বুধবার । ১৪ই জানুয়ারি, ২০২৬ । ৩০শে পৌষ, ১৪৩২

জনগণের টাকায় নির্বাচন : রাজনীতির নতুন আশাবাদ, নাকি নতুন ঝুঁকি

নিয়াজ মাহমুদ

বাংলাদেশের নির্বাচনী রাজনীতিতে এক নীরব কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণ পরিবর্তন চোখে পড়ছে। দীর্ঘদিন ধরে কালোটাকা, প্রভাবশালী পৃষ্ঠপোষকতা, ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর অনুদান কিংবা দলীয় ক্ষমতার ছায়ায় পরিচালিত নির্বাচনী ব্যয়ের সংস্কৃতির বাইরে গিয়ে একদল নতুন প্রার্থী বলছেন-ভোট হবে জনগণের টাকায়। শব্দবন্ধটি যতটা আকর্ষণীয়, বাস্তবতা ততটাই জটিল।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে চট্টগ্রাম, বরিশাল ও ঢাকাসহ কয়েকটি আসনে যে চিত্র উঠে এসেছে, তা বাংলাদেশি রাজনীতির জন্য একদিকে আশাব্যঞ্জক, অন্যদিকে গভীর প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে।

চট্টগ্রামে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) প্রার্থী জোবাইরুল হাসান আরিফ হলফনামায় জানিয়েছেন, নির্বাচনে তার সম্ভাব্য ব্যয় ২৫ লাখ টাকা-যার পুরোটাই আসবে স্থানীয় জনগণ ও ভোটারদের কাছ থেকে। একজন সাংবাদিক হিসেবে তার বার্ষিক আয় মাত্র সাড়ে তিন লাখ টাকার কিছু বেশি, নেই কোনো স্থাবর সম্পদ। প্রশ্ন ওঠে-এই অর্থ সংগ্রহের পদ্ধতি কতটা স্বচ্ছ, কতটা নিয়ন্ত্রিত এবং কতটা ঝুঁকিমুক্ত?

বরিশাল–৩ আসনে এবি পার্টির প্রার্থী আসাদুজ্জামান ভূঁইয়া ওরফে ফুয়াদের ক্ষেত্রে দেখা যায় আরও বড় চিত্র। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনুদান আহ্বান করে তিনি ইতোমধ্যে নির্বাচন কমিশনের নির্ধারিত ব্যয়সীমা অতিক্রম করেছেন। যদিও তিনি দাবি করছেন, অতিরিক্ত অর্থ বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থাপনার আওতায় আনা হবে এবং সব লেনদেন অডিট করে প্রকাশ করা হবে।

অন্যদিকে ঢাকা–৯ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী তাসনিম জারা সরাসরি ‘ক্রাউড ফান্ডিং’ শব্দটি ব্যবহার করে প্রায় ৪৭ লাখ টাকা সংগ্রহের কথা হলফনামায় উল্লেখ করেছেন। তার আয় ও সম্পদের তুলনায় এ অর্থের পরিমাণ যেমন বিস্ময়কর, তেমনি রাজনৈতিক সংস্কৃতির দিক থেকে তা এক নতুন দিগন্তও বটে।

এই তিনটি উদাহরণ মিলিয়ে একটি বড় প্রশ্ন সামনে আসে-বাংলাদেশ কি ধীরে ধীরে পশ্চিমা গণতন্ত্রের মতো পাবলিক-ফান্ডেড পলিটিক্স বা জনগণনির্ভর নির্বাচনী অর্থায়নের পথে হাঁটছে?

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নির্বাচনী তহবিল সংগ্রহ একটি স্বীকৃত ও নিয়ন্ত্রিত প্রক্রিয়া। যুক্তরাষ্ট্রে ‘স্মল ডোনেশন’ সংস্কৃতি বহু পুরোনো। বারাক ওবামার ২০০৮ সালের নির্বাচনী প্রচারণা ছিল অনলাইন অনুদানভিত্তিক রাজনীতির মাইলফলক। ইউরোপের বহু দেশে রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীদের জন্য রাষ্ট্রীয় অনুদান, সীমিত ব্যক্তিগত চাঁদা ও বাধ্যতামূলক অডিট ব্যবস্থা চালু রয়েছে। আন্তর্জাতিক স্বচ্ছতা সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল এবং OECD বহুবার উল্লেখ করেছে-স্বচ্ছ নির্বাচনী অর্থায়ন গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করে, তবে দুর্বল নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা সেটিকে দুর্নীতির নতুন দরজাও বানাতে পারে। বাংলাদেশের বাস্তবতায় এখানেই সবচেয়ে বড় ঝুঁকি।

নির্বাচন কমিশনের বিধিমালায় মাথাপিছু ব্যয় নির্ধারণ করা হলেও, অর্থের উৎস যাচাই, অনলাইন অনুদানের ট্র্যাকিং, প্রবাসী অর্থের বৈধতা এবং ডিজিটাল ওয়ালেটের স্বচ্ছতা নিয়ে কার্যকর নজরদারি এখনও দুর্বল। বিকাশ, ব্যাংক ট্রান্সফার কিংবা নগদ অনুদান-সব ক্ষেত্রেই প্রশ্ন থাকে: কে দিল, কেন দিল, বিনিময়ে কী প্রত্যাশা?

আজ যাকে ‘জনগণের টাকা’ বলা হচ্ছে, কাল সেটিই কি প্রভাবশালী গোষ্ঠীর ছদ্মবেশী বিনিয়োগে পরিণত হবে না?

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো রাজনৈতিক সমতা। যারা সোশ্যাল মিডিয়ায় জনপ্রিয়, যাদের ব্যক্তিগত ব্র্যান্ডিং শক্তিশালী, কিংবা যারা শহুরে ও প্রবাসী নেটওয়ার্কে যুক্ত—তারা ক্রাউড ফান্ডিংয়ে এগিয়ে থাকবেন। কিন্তু প্রত্যন্ত অঞ্চলের যোগ্য কিন্তু অচেনা প্রার্থীরা কি এই প্রতিযোগিতায় টিকতে পারবেন? ফলে অর্থনীতি ও প্রযুক্তির বৈষম্য রাজনীতিতেও বৈষম্য তৈরি করতে পারে।

তবু এ প্রবণতাকে এককথায় নাকচ করে দেওয়ার সুযোগ নেই। বাংলাদেশের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে ‘মনোনয়ন বাণিজ্য’, কালোটাকা ও পেশিশক্তির অভিযোগ রয়েছে। সেই প্রেক্ষাপটে জনগণের কাছ থেকে প্রকাশ্যে অর্থ সংগ্রহ অন্তত একটি নৈতিক বিকল্প হাজির করছে। তরুণ ও নতুন প্রার্থীদের আত্মনির্ভরশীল হওয়ার সাহস দিচ্ছে, দলীয় অর্থকেন্দ্রিক রাজনীতির বাইরে ভাবার সুযোগ তৈরি করছে।

বিশেষ করে তরুণ ভোটারদের মধ্যে এতে অংশগ্রহণমূলক রাজনীতির অনুভূতি তৈরি হতে পারে। একজন ভোটার যখন ১০০ বা ৫০০ টাকা অনুদান দেন, তখন তিনি নিজেকে শুধু ভোটার নয়, প্রচারণার অংশীদার মনে করেন। এটি রাজনৈতিক সচেতনতা বাড়াতে পারে-যদি প্রক্রিয়াটি স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক হয়।

সুতরাং প্রশ্নটা ‘জনগণের টাকায় ভোট’ হবে কি না-তা নয়। প্রশ্ন হলো, কীভাবে হবে।

এখানে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নির্ধারক। অনলাইন ও ডিজিটাল অনুদানের জন্য আলাদা নীতিমালা, রিয়েল-টাইম রিপোর্টিং ব্যবস্থা, বাধ্যতামূলক থার্ড-পার্টি অডিট এবং নির্বাচন-পরবর্তী পূর্ণাঙ্গ হিসাব প্রকাশ-এসব ছাড়া এই নতুন ধারাটি টেকসই হবে না।

একই সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোরও দায়িত্ব আছে। ক্রাউড ফান্ডিংকে যেন কেবল প্রচারণার স্লোগান হিসেবে ব্যবহার না করা হয়। এটি হতে হবে নীতিনির্ভর, সীমাবদ্ধ ও নৈতিক চর্চা।

বাংলাদেশের গণতন্ত্র এখন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। একদিকে পুরোনো অর্থনির্ভর ক্ষমতার রাজনীতি, অন্যদিকে জনগণনির্ভর অংশগ্রহণমূলক রাজনীতির সম্ভাবনা। ‘জনগণের টাকায় ভোট’ যদি সত্যিই জনগণের হয়, তবে তা গণতন্ত্রের জন্য আশীর্বাদ। আর যদি তা হয় অনিয়ন্ত্রিত অর্থপ্রবাহের নতুন মুখোশ, তবে সেটি হবে আরেকটি গভীর হতাশা।

এই মুহূর্তে আমাদের দরকার উচ্ছ্বাস নয়, সতর্ক আশাবাদ-আর শক্ত নিয়ন্ত্রণের সাহসী সিদ্ধান্ত।

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট

email: niazjournalist@gmail.com

 

খুলনা গেজেট/এনএম




আরও সংবাদ

খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন