বুধবার । ২৮শে জানুয়ারি, ২০২৬ । ১৪ই মাঘ, ১৪৩২

খুলনায় বেগম খালেদা জিয়া

কাজী মোতাহার রহমান

গণতন্ত্রমনা মানুষের আশার বাতিঘর বেগম খালেদা জিয়ার ৪৩ বছরের বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবন এশিয়া ভূখণ্ড শ্রদ্ধা চিত্তে স্মরণ করছে।

আপসহীন নেত্রী, মাদার অব ডেমোক্রেসি ও কোরাজান একুইনোর প্রতিচ্ছবি তিনি। “দেশের বাইরে আমার কোনো ঠিকানা নেই” স্মরণীয় উক্ত আজা মানুষের মুখে মুখে। গণমাধ্যমেও শিরোনাম হয়েছে। দেশপ্রেমিক মানুষ তার বক্তব্যকে শ্রদ্ধা চিত্তে সেদিন গ্রহণ করে। উক্তিটি তার দেশপ্রেমের প্রতিচ্ছবি। বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের দর্শনের মানুষদের স্মৃতিপটে এটি স্মরণীয় হয়ে থাকবে। ১৯৮২ সাল পর্যন্ত তিনি ছিলেন গৃহবধূ। প্রেসিডেন্ট জেঃ জিয়াউর রহমান বীর উত্তম-এর মৃত্যুর পর এ শিবিরের রাজনীতিতে শূন্যতা বিরাজ করে। বিচারপতি আব্দুস সত্তার শক্তহাতে দলকে ধরে রাখতে পারছিলেন না। ঠিক এমনই একটি মুহূর্তে তিনি রাজনীতিতে পদার্পণ করেন। বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের দর্শনের পরিমণ্ডলে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরি করেন।

সামরিক শাসন বিরোধী গণতান্ত্রিক আন্দোলনে তিনি হয়ে ওঠেন আপসহীন নেতৃত্বের প্রতীক। অনেকেই কোরাজান একুইনোর সাথে তুলনা করেন। গ্রেপ্তার, ভয়ভীতি, কারাজীবন ও রাজনৈতিক সহিষ্ণুতার মধ্য দিয়ে তিনি আপস করেন নি। ১/১১-এর কর্ণধাররা আপসের চোরাগলিতে রেখে দায়মুক্তি চেয়েছিলেন। বিএনপি প্রধান এতে সম্মতি দেননি। ফলশ্রুতিতে তাকে কারাভোগ করতে হয়। জনগণের আন্দোলনের মধ্য দিয়ে তিনি মুক্ত বাতাসে নিঃশ্বাস নিতে থাকেন। বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হন।

‘স্বৈরচার নিপাত যাক, গণতন্ত্র মুক্তি পাক’ রাজপথের-এ গগনবিদারী স্লোগানের মুহূর্তগুলোতে স্থিতিশীলতার প্রতীক হিসেবে আবির্ভূত হন। আপসহীন মনোভাব হয়ে ওঠে তার রাজনৈতিক পরিচয়। এ-গর্ব বয়ে নিয়েই ছিলেন সারাজীবন। বিএনপি’র জাতীয়তাবাদী ও আধিপত্যবাদ বিরোধী অবস্থান ভারতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের নীতির অবস্থানের ভিন্নতা স্পষ্ট করে। ভারতের প্রভাব নিয়ে উদ্বিগ্ন জনগোষ্ঠীর কাছে এ অবস্থান তাকে সার্বভৌমত্বের রক্ষক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে ১৯৮৬, ১৯৮৮, ২০১৪ ও ২০২৪ সালের নির্বাচন বর্জন করায় তার আপসহীন ভাবমূর্তি আরও দৃঢ় হয়।

প্রেক্ষাপট উল্লেখ করে বলতে হয়, বর্ণাঢ্য এ রাজনীতিকের সংগ্রামী জীবনের সাথে খুলনা ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এ নগরীর বিভিন্ন প্রান্তের সাথে জড়িয়ে আছে তার স্মৃতি। বিশেষ করে এখানকার সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ গুলোর আধুনিকায়নে তিনি প্রচ্ছন্ন দৃষ্টি রেখেছেন। পীর খানজাহান আলী র. ব্রীজ স্থাপনে বৃহত্তর খুলনাবাসীর সাথে সৌজন্য সাক্ষাৎকালে তিনি ইতিবাচক ভূমিকা রাখেন। নাগরিক নেতা আবু মোঃ ফেরদাউস, এম নুরুল ইসলাম, স্পীকার শেখ রাজ্জাক আলী, আশরাফ হোসেন ও সাংবাদিক মনিরুল হুদাকে প্রতিশ্রুতি দেন। খুলনা, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাটে হরতালের কর্মসূচি স্থগিত হয়ে যায়। বলা চলে খুলনাস্থ কেডিঘোষ রোডের ইউনাইটেড ক্লাবে বিএনপি আয়োজিত কর্মী-সভায় বক্তৃতা দানের মধ্য দিয়ে এই প্রথম তিনি প্রকাশ্যে রাজনীতিতে আসেন। সেদিনে তার বক্তৃতা ছিল সংক্ষিপ্ত পরিসরের। দলকে সংগঠিত করার জন্য নেতা-কর্মীদের গঠনমূলক পরামর্শ দেন।

সে সময়ে এ দলের সংগঠকদের মধ্যে উল্লেখযোগ্যরা হচ্ছেন, শেখ রাজ্জাক আলী, এম নুরুল ইসলাম, শ্রমিক নেতা মোঃ আশরাফ হোসেন, সৈয়দ ঈসা, কাজী সেকেন্দার আলী ডালিম, শেখ মুজিবুর রহমান, নুরুজ্জামান খোকন, শফিউদ্দিন, মনিরুজ্জামান মনি। এ সভার মধ্য দিয়ে মূল দলের পাশাপাশি যুব, মহিলা ও ছাত্রদল উজ্জিবিত হয়। খুলনাবাসীর দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ২০০১ সালের এক অক্টোবর জাতীয় সংসদ নির্বাচনে খুলনা-২ আসন থেকে দলের প্রার্থী হন। এসময় ৯১ হাজার ৮শ’ ১৯ ভোট পেয়ে জয়ী হন। খান-এ সবুর-এর পর তিনিই একমাত্র দলীয় প্রধান খুলনা-২ আসন থেকে নির্বাচনে অংশ নেন।

১৯৯১ সালে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণের পর খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন। চারটি ডিসিপ্লিনের মধ্য দিয়ে এ প্রতিষ্ঠানের যাত্রা শুরু হয়। শ্রমিক নেতা মোঃ আশরাফ হোসেনের সংসদে দাবির পরিপ্রেক্ষিতে বিআইটি খুলনাকে খুলনা প্রকৌশলী ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, শেখ রাজ্জাক আলীর দাবির পরিপ্রেক্ষিতে সিটি ও সুন্দরবন কলেজকে সরকারি করণে অসামান্য অবদান রাখেন।

দক্ষ ক্রীড়াবিদ গড়ে তোলার জন্য খানজাহান আলী বাইপাস সড়কের পশ্চিম প্রান্তে বিকেএসপি এবং টিএনটি আধুনিক করণে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী উল্লেখযোগ্য ভূমিকা নেন। দেশের দ্বিতীয় সমুদ্রবন্দর মোংলা বন্দর আধুনিকায়ন, সুন্দরবনকে আকর্ষণীয় পর্যটক স্থান এবং দক্ষিণ জনপদে টেকসই বেড়িবাঁধের জন্য ইতিবাচক ও সময়োপযোগী পদক্ষেপ নেওয়ায় তার ভূমিকা স্মরণীয় হয়ে আছে। খুলনাবাসী এ গর্বিত রাজনীতিকের অবদান শ্রদ্ধা চিত্তে স্মরণ করে।

 

খুলনা গেজেট/এনএম




খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন