বুধবার । ২৮শে জানুয়ারি, ২০২৬ । ১৪ই মাঘ, ১৪৩২

সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার জরুরি

আবদুল কাদের খান

রাজনীতিতে সম্ভবত শেষ কথা বলে কোনো কথা নেই। শুধু তাই নয়, যুদ্ধ ও প্রেমের সম্পর্কেও মনীষীরা প্রায় একই বাক্য উচ্চারণ করেছেন। মনীষীরা বলেছেন,-“There is no last word in politics, love and war.” আকাশের রং পাল্টাতে সময় লাগে, কিন্তু রাজনীতির রং তারও অনেক আগে পাল্টাতে পারে, পাল্টাতে পারে রাজনীতির গতিধারা! ভালোবাসার ক্ষেত্রে কখন কীভাবে যে মনের রঙে রাঙিয়ে দুটি প্রাণ প্রস্ফুটিত কমলের মত ফুটে ওঠে, বলা মুশকিল। পক্ষান্তরে, যুগের পর যুগ ভালবাসার মোড়কে থাকা দুটি জীবনে সহসা বিচ্ছেদ নেমে আসার কাহিনীও বিরল নয়। অলৌকিক মহিমা রয়েছে যুদ্ধের ক্ষেত্রেও। যে যুদ্ধ চলছে দীর্ঘকাল ধরে হঠাৎ কোনো এক জাদু মন্ত্র বলে মুহূর্তে দু’পক্ষের সমঝোতায় তার সমাপ্তি ও হতে পারে আকস্মিকভাবে।

ভূমিকা করে কথা বলা বাদই দিলাম। বরং সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ঘটনা প্রবাহের দিকে আলোকপাত করলে আমরা কি দেখতে পাই? দেশের সবচেয়ে প্রভাবশালী রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) দারুন ক্ষরার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এ দলের হাই ভোল্টেজ নেতা-নেত্রীরা অনেকেই সেন্ট্রাল বা কেন্দ্রীয় মনোনয়ন পান নাই! তারা এখন ‘না রাহা ঘরকা, না রাহা ঘাটকা’- অর্থাৎ তাদের ঘরেও ঠাই নাই আবার ঘাটেও ঠাই নাই। এককথায়, নেই হয়ে গেছেন। ভাগ্যের কি পরিহাস! তেমনি একজন ডাকসাইটে নেত্রী ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা। দীর্ঘকাল জাতীয়তাবাদী দল করার পর এখন তার রাজনৈতিক ক্যারিয়ার কোন পথে সে সম্পর্কে স্পষ্ট মন্তব্য করার যদিও সময় আসেনি ; তবে ইদানিং তার যে বলন চলন গতিধারা তাতে মনে হয় তিনি দীর্ঘদিনের চেনা দল ছেড়ে সম্ভবত ‘একলা চলো’ নীতির দিকে পা বাড়িয়েছেন।

ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানার রাজনৈতিক জীবন শুরু প্রয়াত দেশনেত্রী, গণতন্ত্রের মানস কন্যা, বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী, আপসহীন নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নির্দেশ ও নির্বাচনের মাধ্যমে। তিনিই ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা কে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের রাজনীতিতে আনেন। কথায় বলে, “শেষ ভালো যার সব ভালো তার।” কিন্তু জাতীয়তাবাদী দলের রাজনীতিতে বিভ্রান্ত সংলাপের কারণে রুমিন ফারহানার শেষটা বড় ভালো হলো না। তার ক্ষেত্রে বৃহস্পতি তুঙ্গে না উঠে বরং তিনি উল্টো শনি এবং রাহুর শিকার হয়েছেন। দল তাকে মনোনয়ন দেয়নি। তার সার্বিক কার্যক্রম পরিচালনা করে তার নির্বাচনী এলাকা থেকে শরিক দলের অর্থাৎ ইসলামী দলের একজন কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি কে মনোনয়ন দিয়েছেন।

সঙ্গত কারণে রুমিন ফারহানার রাজনৈতিক জীবনের ভাগ্য বিপর্যয় ঘটেছে। একটু বিশ্লেষণ করি।

বিএনপি’র কেন্দ্রীয় কমিটির আন্তর্জাতিক সহ আইন সম্পাদক ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানার মুখে কথাগুলো শুনি। রুমিন ফারহানা বলেন : “রাব্বুল আলামিনের কি অদ্ভুত পরিকল্পনা, ২০২৬-এ এসে ধানের শীষের জোয়ারের বিপক্ষে আমাকে স্বতন্ত্র লড়াই করতে হচ্ছে। আমি বাংলাদেশের সকল মানুষের কাছে দোয়া চাই। আমার এই উপজেলার মানুষ যেই ভালোবাসা এবং আস্থা- বিশ্বাস আমার প্রতি রেখেছে, আমি যেন তার উপযুক্ত প্রতিদান দিতে পারি।” ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানার এই বক্তব্যের প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে দেশে-বিদেশে অবস্থানরত বিশেষজ্ঞ ব্যক্তিরা বলেছেন, “বিএনপি’র অত্যন্ত প্রতিবাদী নারী কণ্ঠ ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা যেই মেয়েটি বিএনপি’র সব থেকে খারাপ সময়ে ফ্যাসিস্ট হাসিনা আমলে সেই সময়ের পার্লামেন্টে এবং পার্লামেন্টের বাইরে বিএনপিকে নতুন জীবন দিয়েছে এবং বাঁচিয়ে রেখেছিল, এই মেয়েটাকে সে তারা নমিনেশন দেয়নি। পার্টির দুর্দিনে যে কান্ডারী ছিল, তাকে অপমান করা ঠিক হয়নি!” সকল মহলে জল্পনা-কল্পনা চলছে, এমনটা হলো কীভাবে? বিএনপি’র কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে চূড়ান্ত মনোনয়নে রুমিন ফারহানাকে তার নিজস্ব এলাকায় নমিনেশন দেয় নি। ব্রাহ্মণবাড়িয়া- ২ আসনে বিএনপি দলীয় শরিক জোটের জামায়াতে উলামা ইসলামের কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সভাপতি মাওলানা জুনায়েদ হাবিব মনোনীত হয়ে মনোনয়ন পত্র জমা দিয়েছেন।

আবার বিএনপি’র বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করছেন এই নেত্রী। ইতোমধ্যে মনোনয়নপত্রও জমা দিয়েছেন। তার নির্বাচনী এলাকা সরাইল আশুগঞ্জ ব্রাহ্মণবাড়িয়া- ২ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।

স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে গণসংযোগের সময় ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা রাজনৈতিক জীবনে উপেক্ষা অবহেলার শিকার হয়েছেন এমন উক্তি করে বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত ভাইস চেয়ারম্যানের কঠোর সমালোচনা করেছেন। রুমিন ফারহানা তার অনুসারীদের জানিয়েছেন আপনারা যে মার্কা বলবেন সেই মার্কায় আমি নির্বাচন করব। তারা হাঁস প্রতীক বলায় তিনি হাঁসকে নির্বাচনী প্রতীক ঘোষণা করেছেন। তিনি তার এলাকাবাসীকে বলেন, “এবারের নির্বাচন সরাইল আশুগঞ্জ মিলে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের অবহেলিত মানুষের জবাবের ভোট। আমি আমার অবহেলিত এই অঞ্চলের উন্নয়নের জন্য কাজ করতে চাই।” তিনি আক্ষেপ করে বলেন, “রাব্বুল আলামিনের অদ্ভুত পরিকল্পনা, ১৯৭৩ সালে আমার পিতা প্রয়াত অলি আহাদ আওয়ামী লীগের নৌকার জোয়ারের বিরুদ্ধে এই এলাকা থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করে জয়ী হয়েছিলেন। কি অদ্ভুত ব্যাপার , ১৭ বছর নানা চড়াই উৎরায় পার হয়ে বর্তমানে ধানের শীষের জোয়ারের যুগে আমাকেও আমার নিজ এলাকা থেকে পিতার মতো একইভাবে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করতে হচ্ছে।”

পর্যবেক্ষক মহলের মতে, শুধু ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা নন, বিএনপি’র শরিক দলের মধ্যে জুনায়েদ সাকী, ভিপি নূর সহ যেসব আসন শরিক দলের সাথে বিএনপি ভাগাভাগি করেছে, প্রত্যেক আসনে চাপা ক্ষোভ ও উত্তেজনা বিরাজ করছে। অধিকাংশ মনোনয়ন বঞ্চিত নেতা-নেত্রী বিক্ষোভের তুষের আগুনে জ্বলছে ধিকি ধিকি করে। ইতোমধ্যে সারাদেশে নির্বাচনী হাওয়া বইছে বেশ জোরে শোরে। তবে পর্যবেক্ষক মহলের ধারণা, ২০২৬ এ আগামী ১২ ই ফেব্রুয়ারি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী দলের সাথে বিএনপি’র মনোনীত প্রার্থীর মধ্যে অবশ্যই হাড্ডা হাড্ডি লড়াই হবে। এ নির্বাচনে নির্ধারিত হবে বাংলাদেশ কী পেছনের দিকে ঘুরছে নাকি সামনের দিকে এগোচ্ছে, অধিকাংশ পর্যবেক্ষক এ ধরনের মন্তব্য করেছেন।

স্মরণ করা যেতে পারে, জুলাই বিপ্লব ২০২৪ এর পর দেশের আপামর নিপীড়িত গণমানুষের দাবি ছিল ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকারের পতনের পর নিশ্চয়ই আমাদের দেশ থেকে স্বৈরাচার হটাও সফল হয়েছে। এবার আধিপত্যবাদ, আগ্রাসনের বিরুদ্ধে নির্মূল অভিযান চলবে। জুলাই বিপ্লবে আবু সাঈদ, মুগ্ধরা যেভাবে অকাতরে জীবন দিয়েছে, তার একটি চূড়ান্ত ফয়সালা হবে। কিন্তু হা হতস্মি! বাঁড়াভাতে ছাই এর মত গত দেড় বছরে একাধিক গণধিকৃত কুখ্যাত আওয়ামী মন্ত্রী নেতা নিরাপদে দেশ ত্যাগ করেছে, বিশেষ বিশেষ ব্যক্তির কৃপা ও সহযোগিতায়! কোনরকম বাধা বিপত্তি ছাড়াই। জুলাই বিপ্লবের মুহূর্তে যারা পালিয়েছে পৈত্রিক জীবন বাঁচানোর জন্যে, তারাই আবার আস্ফালন করছে, দেশে ফিরে এসে নাকি দেশপ্রেমিক মানুষের অর্থাৎ হাসিনা বিরোধীদের নিজ হাতে হাসিনা শায়েস্তা করবেন। দেশ নাকি এখন সন্ত্রাসীদের হাতে সন্ত্রাসীদের দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে একথাও পাশের দেশ থেকে বসে বলা হচ্ছে। এদের স্পর্ধার তারিফ করি।

বাংলাদেশের মানুষ অপেক্ষায় রয়েছে গত ১৫-১৬ বছর নিরবিচ্ছিন্ন লড়াইয়ে মাধ্যমে হাসিনা এবং তার লুটেরা বাহিনীকে উচ্ছেদের পর দেশে একটি সংস্কার আন্দোলন হবে। হাসিনার কুকর্মের দোসরদের বিচার হবে। বিগত দিনে তারা দেশব্যাপী নারকীয় তাণ্ডব সৃষ্টি খুন গুম লুটতরাজ যা কিছু করেছে, তার একটি সম্মানজনক প্রতিকার হবে। ধাপে ধাপে সংস্কারের মাধ্যমে, দোষীদের শাস্তি, ন্যায় বিচারের মাধ্যমে নিশ্চিত করা হবে। গ্রাম পর্যায়ে থেকে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন, উপজেলা পরিষদ নির্বাচন, জেলা পরিষদ নির্বাচন ধাপে ধাপে অনুষ্ঠিত হবে। সর্বশেষে জাতীয় সংসদ নির্বাচন হবে।

অপ্রিয় হলেও সত্য ডিসেম্বর ২০২৫ এর ১১ তারিখ নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ইনক্লাব মঞ্চের প্রধান, ফ্যাসিবাদী ভারতীয় আগ্রাসন বিরোধী কণ্ঠ বিপ্লবী শরিফ ওসমান হাদীকে নৃশংস নির্মমভাবে হত্যা করা হলো। হাদি হত্যার পর প্রায় একমাস গত হতে চলল খুনিদের এখনো রহস্যজনক ভাবে লুকিয়ে রাখা হচ্ছে, গ্রেপ্তার করা হচ্ছে না বলে অভিযোগ রয়েছে। ১২ই ফেব্রুয়ারি ২০২৬ এর ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আর মাত্র কয়েকদিন বাকি, কিন্তু এখনো পর্যন্ত দেশ থেকে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার, লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড সহ নির্বাচনী সুস্থ পরিবেশ নিশ্চিত এ তেমন কার্যকর কোনো ব্যবস্থা এ পর্যন্ত গ্রহণ করা হয় নাই। পর্যবেক্ষক মহলের ধারণা ছিল নির্বাচন প্রক্রিয়া ধাপে ধাপে আটটি বিভাগে আট দিন গ্রহণ করা হবে। কিন্তু নির্বাচন কমিশন এ পর্যন্ত দৃশ্যমান সাফল্যের ছিটে ফোটাও দেখাতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে। দেশের জনমনে একটিই প্রশ্ন, এমন বৈরী বিরুদ্ধ পরিস্থিতিতে কীভাবে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্পন্ন হবে?

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট।

 

খুলনা গেজেট/এনএম




খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন