অর্থনৈতিক সংকট এবং মুদ্রার রেকর্ড দরপতনের প্রতিবাদে ইরানে চলমান বিক্ষোভ ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। দ্রুতই দেশটির বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভটি ছড়িয়ে পড়ছে। গত ১২ দিন ধরে চলা এই বিক্ষোভে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৪২ জনে দাঁড়িয়েছে বলে জানিয়েছে মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস অ্যাক্টিভিস্ট নিউজ এজেন্সি (এইচআরএএনএ)। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ইরান সরকার দেশজুড়ে ইন্টারনেট সেবা সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে। খবর আনাদোলু ও আল জাজিরার।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরানের সবকটি (৩১টি) প্রদেশে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। বুধবার প্রকাশিত তথ্যে জানানো হয়, নিহতদের মধ্যে ৩৪ জন সাধারণ বিক্ষোভকারী এবং ৮ জন নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য। বিক্ষোভে শত শত মানুষ আহত হয়েছেন এবং এখন পর্যন্ত ২২১৭ জনকে আটক করেছে প্রশাসন। আহতদের বেশিরভাগই ছররা গুলি এবং প্লাস্টিক বুলেটের আঘাতে জখম হয়েছেন বলে জানা গেছে।
অনলাইন মনিটরিং গ্রুপ ‘নেটব্লকস’ নিশ্চিত করেছে, ইরান বর্তমানে দেশব্যাপী ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সংস্থাটি জানায়, বিক্ষোভ দমাতে এবং জনগণের যোগাযোগের অধিকার খর্ব করতে পরিকল্পিতভাবে এই ডিজিটাল সেন্সরশিপ কার্যকর করা হয়েছে। রাজধানী তেহরানসহ মাশহাদ ও শিরাজের মতো বড় শহরগুলোতে ব্যাপক গণবিক্ষোভ শুরু হওয়ার পরপরই এই পদক্ষেপ নেয় কর্তৃপক্ষ।
বিক্ষোভের মূল কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে দেশটির ভঙ্গুর অর্থনীতি এবং স্থানীয় মুদ্রা রিয়ালের নজিরবিহীন দরপতন। বর্তমানে ১ ডলারের বিপরীতে রিয়ালের মান দাঁড়িয়েছে ১৩ লাখ ৫০ হাজার, যা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষ নিত্যপ্রয়োজনীয় চাহিদা মেটাতে হিমশিম খাচ্ছে, যা তাদের রাজপথে নামতে বাধ্য করেছে।
বিক্ষোভের বিষয়ে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারীদের সঠিক জায়গায় ফেরত পাঠাতে হবে। দেশটির প্রধান বিচারপতি গোলাম হোসাইন মহসেনি-এজেই বিক্ষোভকারীদের যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের চর হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন এবং কোনো প্রকার নমনীয়তা না দেখানোর ঘোষণা দিয়েছেন।
অন্যদিকে, ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান বিক্ষোভ মোকাবিলায় সর্বোচ্চ সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানিয়েছেন। তবে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের মতো মানবাধিকার সংস্থাগুলো অভিযোগ করেছে, নিরাপত্তা বাহিনী হাসপাতালের ভেতরে ঢুকে কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ করছে এবং আহত বিক্ষোভকারীদের আটক করছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প এক বিবৃতিতে ইরান সরকারকে সতর্ক করে বলেছেন, যদি তারা বিক্ষোভকারীদের ওপর হত্যাযজ্ঞ চালায়, তবে যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে অত্যন্ত কঠোর আঘাত করবে। পাশাপাশি জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস ইরানি কর্তৃপক্ষকে শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অধিকার বজায় রাখার এবং প্রাণহানি বন্ধের আহ্বান জানিয়েছেন।
উল্লেখ্য, ২০২২-২৩ সালে মাহসা আমিনির মৃত্যুকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা আন্দোলনের পর এটিই ইরানে সবচেয়ে বড় এবং ব্যাপক গণবিক্ষোভ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
খুলনা গেজেট/এনএম
