বুধবার । ১৪ই জানুয়ারি, ২০২৬ । ৩০শে পৌষ, ১৪৩২

ভেনেজুয়েলা আক্রমণ : আরেকটি তেলযুদ্ধের উদ্বোধন নয় তো?

রুশাইদ আহমেদ

গত ৩ জানুয়ারি মধ্যরাতে ভেনেজুয়েলার ঘুমন্ত কারাকাস শহরের বুকে বিস্ফোরণ ঘটিয়ে এক যুগ ধরে দেশটির প্রেসিডেন্টের আসনে থাকা নিকোলাস মাদুরোকে সস্ত্রীক গ্রেপ্তার করেছে মার্কিন বাহিনী। মার্কিনিদের অভিযোগ, মাদুরো ও তাঁর দল কার্তেল দে সোলেস মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে “ফেন্টানিলসহ বিবিধ মাদক চোরাচালানের” সঙ্গে জড়িত। এ ছাড়া, যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসন চাপ বৃদ্ধিতেও মাদুরোর হাত রয়েছে বলে অভিযোগ তাঁদের।

আদতে, এই আগ্রাসনের মধ্য দিয়ে কি বিংশ শতাব্দীর “তেলযুদ্ধ”-এর নতুন আদলের উদ্বোধনী কার্যক্রম শুরু করা হলো? সেই প্রশ্ন এখন সবার মনে।

খোদ একজন রাষ্ট্রপ্রধানের বিরুদ্ধে মাদক চোরাচালানের মতো অভিযোগ তুলে দেশটিতে সরাসরি স্থল অভিযান ও বিমান হামলা চালিয়ে তাঁকে গ্রেপ্তার করে আনার এই নজির ভূরাজনৈতিক অঙ্গণে বিরল হলেও মার্কিনীদের জন্য এটা বাঁ হাতের খেল ছাড়া আর কিছুই নয়। এটা শুধু দৃঢ় মার্কিন সামরিক শক্তির পরিচায়কই নয়, বরং মার্কিন “তেল লালসার” একটা বৃহৎ দৃষ্টান্ত। এক কথায়, এটি ইরাক ও লিবিয়ায় পরিচালিত আগ্রাসনের ধারাবাহিকতাই বটে।

তবে সবচেয়ে চমকপ্রদ দিকটি হলো স্বয়ং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং তাঁর রাজনৈতিক গুরু রয় কোহনের নাম দুর্নীতি, চাঁদাবাজি, অর্থ ও যৌন কেলেঙ্কারির সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে। বিশেষ করে প্রাপ্তবয়স্ক চলচ্চিত্রের অভিনেত্রী স্টর্মি ড্যানিয়েলসকে ২০১৬ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে ঘুষ দেওয়ার অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হয়েছিলেন ট্রাম্প। মার্কিন শীর্ষ যৌন অপরাধী এপস্টেইনের মামলার নথিতেও ডোনাল্ড ট্রাম্পের সম্পৃক্ততা থাকার অভিযোগ রয়েছে। এমনকি গত ডিসেম্বরে এপস্টেইন ফাইলসের একটি নথিতে এপস্টেইনের সঙ্গে ট্রাম্প ও তাঁর স্ত্রী মেলানিয়ার একটি ছবিও প্রকাশ করে মার্কিন বিচার বিভাগ (ডিওজে)। পরে তা সরিয়ে ফেলার পর যুক্তরাষ্ট্রের বিরোধী দল ডেমোক্র্যাট নেতৃবৃন্দের আপত্তিতে পুনরায় পুনঃস্থাপন করা হয়। একইভাবে, তাঁর রাজনৈতিক গুরু রিপাবলিকান আইনজীবী রয় কোহনও চাঁদাবাজি, ব্ল্যাকমেইল ও অর্থ কেলেঙ্কারিতে লিপ্ত ছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

তবে প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর ট্রাম্প যেমন সব অভিযোগের বোঝা থেকে মুক্ত হয়েছেন, তেমনি তাঁর গুরুও ছিলেন সকল আইনি জটিলতার ধরাছোঁয়ার বাইরে। এতসব বিতর্ক থাকা সত্ত্বেও ট্রাম্প প্রশাসন ঘর না সামলে বহির্বিশ্বের দিকে নজর দিয়েছে। হাতে নিয়েছে মনরো নীতির আওতায় ‘ট্রাম্প করোলারি’ নামের এক ভূরাজনৈতিক স্বৈরাচারী নীতি।

মূলত ১৮২৩ সালে পঞ্চম মার্কিন প্রেসিডেন্ট জেমস মনরো এক অদ্ভুত সম্প্রসারণবাদী পররাষ্ট্র নীতি গ্রহণ করেন। সেই নীতির অধীনে উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকার কোথাও ইউরোপীয় উপনিবেশ স্থাপনের যে কোনো প্রচেষ্টাই মার্কিন নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। পরবর্তীতে বিংশ শতাব্দীর শুরুতে আরেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট থিওডোর রুজভেল্ট মনরো নীতিতে নিজস্ব পন্থা যুক্ত করতে এতে অর্থনৈতিক সংকট এবং অস্থিতিশীলতার প্রসঙ্গ যুক্ত করে পশ্চিম গোলার্ধে মার্কিন আধিপত্যবাদের ভিত্তি সুদৃঢ় করেন। তাঁর এই সংযুক্তিকে ‘রুজভেল্ট করোলারি’ বলে আখ্যা দেন ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। যা কয়েক দশক যাবৎ কিউবা, হাইতি, নিকারাগুয়া থেকে শুরু করে আর্জেন্টিনা, চিলি, পেরু পর্যন্ত মধ্য আমেরিকা ও লাতিন আমেরিকার দেশগুলোর সরকারব্যবস্থায় মার্কিন হস্তক্ষেপ চালানোর পথ সুগম করে দেয়।

একইভাবে, ২০২৫ সালের নভেম্বরে ক্ষমতাসীন ট্রাম্প প্রশাসন মনরো পররাষ্ট্র নীতির ওপর ‘ট্রাম্প করোলারি’ আরোপের প্রতিশ্রুতি দেয়। ০৪ জানুয়ারি ফ্লোরিডায় এক সংবাদ সম্মেলনে নিজের নীতির পক্ষে সাফাই গাইতে গিয়ে সেটিকে ‘ডনরো নীতি’ বলে আখ্যা দেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। এর মানে ডোনাল্ড ও মনরোর নীতির সমন্বয়। এর আওতায় ট্রাম্প সরকার আইন-শৃঙ্খলা ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখার জন্য হস্তক্ষেপের পাশাপাশি আরও তীব্রভাবে শক্তি প্রয়োগের পথ বেছে নিয়েছে লাতিন অঞ্চলে।

ইতোমধ্যে, লাতিন দেশগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ মদদে কট্টর জাতীয়তাবাদী শক্তির উত্থান চোখে পড়ছে বেশ কয়েক বছর ধরে। ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদেই এল সালভাদর, বলিভিয়া, আর্জেন্টিনা ও ইকুয়েডরে ক্ষমতার পালাবদল ঘটে। আর চলতি মেয়াদে চিলি ও হন্ডুরাসে ক্ষমতায় আসেন কট্টর ডানপন্থী নেতারা। যা লাতিন মানচিত্রে ট্রাম্প তথা মার্কিন প্রভাব অক্ষুণ্ন রাখতে নিয়ামক হয়ে উঠলেও ব্রাজিল, মেক্সিকো ও কলম্বিয়ায় এখনও বাম ঘরানার সরকার দেশ পরিচালনায় রয়েছে।

আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র সীমান্তে কথিত ‘মাদক চোরাচালান রোধ কিংবা মার্কিন মুলুকে অভিবাসী স্রোত ঠেলে দেওয়ার’ জন্য ভেনেজুয়েলা আক্রমণের কথা বলা হলেও, এটি যে মূলত বিশ্বের ১৭% উচ্চ মানের অপরিশোধিত তেলের মজুদ থাকা দেশটির খনিজ সম্পদ দখলের মার্কিন পাঁয়তারা সেটি এখন প্রকাশ্য দিবালোকের মতো পরিস্ফুটিত। ট্রাম্পও বলছেন, “আমাদের পুরোনো তেলের হিসাব মেটানো হবে। ভেনেজুয়েলার নিয়ন্ত্রণ নেব আমরা।”

গত শতাব্দীর ষাটের দশকের শেষ দিকেই ভেনেজুয়েলার তেল উৎপাদনের হার ছিল দৈনিক প্রায় ৩৫ লাখ ব্যারেল। অ্যাক্সন, গালফ অয়েল ও মোবিলের মতো মার্কিন তেল বিপণন প্রতিষ্ঠানগুলো তখন দেশটির তেল বাজারে নিজেদের একচ্ছত্র আধিপত্য কায়েম করেছিল। করেছিল স্থানীয় খনি শ্রমিকদের শোষণ-নিপীড়নও। সেই প্রেক্ষাপটে জনরোষ রুখতে ভেনেজুয়েলার সরকার ১৯৭৬ সালে তেলসম্পদ জাতীয়করণ করে। যেমনটি করা হয়েছিল মার্কিন আগ্রাসনের শিকার ইরাক ও লিবিয়াতেও। তবে ১৯৯৯ সালে সমাজতান্ত্রিক নেতা হুগো শ্যাভেজ ক্ষমতায় আসার আগ পর্যন্ত সেখানে মার্কিনীদের প্রবেশাধিকারে তেমন বেগ পেতে হয়নি।

মূলত, হুগো শ্যাভেজ এবং তাঁর উত্তরসূরী হিসেবে নিকোলাস মাদুরো ভেনেজুয়েলার তেল সম্পদের ওপর থেকে বিদেশি গোষ্ঠীগুলোর অধিকার উল্লেখযোগ্য মাত্রায় প্রত্যাহার করেন। কিন্তু ভেনেজুয়েলার অবকাঠামোগত উন্নয়ন সাধনে বহুমুখী প্রতিবন্ধকতা, খাতসংশ্লিষ্টদের অবাধ দুর্নীতি এবং ভুল সরকারি অর্থনৈতিক পদক্ষেপের কারণে দেশটির মুদ্রা ‘বলিভার’-এর মান শূন্যের কোঠায় নেমে যাওয়ায় তুমুল সংকটের জন্ম হয়। তবে সেটি কোনোক্রমেই আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে অন্য দেশের বাহিনীকে সামরিক অভিযান চালিয়ে একটি দেশের রাষ্ট্রপ্রধানকে সস্ত্রীক তুলে নিয়ে যাওয়ার বৈধতা দিতে পারে না।

এ দিকে, ২০২৫ সালে শান্তিতে নোবেলজয়ী ভেনেজুয়েলার মার্কিনপন্থী বিরোধী দলীয় নেতা মারিয়া কোরিনা মাচাদো মাদুরো উৎখাত অভিযানকে স্বাগত জানিয়ে এটিকে স্বাধীনতা হিসেবে আখ্যা দিলেও খোদ ট্রাম্পই মাচাদোর জনসমর্থন নেই বলে তাঁকে রীতিমতো তুলোধুনো করেছেন। তাঁর দাবি, মাদুরোর ভাইস প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজই যুক্তরাষ্ট্রের কথামতো দেশ পরিচালনা করবেন, যদিও তিনি এক টেলিভিশন ভাষণে মার্কিন আক্রমণের সমালোচনা করে মাদুরো ও তাঁর স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসের মুক্তি চেয়েছেন সম্প্রতি। কিন্তু রাজনৈতিক ক্রীড়ায় কে কখন কার ঘুঁটে হয়, তা বলা মুশকিল। এমতাবস্থায়, দারিদ্র্যসীমায় বসবাসরত ভেনেজুয়েলার জনসাধারণকে শাসনের ছড়ি ‘ট্রাম্প করোলারি’-র কলঙ্কময় কোন ক্রীড়ানকের হাতে যায়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।

লেখক : কবি, সাংবাদিক ও কলামিস্ট।

 

খুলনা গেজেট/এনএম




আরও সংবাদ

খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন