বুধবার । ১৪ই জানুয়ারি, ২০২৬ । ৩০শে পৌষ, ১৪৩২

ডুমুরিয়ায় নদী ভাঙনে ভিটেহারা বাঁশতলা গ্রামের ২৫ পরিবার

সুব্রত কুমার ফৌজদার, ডুমুরিয়া

ডুমুরিয়ায় নদী ভাঙনে পৈতৃক ভিটে হারিয়ে ছিন্নমূল পরিবেশে আজও বসবাস করছে বাঁশতলা গ্রামের বাসিন্দারা। একশ’ বিঘা নিয়ে বিস্তীর্ণ গ্রামটির সিংহ ভাগ চলে গেছে নদী গর্ভে। এ নিয়ে দু’গ্রামের প্রায় ২০০ বিঘা সম্পত্তি নদীতে বিলীন হয়েছে। ৬ বছর আগে গ্যাংরাইল নদীতে দেখা দেয় ভয়াবহ এ ভাঙন। বাস্তুহারা হয়ে পড়েছে গ্রামের ২৫ পরিবার। প্রাকৃতিক দুর্যোগ এলেই ঝুঁকির মধ্যে সারাক্ষণ দিন কাটে তাদের। সরকারি কোটি কোটি টাকা দিয়ে ভাঙন রোধ করার চেষ্টা করা হলেও আজও টেকসই সুরহা হয়নি। ফলে নদী ভাঙন আতঙ্ক কাটছে না বাঁশতলা ও লতাবুনিয়া গ্রামবাসীর।

সরেজমিনে ঘুরে এবং স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ডুমুরিয়া উপজেলার সাহস ইউনিয়নাধীন নদী বেষ্টিত খানিকটা ব-দ্বীপের মতো ভূমিখণ্ডের উপর বাঁশতলা ও লতাবুনিয়া গ্রাম। এর দক্ষিণ-পশ্চিমে গ্যাংরাইল নদী এবং পূর্ব-উত্তরে ভদ্রা নদী। প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে নদীতে পানির চাপ বৃদ্ধি পেলে ঝুঁকির মধ্যে থাকে গ্রাম দুটি। নদী ভাঙনে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বাঁশতলা গ্রাম। একশ বিঘা ফসলি জমি নিয়ে বিস্তীর্ণ গ্রামের ৮৫ বিঘা জমি গ্যাংরাইল নদী গর্ভে চলে গেছে। পার্শ্ববর্তী লতাবুনিয়া গ্রামটি প্রায় ৯শ’ বিঘা সম্পত্তির উপর। নদী ভাঙনে এ গ্রামেরও প্রায় ১০০ বিঘা সম্পত্তি বিলীন হয়ে গেছে।

২০০০ সাল থেকে নদীতে ভাঙন শুরু হয়। খরগ্রোতা গ্যাংরাইল নদীর প্রবল গ্রোতে কয়েকবার ভয়াবহ ভাঙনের মুখে পড়ে গ্রাম দুটি। মুহূর্তের মধ্যে বিলীন হয়ে যায় বাঁশতলা গ্রামের ২৫টি পরিবারের বসতবাড়ি ও ফসলি জমি। এ গ্রামে যাতায়াত ব্যবস্থা খুবই অনুন্নত। বাঁশের সাঁকোই গ্রামবাসীর চলাচলের একমাত্র ভরসা। নেই একটিও ডিবটিউবওয়েল। বিশুদ্ধ খাওয়ার পানি নদী পার হয়ে আনতে হয়। দু’গ্রামে প্রায় ২শ’ পরিবারের বসবাস।

এর মধ্যে নদী ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে বিষ্ণুপদ গাইন, অসীম গাইন, রনজিৎ মন্ডল, চিত্তরঞ্জন মন্ডল, বিধান মন্ডল, নিহার মন্ডল, সচিন্দ্রনাথ গাইন, সঞ্জয় গাইন, রমেশ গাইন, নিরঞ্জন গাইন, অরবিন্দু গাইন, জ্যোতিন গাইন, উজ্জ্বল মন্ডল, কাঙাল মন্ডল, শিবপদ মিস্ত্রি, দিপংকর মিস্ত্রিসহ অন্তত ২৫ পরিবার স্বপ্নের আশ্রয়স্থল ছেড়ে বিভিন্ন জায়গায় আশ্রয় নিয়ে মানবিক ও অনিশ্চিত জীবনযাপন করছেন।

বাঁশতলা গ্রামের বাস্তুহারা বিষ্ণুপদ গাইন (৫২) জানান, “বসতবাড়িসহ তাদের ৫ বিঘা পৈতৃক সম্পত্তি ৬ বছর আগে নদী ভাঙনে চলে গেছে। এখন সরকারি খাস জমির উপর ঠাঁই পেয়েছেন তিনি। সেখানে বসতবাড়ি তৈরি করে পরিবার নিয়ে বসবাস করছেন।” ভাঙনরোধে টেকসই সমাধানের দাবি জানিয়েছেন তিনি।

সুপর্ণা গাইন বলেন, “তাদের ১০ বিঘা সম্পত্তি এবং বসতবাড়ি নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। সহায় সম্বল হারিয়ে তাদের মত অনেকেই সরকারি জমির উপর আশ্রয় খুঁজে নিয়েছে।”

সচীন্দ্রনাথ গাইন জানান, ৪/৫বছর আগে গ্যাংরাই নদী ভাঙনে আমাদের বাঁশতলা গ্রামের সিংহভাগ বিলীন হয়ে যায়। এরপর গ্রামের মানুষ বিভিন্ন জায়গায় আশ্রয় নেয়। আমাদের জমি ভেঙে নদীর ওপারে (শিবনগর গ্রাম) চর উঠেছে। ক্ষতিগ্রস্ত গ্রামবাসী সেই জমি দখল করে কৃষি ফসল উৎপাদন করছে। আমাদের পৈতৃক জমি ফিরে পাওয়ার জন্য আদালতে মামলা করেছি। মামলা নং ৩৬৯/২২।

স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান মোল্যা মাহাবুবুর রহমান জানান, “বাঁশতলা-লতাবুনিয়া গ্রাম দুটির দক্ষিণ পাশে গ্যাংরাইল নদী ভাঙনে অনেক জমি বিলীন হয়ে গেছে। ভাঙনে বছরে পানি উন্নয়ন বোর্ড অনেক টাকা বরাদ্দে বাঁধে মেরামতের কাজ করেছিলো। কিন্তু টেকসই কোনো ব্যবস্থা আজও হয়নি।”

গত বর্ষা মৌসুমেও ইউনিয়ন পরিষদ থেকেও কাজ করা হয়েছে। তবুও ভাঙনের ঝুঁকি রয়েছে। এখানে বড় ধরনের বরাদ্দে টেকসইভাবে গ্রাম রক্ষা বাঁধ করার জন্য ইতোমধ্যে ইউএনও সাহেবের কাছে বিষয়টি বলা হয়েছে। তাছাড়া বাঁশতলা গ্রাম ভেঙে শিবনগরের পার ভরাট হয়েছে। ওই চরভরাটি জমিতে ক্ষতিগ্রস্ত জমির মালিকরা কৃষি আবাদ করছে। তবে সেখানে কিছু দুষ্টু প্রকৃতির লোক তাদেরকে বাধা দিচ্ছে।

সুপেয় পানির বিষয়ে তিনি বলেছেন, “গোলাইমারী যেমন ডিববোরিং স্থাপন করে সেখান থেকে গ্রামে পানি গ্রামাঞ্চলে সাপ্লাইয়ের ব্যবস্থা করা হয়েছে। ঠিক ওই আদলে বাঁশতলা গ্রামেও ডিব বোরিং করার পরিকল্পনা রয়েছে।”

 

খুলনা গেজেট/এনএম




আরও সংবাদ

খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন