বুধবার । ২৮শে জানুয়ারি, ২০২৬ । ১৪ই মাঘ, ১৪৩২

দিল্লির বার্তা লাউড অ্যান্ড ক্লিয়ার : আ’লীগ নয়, বিএনপিই এখন প্রধান ঠিকানা

নিয়াজ মাহমুদ

দিল্লির বার্তা লাউড অ্যান্ড ক্লিয়ার : আওয়ামী লীগ নয়, ভবিষ্যৎ বাংলাদেশই লক্ষ্য। বাংলাদেশকে এতদিন ভারত দেখেছে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক লেন্সে-সে লেন্সের নাম ছিল শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগ। টানা দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে দিল্লির কূটনৈতিক হিসাব-নিকাশ, নিরাপত্তা দৃষ্টিভঙ্গি এবং আঞ্চলিক রাজনীতির কেন্দ্রে ছিলেন একজনই-শেখ হাসিনা। কিন্তু জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে সেই ক্ষমতাকেন্দ্র ভেঙে পড়ার পর ভারতও যেন বাধ্য হয়েছে বাস্তবতার মুখোমুখি হতে। প্রশ্ন এখন একটাই-হাসিনার পর ভারত কাকে ঘিরে বাংলাদেশকে দেখবে?

সেই প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে ভারতের সাম্প্রতিক পদক্ষেপগুলোকে আর কাকতালীয় বলা যাচ্ছে না। বরং সেগুলো স্পষ্ট রাজনৈতিক সংকেত, যার মেসেজ ‘লাউড অ্যান্ড ক্লিয়ার’: ভারত আর আওয়ামী লীগ বা হাসিনার লেন্সে বাংলাদেশকে দেখতে চায় না।

এই বাস্তবতার সবচেয়ে দৃশ্যমান প্রকাশ ঘটে বিএনপি চেয়ারপারসন সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার জানাজায় ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের উপস্থিতির মাধ্যমে। গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর এই সফর ছিল বাংলাদেশে ভারতের সর্বোচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধির প্রথম আগমন। অথচ এই সফরটি ছিল সংক্ষিপ্ত, কিন্তু রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত গভীর তাৎপর্যপূর্ণ।

এস জয়শঙ্কর ঢাকায় এসে খালেদা জিয়ার প্রতি শেষশ্রদ্ধা নিবেদন করেন, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং তার হাতে তুলে দেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির শোকবার্তা। কিন্তু লক্ষণীয় বিষয় হলো-এই সফরে তিনি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে কোনো আনুষ্ঠানিক বৈঠকে বসেননি। কূটনীতির ভাষায় এটি নিছক সৌজন্যগত বাদ পড়া নয়; এটি একটি সচেতন রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত।

নরেন্দ্র মোদির পাঠানো শোকবার্তাটিও ছিল ব্যতিক্রমী। এটি কেবল একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রী বা রাজনৈতিক নেত্রীর মৃত্যুতে শোক প্রকাশ নয়; বরং এর ভেতরে লুকিয়ে ছিল ‘অতীত ভুলে ভবিষ্যতের দিকে তাকানোর’ স্পষ্ট আহ্বান। ভারতের পক্ষ থেকে এটি ছিল একটি নতুন দরজা খোলার বার্তা-বিএনপির সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার, যোগাযোগ বাড়ানোর এবং ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক বাস্তবতাকে মেনে নেওয়ার সংকেত।

অনেক আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকের মতে, মোদির এই বার্তা এবং জয়শঙ্করের এই সফর মূলত বাংলাদেশের পরিবর্তিত রাজনৈতিক ভূগোলের সঙ্গে ভারতকে পুনরায় মানিয়ে নেওয়ার কৌশল। কারণ বাস্তবতা হলো-আসন্ন নির্বাচনে বিএনপি ক্ষমতায় আসার সম্ভাবনাই এখন সবচেয়ে বেশি আলোচিত। দিল্লিও তা ভালোভাবেই বুঝে ফেলেছে।

একজন বিশ্লেষকের ভাষায়, “এখন ভারতের হাতে অন্য কোনো অপশন নাই। বিএনপিই এই মুহূর্তে ভারতের নম্বর ওয়ান অপশন।”

এই উপলব্ধি হঠাৎ করে তৈরি হয়নি। খালেদা জিয়া অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর নরেন্দ্র মোদি ব্যক্তিগতভাবে বার্তা পাঠান এবং চিকিৎসায় যে কোনো ধরনের সহযোগিতার আশ্বাস দেন। সেই সময় থেকেই ভারতের অবস্থানে একটি দৃশ্যমান পরিবর্তন লক্ষ করা যায়। এরপর ভারতীয় মূলধারার মিডিয়াগুলোতে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক নিয়ে ইতিবাচক রিপোর্টের সংখ্যা বাড়তে থাকে। তারেক রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন নিয়ে ভারতের প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যমগুলো যেভাবে গুরুত্ব দিয়ে কাভারেজ দেয়, সেটিও কূটনৈতিক বার্তার অংশ।

এখানেই প্রশ্ন ওঠে-যে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করতে অন্তর্বর্তী সরকারের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন এক বছর ধরে চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছেন, সেই জয়শঙ্কর কেন সামরিক বিমানে চড়ে ঢাকায় ছুটে এলেন খালেদা জিয়ার জানাজায়? উত্তরটি খুবই সরল-ভারত ভবিষ্যতের ক্ষমতাকেন্দ্রের সঙ্গে সম্পর্ক গড়তে চায়, বর্তমান অন্তর্বর্তী ব্যবস্থার সঙ্গে নয়।

এমনকি ভারতের কৌশল এখানেই থেমে নেই। বিএনপির পাশাপাশি জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গেও যে দিল্লি যোগাযোগ রাখছে, সেই দাবি এসেছে স্বয়ং জামায়াত আমিরের কাছ থেকেই। তার বক্তব্য অনুযায়ী, একটি বৈঠক হয়েছে এবং সেটি গোপন রাখার অনুরোধও জানানো হয়েছিল। অর্থাৎ ভারত কেবল একটি দল নয়, বরং সম্ভাব্য সব শক্তিকেই বিবেচনায় রাখছে-যাদের ভূমিকা ভবিষ্যৎ বাংলাদেশে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

এস জয়শঙ্করের আরেকটি বক্তব্য এখানে উল্লেখযোগ্য। তিনি বলেন, “এই মুহূর্তে বাংলাদেশ নির্বাচনের দিকে এগিয়ে চলেছে। আমরা তাদের শুভেচ্ছা জানিয়েছি। আমরা আশা করি, নির্বাচনের পর পরিস্থিতি থিতু হলে এই অঞ্চলে সুপ্রতিবেশীসুলভ চেতনা বৃদ্ধি পাবে।” এই বক্তব্যের ভেতরেই লুকিয়ে আছে ভারতের কৌশলগত অবস্থান—নির্বাচনের ফল যাই হোক, দিল্লি নতুন সরকারের সঙ্গে কাজ করতে প্রস্তুত। শুক্রবার চেন্নাইয়ে আইআইটি মাদ্রাজে এক অনুষ্ঠানে প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে বাংলাদেশ প্রসঙ্গে এ কথা বলেন জয়শঙ্কর।

সব মিলিয়ে একটি বিষয় এখন আর গোপন নেই-হাসিনার পতনের পর ভারত একটি নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি। এতদিন যাকে ‘নির্ভরযোগ্য মিত্র’ ভেবে একতরফাভাবে সমর্থন দিয়েছে, সেই রাজনৈতিক শক্তি আর ক্ষমতায় নেই। ফলে দিল্লিকে এখন নতুন হিসাব কষতে হচ্ছে, নতুন সম্পর্ক গড়তে হচ্ছে।

এই প্রেক্ষাপটে বিএনপি শুধু একটি রাজনৈতিক দল নয়, বরং ভারতের জন্য একটি বাস্তব রাজনৈতিক বিকল্প। আর সেই কারণেই আজ দিল্লির বার্তা এতটা স্পষ্ট, এতটা উচ্চকণ্ঠে শোনা যাচ্ছে।

হাসিনার লেন্স ভেঙে গেছে। ভারত এখন বাংলাদেশকে দেখতে চাইছে নতুন চোখে-নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায়, নতুন অংশীদারের সঙ্গে। সেই বাস্তবতায় দিল্লির বার্তা লাউড অ্যান্ড ক্লিয়ার: আওয়ামী লীগ নয়, বিএনপিই এখন প্রধান ঠিকানা।

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট

email: niazjournalist@gmail.com

 

খুলনা গেজেট/এনএম




খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন