বটিয়াঘাটার ঝপঝপিয়া নদী থেকে গেল বছর ২০ আগস্ট উদ্ধার হওয়া মস্তকবিহীন নারীর লাশ শনাক্ত করেছে পিবিআই। গ্রেপ্তার হয়েছে মূল ঘাতক। মূলত শাশুড়ির হাতে পুত্রবধূর দেওয়া মেহেদি দেখে লাশটি শনাক্ত করা হয়। তবে উদ্ধার হয়নি মাথার অংশ (মস্তক)। অন্যান্য ঘাতকদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। খুলনার পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের পুলিশ সুপার রেশমা শারমিন এ তথ্য জানিয়েছেন।
পুলিশ ও নিহত সালেহার ছেলে শামিম ফকির জানান, “৫ বছর বিদেশে থেকে কষ্টার্জিত অর্থ নিয়ে ২০২৩ সালে বাড়ি ফিরে আসে ডুমুরিয়ার সাজিয়াড়া গ্রামের গৃহবধূ সালেহা বেগম। তিনি ওই গ্রামের কৃষক মজিদ ফকিরের স্ত্রী। সালেহা বেগম বাড়ি আসার পর থেকে প্রতিবেশী নূর আলী গাজীর ছেলে লালন গাজী তার সাথে পরকীয়ায় লিপ্ত হয়। মূলত বিদেশ থেকে আনা টাকা হাতিয়ে নেওয়ার জন্য কথিত প্রেমিক সাজে লালন গাজী।”
শামিম ফকির আরও জানান, “ভুলিয়ে ভালিয়ে বিভিন্ন সময় তার মায়ের কাছ থেকে লালন গাজী ৩২ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। ওই টাকার জন্য তার মা তাকে চাপ দিতে থাকে। একপর্যায় বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে সালেহাকে নিয়ে নিরুদ্দেশ হয় সে।”
প্রায় এক বছর তার মাকে নিকটাত্মীয়সহ বিভিন্ন স্থানে খোঁজাখুঁজি করে শামিমসহ পরিবারের সদস্যরা। একাধিকবার লালন গাজী ও তার ভাই রুহোল আমিন গাজী, লালন গাজীর শশুর সদর ইউপি চেয়ারম্যান গাজী হুমাউন কবির বুলুর কাছে গিয়ে তার মায়ের সন্ধান চায় ছেলে শামীম।
ওই সময় লালন গাজী জানায়, “তার মা সালেহাকে সে বিয়ে করেছে। তবে সালেহা তার কাছে নেই।” শুধু একটি কোর্টের এ্যাফিডেভিট দেখায়। নিরুপায় হয়ে অবশেষে শামীম ফকির লালন গাজীকে আসামি করে ৮ অক্টোবর আদালতে মামলা দায়ের করে। আদালত মামলাটি গ্রহণ করে পিবিআইকে তদন্ত দেয়। পিবিআই ওই মামলার সূত্র ধরে বটিয়াঘাটার ঝপঝপিয়া নদী থেকে ২০ আগস্ট উদ্ধার হওয়া লাশের ছবি নিয়ে ডুমুরিয়ার সাজিয়াড়া গ্রামে যায়। দেখা করে সালেহার পরিবারের সাথে।
এ সময় পিবিআই সদস্যদেরকে শামিম জানায়, “১৫ আগস্ট তার মা বাসায় এসেছিল। ওই সময় তার স্ত্রী মায়ের হাতে মেহেদি লাগিয়ে দিয়েছিল।” পিবিআই সদস্যদের দেখানো ছবিতে লাশের হাতের সেই মেহেদি এবং পরনের কাপড় দেখে এটি তার মা বলে দাবি করে ছেলে শামীম। এ সময় আদালতের অনুমতি নিয়ে পিবিআই শামিম ও তার ভাই শাকিব ফকিরের ডিএনএ টেষ্ট করতে পাঠায়। ডিএনএ মিলে যাওয়ায় ১৮ ডিসেম্বর রাতে সুমানগঞ্জের হালুয়াঘাট এলাকা থেকে লালন গাজীকে গ্রেপ্তার করে পিবিআই। পরে তাকে বটিয়াঘাটা থানার মস্তকবিহীন লাশ উদ্ধারের ঘটনায় হওয়া ২০ আগস্টের মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে প্রেরণ করে ১০ দিনের রিমান্ড চায়। আদালত ৭ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করে।
রিমান্ডের পরে পিবিআই প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, “সালেহার সাথে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে তার কাছ থেকে ১৪ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে বলে লালন গাজী স্বীকারোক্তি দিয়েছে। তাকে নিয়ে পিরোজপুরের ইন্দুরকানি থানার চাড়াখালি বাজারের জেসমিন বেগম নামে একজনের ৩ তলা বাড়ির দোতলায় গত এক বছর ধরে তারা ভাড়া থাকতো। সেখানে স্বামী-স্ত্রী হিসেবে তারা বসবাস করত। তবে টাকা ফেরত চেয়ে চাপ দেওয়ায় হত্যার পরিকল্পনা করে লালন গাজী। পরিকল্পনা অনুযায়ি ১৯ আগস্ট সন্ধ্যায় মামার বাড়িতে যাওয়ার কথা বলে সালেহাকে নিয়ে আসে ডুমুরিয়ায়। রাতে তাকে নিয়ে যাওয়া হয় বটিয়াঘাটার খেয়াঘাটের কাছে। সেখানে তার মামাতো ভাই ও আরও ৩/৪ জন মিলে সালেহার দেহ থেকে মাথা আলাদা করে হত্যা করে। পরে মাথাবিহীন দেহ নদীতে ফেলে দেওয়া হয়। ২/৩ কিলোমিটার দূরে মাথাও (মস্তক) নদীতে ফেলে দেওয়া হয়। পরের দিন মস্তক বিহীন লাশ উদ্ধার হয়। ৭ দিনের পুলিশ হেফাজতে থাকা অবস্থায় লালন গাজীর স্বীকারোক্তি মোতাবেক ২৭ ডিসেম্বর বটিয়াঘাটার গজালিয়া গ্রামে তার মামাতো ভাইয়ের বাড়ি থেকে ভিকটিমের ব্যবহৃত মালামাল এবং উঠানে পুতে রাখা কাপড় উদ্ধার করে পিবিআই। তবে এখনও অন্যান্য আসামিদের গ্রেপ্তার করতে পারেনি। উদ্ধার হয়নি মস্তক।”
এ ব্যাপারে খুলনা পিবিআই’র পুলিশ সুপার রেশমা শারমিন বলেন, “ভিকটিমের ছেলের দেওয়া তথ্য ও লাশের স্থির চিত্রের সূত্র ধরে এবং ছেলের বউয়ের মেহেদীতেই শনাক্ত হয়েছে সালেহার লাশ। মূল ঘাতক অত্যন্ত সুচতুর। সে ফোন ব্যবহার করে না। যে কারণে তাকে গ্রেপ্তার করতে অনেক সময় লেগেছে। ঝপঝপিয়া নদীতে বেশ স্রোত এবং ৪ মাস আগের ঘটনা। যে কারণে মস্তক পেতে সময় লাগছে। তবে চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।”
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই রেজোয়ান বলেন, “২/৩ মাস ধরে এসপি স্যার রেশমা শারমিনের সরাসরি তত্ত্বাবধানে তদন্ত করে মূল ঘাতককে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়েছে। বাকিদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।”
খুলনা গেজেট/এনএম
