জাহান্নাম একটি আরবি শব্দ। একে ফারসিতে দোজখ আর বাংলায় নরক বলা হয়। ইসলামের পরিভাষায় জাহান্নাম হলো পরকালে পাপীদের জন্য নির্দিষ্ট যন্ত্রণাদায়ক আবাসস্থল। সেদিন যাদের আমলনামার প্রতি আল্লাহ তায়ালা অসন্তুষ্ট হবেন তাদের শাস্তির ঠিকানা হবে জাহান্নাম। মূলত জাহান্নাম একটি বিভীষিকাময় ও ভয়ংকর শাস্তির স্থান। এটি আল্লাহ তায়ালার এক নিকৃষ্ট সৃষ্টি। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন, “নিশ্চয়ই আশ্রয়স্থল ও বসতি হিসেবে জাহান্নাম অত্যন্ত নিকৃষ্ট।” (সুরা আল ফুরকানঃ ৬৬)। জাহান্নাম জাহান্নামিদের শাস্তির জায়গা ও দুঃখের কারাগার। কষ্টের অতল দরিয়া।
জাহান্নামের শাস্তিসমূহের অন্যতম একটি উপাদান হলো আগুন। জাহান্নামের আগুন একটি প্রলম্বিত ও অসহনীয় দহন যন্ত্রণার উৎস। সাধারণ জ্ঞান ও উপলব্ধির বাইরে এ যন্ত্রণা। এর ব্যাপ্তিও অকল্পনীয়। জাহান্নামের আগুন কখনও নিস্তেজ হবে না। দীর্ঘকাল অতিবাহিত হওয়ার পরও তার প্রজ¦লন হ্রাস পাবে না। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন, “তোমরা ওই আগুন (জাহান্নাম) থেকে আত্মরক্ষা করো, যা প্রস্তুত করা হয়েছে কাফের সম্প্রদায়ের জন্য।” (সুরা আল ইমরান : ১৩১)
অন্যত্র আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন, “আমি তোমাদের প্রজ্বলিত লেলিহান আগুন সম্পর্কে সতর্ক করেছি।” (সুরা লাইল : ১৪) তাই জাহান্নামের আগুন থেকে নিজে বাঁচুন এবং পরিবার-পরিজনকেও বাঁচান। আল্লাহ তায়ালার আদেশও অনুরূপ। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘হে মুমিনগণ! তোমরা নিজেদের এবং তোমাদের পরিবার-পরিজনদের সেই আগুন থেকে রক্ষা করো, যার জ্বালানি হবে মানুষ ও পাথর। সেখানে রূঢ় স্বভাব ও কঠিন হৃদয়ের ফেরেশতারা নিয়োজিত থাকবে, যারা কখনো আল্লাহর কোনো নির্দেশ অমান্য করে না। তাদের যে নির্দেশ দেওয়া হয় তাই পালন করে।” (সুরা তাহরিম : ৬)
এ আয়াতে সব মুসলিম জাতিকে আদেশ করা হয়েছে যে, জাহান্নামের আগুন থেকে নিজেকে বাঁচাও এবং নিজের পরিবার-পরিজনকেও বাঁচাও। অতঃপর আল্লাহ তায়ালা জাহান্নামের আগুনের প্রখরতা ও ভয়াবহতার কথা উল্লেখ করেছেন। এরপর এটিও উল্লেখ করেছেন, যে ব্যক্তি জাহান্নামি হয়ে যাবে, সে আপন শক্তি-সামর্থ্য, ক্ষমতা-দক্ষতা, চাটুকারিতা বা ঘুষ ইত্যাদি দিয়েও জাহান্নামে নিয়োজিত ফেরেশতাদের হাত থেকে রক্ষা পাবে না। কারণ সেখানে এত কঠিন হৃদয়ের ফেরেশতা দায়িত্ব পালনে নিযুক্ত রয়েছে, যারা আল্লাহ তায়ালার আদেশ পালনে অটল ও অবিচল। কখনো তারা আল্লাহ তায়ালার আদেশ লঙ্ঘন করে না। তাদের নাম হলো জাবানিয়াহ।
আলোচ্য আয়াতে ‘আহলিকুম’ শব্দে আপন পরিবার-পরিজনের সব সদস্য অন্তর্ভুক্ত। তাই পরিবার প্রধানের দায়িত্ব হচ্ছে তার স্ত্রী, সন্তান-সন্ততি ও অধীনস্তদের সকলকেই জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচানোর ব্যবস্থা করা।
একজন মানুষের পরিবারই হচ্ছে মূল। তাই পরিবারকে দ্বীনের দিকে দাওয়াত প্রদান, তাদের সংশোধন, উপকারী ইলম দ্বারা তাদেরকে শক্তিশালীকরণ, সৎ আমলে অভ্যস্ত করে তোলা এবং ক্ষতিকারক বিষয় থেকে তাদের সতর্ক করা একান্ত আবশ্যক।
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন, “আর স্মরণ করো এই কিতাবে উল্লিখিত ইসমাঈলকে। সে ছিল সত্যিকারের ওয়াদা পালনকারী এবং সে ছিল রাসুল, নবি। আর সে তার পরিবার-পরিজনকে নামাজ ও জাকাত আদায়ের নির্দেশ দিত এবং সে ছিল তার রবের সন্তোষভাজন।” (সূরা মারইয়াম: ৫৪-৫৫) আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন, “ তুমি তোমার পরিবারের লোকদেরকে নামাজের আদেশ দাও ও নিজেও এর ওপর অবিচল থাকো।’ (সুরা তোহা : ১৩২)
আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সাঃ) বলেছেন, “সাবধান! তোমরা প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং প্রত্যেকেই তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে।” (সহিহ বুখারি : ২৫৫৪, সহিহ মুসলিম : ১৮২৯)
আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন রাসুল (সাঃ) বলেছেন, “আল্লাহ তায়ালা প্রত্যেক দায়িত্বশীল ব্যক্তিকে তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞেস করবেন যে, সে তা ঠিকঠাক আদায় করেছে কি না? এমনকি ব্যক্তিকে তার পরিবার সম্পর্কেও জিজ্ঞেস করবেন।” (সহিহ ইবনে হিব্বান : ৪৫৭০)
বস্তুত একজন মুমিন ব্যক্তি তার পরিবারের হেদায়েত ও সংশোধনের জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত, ঠিক যেভাবে সে নিজের হেদায়েত ও সংশোধনের জন্য দায়িত্বশীল। এ প্রসঙ্গে রাসুল (সাঃ) বলেছেন, “তোমরা প্রত্যেকে জিজ্ঞাসিত হবে। একজন শাসক সে তার অধীনস্তদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে। একজন পুরুষ গৃহকর্তা তার পরিবার-পরিজনদের প্রতি দায়িত্বশীল, সে এ সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে। একজন স্ত্রী তার স্বামীর পরিবার ও সন্তান-সন্ততির প্রতি দায়িত্বশীল, সে এ ব্যাপারে জিজ্ঞাসিত হবে। আর একজন কর্মচারী তার মালিকের সম্পদের রক্ষণাবেক্ষণকারী, সে এ সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে। অতএব সাবধান! তোমরা প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং তোমরা প্রত্যেকেই তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে।” (সহিহ বুখারি : ৫১৮৮, সহিহ মুসলিম : ১৮২৯) এ হাদিসটি আমাদের সামনে একজন মুসলিমের দায়িত্ব-কর্তব্যের কথা স্পষ্ট করে দেয়। এটি সাধারণভাবে সবার জন্য প্রযোজ্য, এখানে কাউকে আলাদা করার সুযোগ নেই।
সুতরাং জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচতে হলে আমাদের সবার উচিত মহান আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের আদেশ-নিষেধ মেনে দুনিয়ার জীবন পরিচালনা করা। তাহলেই আমরা সফলকাম হবো। আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে সেই তাওফিক দান করুন।
লেখক : উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা (অবঃ) উপজেলা কৃষি অফিস, রূপসা, খুলনা।
খুলনা গেজেট/এনএম
