর আসে, সেটি শুধু বিস্ময়কর নয়, রীতিমতো অপমানজনক।
আইসিসির নিরাপত্তা বিভাগের চিঠিতে বলা হয়েছে, তিনটি কারণে ভারতে বাংলাদেশের খেলাটা নিরাপদ নয়-
এক, দলে মোস্তাফিজুর রহমান থাকলে ঝুঁকি বাড়বে। দুই, সমর্থকেরা যদি জাতীয় দলের জার্সি পরে ঘোরাফেরা করেন। তিন, বাংলাদেশে জাতীয় নির্বাচন যত এগিয়ে আসবে, তত ঝুঁকি বাড়বে।
এই তিনটি ‘কারণ’ যদি সত্যিই নিরাপত্তা মূল্যায়নের অংশ হয়, তবে বলতে হয়-বিশ্ব ক্রিকেটের অভিভাবক সংস্থা হয় বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন, নয়তো ইচ্ছাকৃতভাবে বাস্তবতাকে বিকৃত করছে।
প্রথম প্রশ্ন-মোস্তাফিজুর রহমান কেন নিরাপত্তা ঝুঁকি? তিনি কি কোনো রাজনৈতিক নেতা? কোনো উগ্র মতাদর্শের মুখপাত্র? না। তিনি বাংলাদেশের একজন আন্তর্জাতিক মানের ক্রিকেটার, আইসিসির স্বীকৃত টুর্নামেন্টে নিয়মিত অংশগ্রহণকারী একজন পেশাদার খেলোয়াড়। তাঁকে দলে রাখলে যদি নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়ে, তাহলে সেই ঝুঁকি কার কাছ থেকে? দর্শকদের? কোনো উগ্র গোষ্ঠীর? নাকি রাষ্ট্রেরই কোনো অংশে!
এই প্রশ্নের উত্তর আইসিসি দেয়নি। আর উত্তর না দেওয়াটাই প্রমাণ করে-এটি নিরাপত্তা বিশ্লেষণ নয়, বরং একটি নির্দিষ্ট পরিবেশের ভয়াবহ স্বীকারোক্তি। অর্থাৎ এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, যেখানে একটি দেশের জনপ্রিয় ক্রিকেটার মাঠে নামলেই সমস্যা হতে পারে-এটা স্বীকার করেই আইসিসি আসলে বলছে, ভারতীয় ভেন্যু বাংলাদেশের জন্য নিরাপদ নয়।
দ্বিতীয় কারণ আরও বিস্ময়কর। বলা হয়েছে, বাংলাদেশের সমর্থকেরা যদি জাতীয় দলের জার্সি পরে ঘোরাফেরা করেন, তবে ঝুঁকি বাড়বে। প্রশ্ন হলো—বিশ্বকাপ কি তবে সমর্থকশূন্য মাঠে হবে? বিশ্বকাপে জাতীয় জার্সি পরা কি অপরাধ? যদি একটি দেশের সমর্থক নিজের দলের জার্সি পরে নিরাপদ না থাকেন, তবে সেটি নিরাপত্তা ব্যর্থতা নয় কি?
ফুটবল বিশ্বকাপে ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, জার্মানির জার্সি পরে সমর্থকেরা একে অপরের দেশে যান। অলিম্পিকে পতাকা হাতে দর্শক বসে। সেখানে আইসিসির এই বক্তব্য শুধু হাস্যকর নয়, ভয়াবহ রকমের বিপজ্জনক নজির স্থাপন করে।
তৃতীয় কারণটি সবচেয়ে অযৌক্তিক। বলা হয়েছে, বাংলাদেশে জাতীয় নির্বাচন যত এগিয়ে আসবে, তত ভারতের মাটিতে বাংলাদেশের দলের নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়বে। এর কোনো যুক্তিসংগত ব্যাখ্যা নেই। বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার সঙ্গে ভারতের ভেন্যুতে বাংলাদেশের খেলোয়াড়দের নিরাপত্তার সম্পর্ক কোথায়?
এই বক্তব্য আসলে একটাই সত্য প্রকাশ করে-ভারতের ভেতরের কিছু সামাজিক ও রাজনৈতিক শক্তি এমন পর্যায়ে প্রভাবশালী, যারা প্রতিবেশী দেশের ঘটনাপ্রবাহের প্রতিক্রিয়া মাঠে নামা ক্রিকেটারদের ওপর ফেলতে পারে। আর সেই শক্তির সামনে নতি স্বীকার করছে আইসিসি।
যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা অধ্যাপক আসিফ নজরুল এই চিঠিকে সরাসরি ‘উদ্ভট’ বলে আখ্যায়িত করেছেন। তাঁর প্রশ্ন অত্যন্ত যৌক্তিক-আইসিসি কি আসলেই একটি গ্লোবাল অর্গানাইজেশন, নাকি তারা কার্যত একটি নির্দিষ্ট দেশের প্রভাববলয়ে বন্দী?
বিশ্ব ক্রিকেটে ভারতের অর্থনৈতিক প্রভাব অস্বীকার করার উপায় নেই। সম্প্রচারস্বত্ব, স্পনসরশিপ, বাজার-সবখানেই ভারতের আধিপত্য। কিন্তু সেই অর্থনৈতিক প্রভাব কি নিরাপত্তা বিশ্লেষণকেও নিয়ন্ত্রণ করবে? যদি করে, তবে সেটি ক্রিকেট নয়, একচেটিয়া রাজনীতির মঞ্চ।
বিসিবির সূত্র বলছে, এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে ভেন্যু পরিবর্তনের চিঠি আসেনি। কিন্তু আইসিসির নিরাপত্তা বিভাগের বক্তব্যই প্রমাণ করে-ভারতে বাংলাদেশের খেলা নিরাপদ নয়। সেক্ষেত্রে ভেন্যু পরিবর্তন ছাড়া অন্য কোনো নৈতিক বিকল্প নেই।
শ্রীলঙ্কা, সংযুক্ত আরব আমিরাত কিংবা পাকিস্তান-এই দেশগুলো বহু আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্ট সফলভাবে আয়োজন করেছে। যদি সেখানে নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত হয়, তবে বাংলাদেশের ম্যাচগুলো সেখানে আয়োজন করাই যুক্তিসঙ্গত।
বিষয়টি এখন শুধু ক্রিকেটের নয়, জাতীয় সম্মানের। বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের বক্তব্যে সেই অনুভূতিই প্রতিফলিত হয়েছে-একজন ক্রিকেটারকে অপমান মানে একটি দেশকে অপমান করা।
বাংলাদেশ কোনো দেশের বিরুদ্ধে নয়, কিন্তু নিজেদের সম্মান ও নিরাপত্তা প্রশ্নে আপস করারও সুযোগ নেই। যদি আইসিসি মনে করে বাংলাদেশের সেরা খেলোয়াড় ছাড়া দল গঠন করতে হবে, সমর্থকদের জার্সি খুলে রাখতে হবে-তাহলে সেটি ক্রিকেট নয়, শর্তসাপেক্ষ আত্মসমর্পণ।
আইসিসির চিঠি আসলে একটি স্বীকারোক্তি-ভারতের মাটিতে বাংলাদেশের জন্য পরিবেশ বৈরী। এখন প্রশ্ন একটাই-আইসিসি কি সেই বাস্তবতার সঙ্গে সৎ থাকবে, নাকি শক্তিশালী বাজারের চাপেই সত্যকে ঢেকে রাখবে?
বিশ্ব ক্রিকেট আজ এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। এই সিদ্ধান্তই বলে দেবে-ক্রিকেট সত্যিই বৈশ্বিক খেলাই থাকবে, নাকি ক্ষমতাধরদের একচেটিয়া খেলার মাঠে পরিণত হবে।
লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট
email: niazjournalist@gmail.com
খুলনা গেজেট/এনএম
