বুধবার । ১৪ই জানুয়ারি, ২০২৬ । ৩০শে পৌষ, ১৪৩২
ইতিবাচকভাবে দেখছে র‌্যাব

আলোর পথে ফিরতে চায় ‘দুলাভাই বাহিনী’

নীতিশ সানা, কয়রা

প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্যের লীলাভূমি সুন্দরবনে এক সময় আতঙ্ক সৃষ্টি করেছিল জলদস্যুরা। অপহরণ ও ডাকতিসহ নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের অভয়ারণ্য ছিল এই বন। জেলে বাওয়ালি থেকে শুরু করে পর্যটকরাও থাকতো আতঙ্কে। ২০১৮ সালের নভেম্বর মাসে আত্মসমর্পণে মধ্যে দিয়ে সুন্দরবন দস্যুমুক্ত ঘোষণা করা হলেও সাত বছর পর আবারও সুন্দরবনে আতঙ্ক সৃষ্টি করছে ১৪ থেকে ১৫টি জলদস্যু বাহিনী। জেলে, বাওয়ালি ও মৌয়ালিসহ বনজীবীদের জিম্মি করে মুক্তিপণ আদায় করছেন তারা। এমনকি মুক্তিপণ না দিতে পারায়, অনেক জেলের উপর চালানো হয় নির্মম নির্যাতন।

আত্মসমর্পণের পর কেন আবার এই পেশায় ফিরে আসলেন সেই ব্যাপারে কথা হয় জলদস্যু দুলা ভাই বাহিনীর সদস্য আক্কাস আলীর (ছদ্মনাম) সাথে।

তিনি খুলনা গেজেটকে বলেন, “এই জীবন যে কত কষ্টের যারা দস্যুতা করে তারাই জানে। এটা কোনো জীবন না। ২০১৮ সালে ছোট্ট রাজু বাহিনীর সাথে আত্মসমর্পণ করেছিলেন আক্কাস আলী। পুনরায় এ পেশায় ফিরে আসার ইচ্ছা ছিল না তার।”

আক্কাস আলী জানান, “আত্মসমর্পণের পর তাকে একটি হত্যা মামলায় প্রধান আসামি করা হয়। সে মামলায় আটক করে চরম নির্যাতন চালানোর হয়। জামিন নিয়ে বের হয়ে গা ঢাকা দেন তিনি। ২০২৪ সালে গণ-অভ্যুত্থানের পরে যখন দুলা ভাই বাহিনী সুন্দরবনে দস্যুতা শুরু করে তখন মনের দুঃখে আবারও যোগ দেন এই অন্ধকার পেশায়। তিনি দস্যুতা ছেড়ে আবারও স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে চান। তবে তার একটাই শর্ত মিথ্যা মামলা থেকে মুক্তি দিতে হবে।” তিনি অভিযোগ করে বলেন, মিথ্যা মামলা ও হয়রানির কারণে আজ দস্যু পেশায় ফিরে আসতে বাধ্য হয়েছেন তিনি।

কথা হয় আরেক সদস্য রহিম উদ্দিনের (ছদ্মনাম) সাথে। তিনি এ পেশায় নতুন। ২০০৯ সালে একটি হত্যা মামলায় তাকে প্রধান আসামি করা হয়। তখন তিনি দেশ ছেড়ে ভারতে পালিয়ে যান। দীর্ঘদিন পরিবার ফেলে সেখানেই বসবাস করতে থাকেন। এক সময় পরিচয় হয় দুলা ভাই বাহিনীর সাথে। গণ-অভ্যুত্থানের পরে যখন দুলা ভাই বাহিনী দস্যুতা শুরু করেন, তখন যোগাযোগ করে চলে আসেন অন্ধকার জীবনে। তিনি বলেন, “হয়রানিমূলক মিথ্যা মামলার কারণে ক্ষোভে দুঃখে এই পেশা বেছে নিয়েছি।”

দুলা ভাই বাহিনীর প্রধান রবিউল ইসলাম। পেশায় ছিলেন বনজীবী। তার বাড়ি কয়রা উপজেলার মহেশ্বরীপুর গ্রামে। রাজনৈতিক দল হিসেবে জামায়াতে ইসলামীকে সমর্থন করতেন। তিনি সুন্দরবনে মাছ ধরার পাশাপাশি অবৈধভাবে সুন্দরবনের কাঠ পাচারের সাথে জড়িত ছিলেন। তার দাবি তিনি জামায়াতে ইসলামী দল করায় আওয়ামী লীগের কয়রা উপজেলার সাধারণ সম্পাদক ও মহেশ্বরীপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান বিজয় কৃষ্ণ সরদার যে স্থানে ডাকাতি বা অপরাধ সংঘটিত হলে তাকে জড়িয়ে দিতেন। এমন কী জেল থেকে বাড়ি ফিরলেও পুনরায় আবার কোনো না কোনো মামলায় আটক করাতেন। কোনো এক ঠাকুর বাড়ি ডাকাতির মিথ্যা মামলায়ও রবিউলকে আটক করান। বিজয় কৃষ্ণের নির্দেশে তাকে চরম নির্যাতন করে পুলিশ।

অবশেষে জামিনে মুক্তি পেয়ে পরিবার নিয়ে পালিয়ে যান পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে। গণ-অভ্যুত্থানের পর মনের ক্ষোভ নিয়ে দেশে ফিরে দুলা ভাই বাহিনী হিসেবে সুন্দরবনে আত্মপ্রকাশ করেন। তবে দুলা ভাই বাহিনীর সকল সদস্যদের দাবি বনজীবীদের অন্য ডাকাত দলের মতো নির্যাতন করেন না। এ বাহিনীর প্রধান রবিউলসহ সদস্যদের দাবি হয়রানিমূলক মিথ্যা মামলা থেকে মুক্তি পেলে স্বাভাবিক জীবনে ফিরবেন তারা।

র‌্যাব-৬ খুলনার অধিনায়ক লে. কর্নেল নিস্তার আহম্মেদ খুলনা গেজেটকে বলেন, “জলদস্যু বাহিনীর আত্মসমর্পণের বিষয়টিকে আমরা ইতিবাচক হিসেবে দেখছি। জলদস্যু থাকুক এটা আমরা চাই না। তারা যদি আমাদের সঙ্গে কথা বলতে চায় তাহলে আমরা কথা বলবো। ইতঃপূর্বে যারা আত্মসমর্পণ করেছেন, সেই প্রক্রিয়াটি আমার জানা নেই। তবে আইনগত কিছু ব্যাপার আছে, সেগুলো স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত নিয়ে করতে হবে।”

 

খুলনা গেজেট/এনএম




আরও সংবাদ

খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন