বুধবার । ১৪ই জানুয়ারি, ২০২৬ । ৩০শে পৌষ, ১৪৩২

বিচিত্র এই দেশেতে জন্ম আমার!

আবদুল কাদের খান

‘আসিতেছে শুভ দিন,
দিনে দিনে বহু বাড়িয়াছে দেনা,
শুধিতে হইবে ঋণ!’

অমর বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের কথাগুলো মনে আসলো। আসলে কি গত ৫৪ বছরে এই দেশে জানমাল, জীবনের যে ক্ষতি হয়েছে, তা’ কি এই দেশ কোনো দিন পরিশোধ করবে? আর মাত্র এক মাসের মত সময় বাকি, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের। সাধারণ গণমানুষের প্রত্যাশা, বেশ উৎসবমুখর পরিবেশে, স্বচ্ছ ভাবে, অবাধ- নিরপেক্ষভাবে এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। দেশের মানুষের কাছে ইতোমধ্যে যারা দলীয় মনোনয়ন এবং সরকারিভাবে যাচাই-বাছাইয়ের পর টিকে গেছেন তারা এখন মাঠে ময়দানে কথা বলছেন।

সত্যি কথা বলতে কি, ২০০৮ থেকে ২০২৪ দীর্ঘ সাড়ে ১৫ বছরের রক্ত পিচ্ছিল, উদ্বেগ উৎকণ্ঠা ভরা দিনগুলোর কথা দেশের সাধারণ মানুষ আজও ভুলতে পারেনি। সে বিচারে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অত্যন্ত অর্থবহ। ২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর এ পর্যন্ত এই হতভাগা জাতি আরো তিনটি নির্বাচন পরোখ করেছে, ২০১৪, ২০১৮, ২০২৪ সালে। তবে সে নির্বাচনে সরকারি মতলব বাজি ছাড়া, জনগণের কোনো সক্রিয় অংশগ্রহণের সুযোগ ছিল না। বরং এ অনিয়মের বিষয়ে দুঃসাহসী ভাবে কোনো সাংবাদিক কিছু লিখলে তার নামে ডি এস এ বা Digital Security Act এ সত্য কথা লেখার দায়ে তৎক্ষণাৎ মামলা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট সাংবাদিকের বিরুদ্ধে। সরকারের কোনো এমপি’র দুর্নীতির বিরুদ্ধে লিখলে সাংবাদিককে তৎক্ষণাৎ কারা রুদ্ধ করা হয়েছে, ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে। সত্য বলার অপরাধে মামলা হয়েছে সাংবাদিক এর উপর, হামলা হয়েছে এবং কুখ্যাত খুনি দাগি আসামির মত নিরীহ সাংবাদিককে কারাগারে নিক্ষেপ করা হয়েছে যৎতৎক্ষণ!

জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে পিলখানায় নারকীয় হত্যাকাণ্ড, শাপলা চত্বরে তসবিহ, জায়নামাজের পাটি আর চিড়ে মুড়ি নিয়ে আসা নিরীহ আলেমদের বিরুদ্ধে কুরআন পোড়ানোর মিথ্যে অভিযোগ দিয়ে রাতের অন্ধকারে একটি প্রতিবেশী দেশের সংকেতে ফ্যাসিস্ট হাসিনা প্রশাসন কর্তৃক নির্বিচার গণহত্যা চালানো হয়। কুখ্যাত ডাইনি হাসিনার শাসন আমল কে দীর্ঘস্থায়ী করতে কত মানুষকে যে গুম, খুন আর অপহরণ করা হয়েছে, তার ইয়াত্তা নেই। তার প্রকৃত হিসাব কিংবা সুষ্ঠু বিচার আজও হয়নি। ২০২৬ সালে ভাষা সংগ্রামের মাসের মধ্যভাগে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের কথা মনে হতেই গত ১৫-১৬ বছরের রক্তিম ইতিহাস মনে পড়লো।

ভিন্নমত অবলম্বনের দায়ে বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের অপ্রতিদ্বন্দ্বী দুঃসাহসী সাংবাদিক নেতা রুহুল আমিন গাজীকে বারবার কারাগারে নিক্ষেপ করা হয়। হামলা হুমকি মামলা জেলজুলুম সর্বশেষে রিমান্ডে নিয়ে বেপরোয়া শারীরিক নির্যাতন করা হয়। প্রথিতযশা সাংবাদিক রুহুল আমিন গাজীর অপরাধ, সরকার কর্তৃক সাংবাদিক নির্যাতনের নিপীড়নের বিরুদ্ধে তিনি ছিলেন আপসহীন। তাই তার কণ্ঠ চির স্তব্ধ করে দেওয়ার জন্য বহু রকম মিথ্যে মামলা দিয়ে তাকে হয়রানি ও নিগৃহীত করা হয়। তখন বাংলাদেশের হাসিনা সমর্থক মিডিয়া তাকিয়ে তাকিয়ে দেখেছে, কোনো প্রতিবাদ করা প্রয়োজন মনে করেনি। আমাদের দেশের মিডিয়া মোগলরা তখন মুখে কুলুপ এটে মজা দেখেছে। শুধু তাই নয়, তারা সরকারকে প্রকাশ্যে গোপনে এই বলে উসকে দিয়েছে, যে এই ধরনের (তাদের ভাষায়) ষড়যন্ত্রকারী, সন্ত্রাসী সাংবাদিকের বিরুদ্ধে যোগ্য ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।

নির্বাসিত সাংবাদিক ইলিয়াস হোসাইন এর কথা এসে গেল। চুয়াডাঙ্গার মাটির বিপ্লবী সন্তান দুঃসাহসী অনুসন্ধানী সাংবাদিক ইলিয়াস হোসাইন একুশে টিভি চ্যানেলে একুশের চোখ এ দেশ জাতির মনের কথা, তাদের বেদনা পরিহাস, বঞ্চনা ও দুঃখের কথা তুলে ধরায়, সরকারের বিরুদ্ধে যাওয়ায়, তাকে মামলা দিয়ে গ্রেপ্তার, এবং রিমান্ডে নিয়ে নির্যাতন করা হয়। সেই ত্যাগী সাংবাদিক দীর্ঘ ১৫-১৬ বছর ধরে দেশের মানুষের পক্ষে কাজ করে যাচ্ছেন। অথচ আমরা তার সবকিছুই বিস্মৃত হয়েছি। জুলাই বিপ্লবে এই সাংবাদিক আপোষহীন অহংকারী ভূমিকা পালন করেছে।

তার নির্বাসিত দেড় যুগের ইতিহাস সত্যিই গৌরবের। কিন্তু সে আজও দেশে ফিরতে পারেনি, মামলা ভারে জর্জরিত। হাসিনার কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়ার পর সুদূর আমেরিকায় নির্বাসিত জীবন যাপন করছেন কিন্তু যারা ক্ষমতাসীন হয়ে জুলাই বিপ্লবের সুফল ভোগ করছেন, এদের কথা একটুও মনে রাখেননি।

এভাবে এসে পড়ে সাংবাদিক ডক্টর কনক সরোয়ারের কথা। তিনি বাংলাদেশে হাসিনার ফ্যাসিস্ট সরকারকে চ্যালেঞ্জ করে জাতীয়তাবাদী দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক জিয়ার বক্তব্য প্রচার করায় তার ওপর নির্যাতনের খড়গ নেমে আসে। হাসিনা সরকারের হিংস্র দানবেরা তাকে কারাগারে নিক্ষেপ করে। নির্যাতন জুলুম এবং নানাভাবে নিপীড়ন করে দীর্ঘপ্রায় এক বছর কারা প্রকোষ্ঠে রেখে বিভিন্ন ইতর স্টাইলে নির্যাতন করে। বর্তমানে আমেরিকায় নির্বাসিত এই সাংবাদিক এতটা ঝুঁকি নিয়ে জাতির কাছে তারেক জিয়ার ভাষণ প্রচার করে সরকারের রোষের শিকার হন। ইনি এখনো পর্যন্ত আমেরিকায় নির্বাসিত কিন্তু কাল পরিবর্তন হলেও তার আর দেশে ফেরা হয়নি। তাদের এই ধরনের আত্মত্যাগের কথা কোনো রাজনৈতিক দল, কোনো নেতা এতটুকুও মনে রাখেন নি। ঘটনার আরো শেষ একটু কাহিনী আছে। হাসিনা সরকারের পতনের প্রায় শেষ মুহূর্তে সাংবাদিক কনক সরোয়ারের নির্দোষ ছোট বোনকে মিথ্যে মামলায় জড়িয়ে সন্ত্রাসী তকমা দিয়ে শিশু বাচ্চাদের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন করে নির্দয়ভাবে কারাগারে নিক্ষেপ করা হয়। কারারুদ্ধ সেই বোন নিজেই এখনো জানে না কি অপরাধে তাকে কারারুদ্ধ করা হয়েছিল! এইসব নির্দয় ইতিহাস পেছনে ফেলে সামনে আসছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। কিন্তু তাদের ত্যাগের মূল্যায়ন কি আগামীতে যে সরকার নির্বাচিত হবে, তারা কি একটুও বিবেচনা করবে?

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিন ঘনিয়ে আসছে দ্রুত। কিন্তু মনে পড়ছে যশস্বী সাংবাদিক শফিক রেহমানের কথা। বাংলাদেশের কিংবদন্তি সাংবাদিক শফিক রেহমান। সত্য বলার অপরাধে হাসিনা সরকার তাকে কারারুদ্ধ করে হেনস্তা করেছে। বিবিসি খ্যাত শফিক রেহমান এবং তার সহধর্মিনী তালেয়া রেহমান দু’জনই বিবিসি সাংবাদিক ছিলেন। শুধু জাতীয়তাবাদী দলের সমার্থক হওয়ায় এই সাংবাদিককে ৮২ বছর বয়সে নিগৃহীত হতে হয়। শেখ হাসিনা পুত্র সজীব ওয়াজেদ জয় অপহরণ মিথ্যে মামলায় তাকে বাংলাদেশে আটক করা হয় এবং কারাগারে নিক্ষেপ করা হয়। কারা নির্যাতন নানা জুলুম হয়রানি করা হয়, এই বরেণ্য সাংবাদিকের উপর। কারা প্রকোষ্ঠে সেলের মধ্যে আটকে রেখে এমন অমানবিক আচরণ করা হয় যে মল মূত্র ত্যাগের ক্ষেত্রেও এই বৃদ্ধ সাংবাদিককে কষ্ট পোহাতে হয়, কমোডে ছাড়া মলত্যাগ করতে পারেন না, তাকেই সাধারণ নিম্নমানের ওয়াশরুমে মলত্যাগ করতে বাধ্য করা হয়। শুধু তাই নয়, তাকে সাধারণ দাগি আসামিদের মত জেলখানার মেঝেতে কষ্টকর ভাবে কোনো সুযোগ সুবিধা বঞ্চিত করে রাখা হয়, সেখানেই ঘুমাতে হয়।

এবার আর একজন দুর্ভাগ্য পীড়িত নিরীহ বরেণ্য সাংবাদিকের কথা বলি। প্রায় শত বছরের বাসিন্দা অত্যন্ত প্রবীণ সাংবাদিক দৈনিক সংগ্রাম সম্পাদক আবুল আসাদ। তাকে দাগি, খুনি আসামির মত টানা হেঁচড়া করে গ্রেপ্তার করে জেলখানায় জুলুম চালানো হয়। ক্যান্সার আক্রান্ত স্ত্রীর মৃত্যু হয়েছে, তাকে পেরোলেও মুক্তি দেয়া হয়নি। এই হচ্ছে আমাদের দেশের একজন সাংবাদিকের হাসিনা সরকারের কাছে পাওনা। বিবেকহীন পিশাচিনী হাসিনা সরকার যখন এ ধরনের বীভৎস অত্যাচার জুলুম এর মত কর্মকাণ্ড চালাচ্ছিল, তখন এদেশের জনকণ্ঠ, বাংলাদেশ প্রতিদিন, কালের কণ্ঠ, মানবকণ্ঠ, প্রথম আলো, ডেইলি স্টার এর মত হাসিনার সমার্থক পত্রিকা গুলো, মহা ফুর্তিতে শেখ হাসিনার ডাইনি সরকারের গুণগানে মত্ত ছিল। একটানা জুলুমবাজ সরকারের গুনো গান করে চলেছে ওইসব পত্রিকা গুলো। এত এত অপরাধের সহায়ক মিডিয়াগুলো এখনো বহাল তবিয়তে রয়েছে, তাদের কারো অপরাধের বিচার হয়নি এখনো! এটাই আমাদের বাংলাদেশ!

সর্বশেষ ছোট্ট একটু কথা বলি- বাংলাদেশের বর্তমান সময়ের অপ্রতিদ্বন্দ্বী কণ্ঠ হাসিনার আমলে নানাভাবে নির্যাতিত, বারবার হামলা মামলার শিকার মাহমুদুর রহমান। তার জননন্দিত পত্রিকা আমার দেশ এর মর্গ (যেখানে প্রকাশিত সমস্ত পত্রিকা জমা ছিল) জ্বালিয়ে দেওয়া হয়। তাকে কারারুদ্ধ করে তার পত্রিকার জ¦ালিয়ে দিয়ে, ছাপাখানার মেশিনপত্র ভেঙ্গে চুরে নিয়ে যায় সরকারের সন্ত্রাসী বাহিনী। নানাভাবে তার প্রিন্টিং প্রেস ধ্বংস করা হয়। অথচ মাহমুদুর রহমান বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার আমলে নির্বাসিত জীবন শেষে দেশে ফিরে মিথ্যে মামলার হাজিরা দিতে গেলে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার তাকে কারারুদ্ধ করে। তারই সংগ্রামের ফসল এই সরকারের আইন বিচারবিভাগ তাকে জেলে নিক্ষেপ করে। এই জন্যই বোধ হয় বিশ্ব বিখ্যাত বীর বিশ্বজয়ের একপর্যায়ে ভারতবর্ষের প্রান্তে এসে নদীর জলে সরা ভরা দেখে তার প্রধান সেনাপতিকে বলেছিলেন, সেলুকাস কি বিচিত্র এ দেশ! আমারও বলতে ইচ্ছে হলো, বিচিত্র এই দেশ এই দেশেতে জন্ম আমার! জন্মই আমার আজন্ম পাপ!

লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট

 

খুলনা গেজেট/এনএম




আরও সংবাদ

খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন