বুধবার । ১৪ই জানুয়ারি, ২০২৬ । ৩০শে পৌষ, ১৪৩২

সুন্দরবনগামী পর্যটকরা কতটা নিরাপদ?

জাহাঙ্গীর আলম

অনুমোদনহীন রিসোর্ট মালিকদের চটকদারি অফার আর অবৈধভাবে বনে প্রবেশ করায় অপহরণ হচ্ছে পাসবিহীন পর্যটক। নেভিগেশনবিহীন নৌযানের কারণে দুর্ঘটনায় পড়ছে পর্যটক জাহাজসহ অন্যান্য নৌযান। নেই সঠিক তদারকি। নিধন হচ্ছে হরিণসহ বন্যপ্রাণী। ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বিশ্বের সবচেয়ে বড় ম্যানগ্রোভ সুন্দরবনের জীব-বৈচিত্র্য। অবৈধভাবে গড়ে ওঠা দাকোপের ঢ্যাংমারী এলাকায় রিসোর্ট গোলকানন। এর মালিক শ্রীপতি বাছাড়। রাজধানী থেকে আগত (নিজেদের দাবি করা পর্যটক) ৪ জনকে সাথে নিয়ে তিনি গত ২ জানুয়ারি অবৈধভাবে ঢ্যাংমারী এলাকার কেনুর খালে প্রবেশ করেন। ওই দিন বিকেলে ডাকাতদল তাদেরকে অপহরণ করে। ৫ জানুয়ারি সকালে তাদেরকে উদ্ধার করে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা।

শুধু গোলকানন নয়, দেশের অন্যতম প্রধান প্রাকৃতিক সম্পদ বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবনের কোলঘেঁষে প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকায় একের পর এক গড়ে উঠছে এরকম রিসোর্ট ও কটেজ। বনের গাছ কেটে, খাল ভরাট করে খুলনায় এ পর্যন্ত ৩৫টির মতো রিসোর্ট গড়ে তোলা হয়েছে, এমন তথ্য সংশ্লিষ্টদের। আরও কয়েকটির নির্মাণকাজ চলমান রয়েছে। এসব রিসোর্টে আগত অধিকাংশই নানা অনৈতিক কর্মকাণ্ডের সাথে সম্পৃক্ত। বিশেষ করে হরিণের মাংসের জন্য তারা এসব রিসোর্টে রাত্রিযাপন করে। তাছাড়া নানা নেশা দ্রব্য এসব রিসোর্টে সেবন করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, অনেক সময় নারী নিয়েও এসব রিসোর্টে অসামাজিক কাজ করার।

প্রমোদ ভ্রমণে এসে গত বছর ৮ জানুয়ারি ১১ কেজি হরিণের মাংসসহ ৬ জনকে আটক করে কোস্ট গার্ড। আটকদের মধ্যে দু’জন নারীও ছিল। রাজধানীর কেরানিগঞ্জের রবিন, তাইজুল, সাইদুর রহমান ও সোহেল রানা নামে ৪ যুবক ঝিনাইদহ জেলার কালিগঞ্জ উপজেলার কল্পনা আক্তার নাজু ও মুক্তা নামে দু’ নারীকে নিয়ে ভ্রমণে আসে এবং রিসোর্টে রাত্রিযাপন শেষে হরিণের মাংস নিয়ে মাইক্রোযোগে ফেরার পথে আটক হয়। এসব অবৈধ রিসোর্ট গড়ে ওঠায় একদিকে যেমন সুন্দরবনের হরিণ নিধন হচ্ছে, তেমনি নানা অপরাধ কর্মকাণ্ড বেড়ে যাচ্ছে।

তাছাড়া রিসোর্টগুলোতে বিকট শব্দে চলছে জেনারেটর। বাজছে সাউন্ড সিস্টেম। বেশিরভাগ রিসোর্টে স্থাপন করা হয়েছে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র (এসি)। এতে মারাত্মক হুমকিতে পড়েছে প্রাকৃতিক সম্পদ ও জীববৈচিত্র্য। অপূরণীয় ক্ষতি ডেকে আনছে এগুলো। পরিবেশ বিপন্ন হয়ে উঠছে। সেইসঙ্গে ঝুঁকিতে পড়ছে বনের পশুপাখি ও জীবজন্তু।

সংশ্লিষ্টরা জানান, “সুন্দরবনের আশপাশে ৩৫টি রিসোর্ট গড়ে উঠেছে। বিশেষ করে দাকোপ উপজেলার কৈলাশগঞ্জ এবং বানিশান্তা ইউনিয়নে এগুলোর অবস্থান। এসব রিসোর্টে দূর-দূরান্ত থেকে পর্যটকরা আসছেন, যারা বনভূমির নিকটবর্তী এলাকার কোনও একটি রিসোর্টে থেকে কোনো পাশ ছাড়া বনের ভেতরে প্রবেশ করছেন। ফলে সরকার হারাচ্ছে মোটা অঙ্কের রাজস্ব, অন্যদিকে পরিবেশের জন্য হচ্ছে বিপজ্জনক। রিসোর্ট থেকে চিপসের প্যাকেট, প্লাস্টিকের বোতল ফেলে বন-সংলগ্ন নদীর পানি দূষিত করছেন তারা। এসব রিসোর্টের কারণে বনভূমির জীববৈচিত্র্য এবং প্রাকৃতিক ভারসাম্য মারাত্মক হুমকিতে পড়ছে।”

দাকোপ, মোংলা ও কয়রা অঞ্চলে গড়ে ওঠা রিসোর্টে অবস্থানকারী পর্যটকদের কোনো প্রকার নিরাপত্তা দেওয়া হয় না। বিশেষ করে লাউডোব এবং ঢ্যাংমারী এলাকায় একাধিক রিসোর্ট হলেও সেখানে নেই কোনো পুলিশ ক্যাম্প ও কোনো আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর ক্যাম্প। যে কারণে পর্যটকদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

দাকোপ উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোঃ বোরহান উদ্দীন মিঠু জানান, “লাউডোব ও বানিশান্তা এলাকায় ১২/১৩টি রিসোর্ট রয়েছে। সেগুলো তার জানামতে অনুমতি নেই। তাদেরকে তিনি ডেকেছেন। তিনি সকলকে আইনের আওতায় এনে কীভাবে সঠিকভাবে সকল কার্যক্রম চালানো যায় সে রাস্তাই খুজঁছেন বলে জানিয়েছেন।”

এদিকে অপরূপ সৌন্দর্যে ভরপুর সুন্দরবন ভ্রমণে বাড়ছে ভ্রমণপিয়াসীদের ঝোঁক। সেখানে প্রতিবছর ছুটছেন দেশি-বিদেশি লাখ লাখ পর্যটক। মানুষের এই আগ্রহকে সামনে রেখে এগিয়ে এসেছেন পর্যটন ব্যবসায়ীরা। গেল অর্ধ যুগে সুন্দরবন ভ্রমণে পর্যটক টানতে যুক্ত হয়েছে ২৯টি বিলাসবহুল নৌযান। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত এসব নৌযানের কোনো কোনোটিতে সুইমিংপুলসহ তিনতারকা মানের সেবা দেওয়া হয়। এর পেছনে লগ্নি হয়েছে প্রায় ৩০০ কোটি টাকা।

সুন্দরবনে ভ্রমণের একমাত্র বাহন নৌযান। চলতি মৌসুমে ১৪৩টি নৌযান নিয়েছে সুন্দরবনে পর্যটক পরিবহনের অনুমতি। এর মধ্যে ৭২টি লঞ্চ, ৭০টি ট্রলার ও দুটি স্পিডবোট। প্রতিটি লঞ্চের সঙ্গে একটি ট্রলার থাকে। তাদেরও নিবন্ধন নিতে হয়। অনুমোদন নেওয়া ৭২টি ট্রলার লঞ্চের সঙ্গেই বাঁধা থাকে।

বন বিভাগের তথ্যমতে, গেল সেপ্টেম্বর, অক্টোবর ও নভেম্বর মাসে মোট পর্যটক জাহাজ সুন্দরবনে গেছে ২৫৭ ট্রিপ। জাহাজ ট্রিপের ডিসেম্বর মাসের তথ্য তাদের কাছে না থাকলেও গেল ৪ মাসে রাজস্ব আদায় হওয়ার তথ্য রয়েছে। গেল ৪ মাসে রাজস্ব আয় ১ কোটি ৬৬ লাখ ৬৬ হাজার ২৪৪ টাকা। বিদায়ি অর্থ বছরে পর্যটন খাতে খুলনা বনবিভাগ রাজস্ব আয় করে ৩ কোটি ৭ লাখ ৩ হাজার ৭৪৮ টাকা। এর আগে, ২০২৩-২৪ অর্থ বছরে রাজস্ব আয় হয় ২ কোটি ৩৫ লাখ ১৯ হাজার ৬০ টাকা। এত বিশাল পরিমাণে রাজস্ব আয় হলেও সেখানে তদারকি নেই তেমনটি।

সুন্দরবনের করমজল এলাকায় গত ৩ জানুয়ারি রাত আনুমানিক সাড়ে ১০টায় পাইরেটস অফ সুন্দরবন নামে পর্যটক জাহাজ ৪৪ জন যাত্রী নিয়ে খুলনায় আসার পথে ধাক্কা দেয় বালুবোঝাই বাল্কহেড। জাহাজ ছিদ্র হয়ে পানি ঢুকতে থাকে। পরে কোস্ট গার্ড তাদের অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করে। অথচ বাল্কহেডের রাতে চলাচলের কোনো নিয়ম নেই। এভাবে সরকারকে ফাঁকি দিয়ে এক ধরনের অসাধু ব্যবসায়ী নেভিগেশন লাইটবিহীন, লাইফ সাপোর্ট জ্যাকেট ও অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র ছাড়াই নৌযান নিয়ে নদী ও সাগরে চলাচল করছে। ঢুকছে বনে। বিশেষ করে একদিনের মোংলা-করমজল ভ্রমণে মানা হয় না কোনো নিয়ম।

ভরপুর পর্যটন ব্যাবসার আড়ালে চাপা পড়ছে পর্যটকের নিরাপত্তার বিষয়। সুন্দরবন উপকূলে চলাচল-নিষিদ্ধ নৌযানে মেটানো হচ্ছে পর্যটকের ভ্রমণ-তৃষ্ণা। ট্রলার, জালি বোটে বনের গহিনে চলে যাচ্ছেন পর্যটক। আবার বনের ভেতর কোনো পর্যটক হঠাৎ গুরুতর অসুস্থ হলে সেই ব্যক্তিকে উদ্ধারের কোনো পথ নেই।

সুন্দরবন ভ্রমণের উপায় দু’টি। এক, দিনের মধ্যে প্রান্তসীমায় থাকা পর্যটনকেন্দ্র ঘুরে দেখা। অন্যটি, বনের গহিনে ঘুরে বেড়াতে পর্যটকবাহী নৌযানে তিন দিনের সফর। একদিনের জন্য সাধারণত ছোট ট্রলার ও জালি বোট ব্যবহার করা হয়। বনের গহিনে পর্যটকদের জালি বোটে বা ট্রলারে ঢুকতে কোনো পাস দেওয়া হয় না। তবে চোরাই পথে অহরহ প্রবেশ করায় প্রায়ই অপহরণ ও বাঘের আক্রমণের ঘটনা ঘটছে। বন বিভাগ এবং নৌ-পুলিশ ও কোস্ট গার্ডের তেমন তদারকি না থাকায় এসব কর্মকাণ্ড পরিচালনা করা সহজ হচ্ছে।

খুলনা জেলা প্রশাসক আ স ম জামসেদ খোন্দকার বলেন, “সড়ক ও নৌপথ উন্নয়ন, পর্যটকদের নিরাপদ ও উন্নত আবাসন সুযোগ-সুবিধা, নিরাপত্তা ঝুঁকি কমানোর জন্য সঠিক এবং সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণের কাজ হাতে নেওয়া হয়েছে।” সব দপ্তরের সমন্বয়ে একটি যুযোপযোগী পরিকল্পনা গ্রহণের চেষ্টা করা হচ্ছে বলে তিনি জানান।

 

খুলনা গেজেট/এনএম




আরও সংবাদ

খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন