বুধবার । ২৮শে জানুয়ারি, ২০২৬ । ১৪ই মাঘ, ১৪৩২

খালেদার উত্থান, সংগ্রাম ও প্রয়াণ : প্রাসঙ্গিক কিছু কথা

রুশাইদ আহমেদ

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক দীর্ঘ, সংগ্রামময় ও প্রভাবশালী অধ্যায়ের অবসান ঘটল বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) চেয়ারপারসন এবং দেশের সাবেক তিনবারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে খালেদা কেবল একটি রাজনৈতিক দলের দলনেত্রী ছিলেন না। বরং তিনি হয়ে উঠেছিলেন রাষ্ট্রক্ষমতা, প্রতিরোধ ও আপসহীনতার এক অনমনীয় প্রতীক। তাঁর প্রয়াণ কেবল একজন ব্যক্তির মৃত্যু নয় এটি বাংলাদেশের প্রায় চার দশকের একটি কেন্দ্রীয় রাজনৈতিক চরিত্রের বিদায়।

খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক উত্থান ছিল সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত। কতিপয় বিপথগামী সেনা সদস্যের হাতে ১৯৮১ সালের ৩০ মে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান শাহাদাত বরণের আগ পর্যন্ত খালেদা ছিলেন একজন সাধারণ বাংলাদেশি গৃহবধূ। রাজনীতির সঙ্গে ছিল না তার কোনো অন্বয়। স্বামীর হত্যাকাণ্ডের পর দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা এবং বিএনপি’র তৃণমূল নেতাকর্মীদের চাপ রাজনীতির দিকে ঠেলে দেয় তাঁকে। ১৯৮২ সালের ৩ জানুয়ারি বিএনপিতে যোগদানের মাধ্যমে তাঁর রাজনৈতিক জীবনের সূচনা হয়। এটিকে ব্যক্তিগত শোককে রাজনৈতিক দায়িত্বে রূপান্তরের এক বিরল দৃষ্টান্ত হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন বহু রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

মূলত এরশাদ শাসনামলই খালেদা জিয়াকে জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রে নিয়ে আসতে প্রভাবকের ভূমিকায় আবির্ভূত হয়। ১৯৮৩ সালে বিএনপি’র সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান এবং ১৯৮৪ সালে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় চেয়ারপারসন নির্বাচিত হয়ে তিনি দ্রুত দলের অবিসংবাদিত নেত্রীতে পরিণত হন। এরশাদের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলনে আরেক বৃহৎ দলের প্রধান শেখ হাসিনার সঙ্গে রাজপথে যুগপৎ অবস্থান, একাধিকবার গ্রেপ্তার ও কারাবরণের মধ্য দিয়ে এই সময়েই ক্রমান্বয়ে গড়ে ওঠে তাঁর ‘আপসহীন’ পরিচয়। বিশেষ করে ১৯৮৬ সালের এরশাদ-আয়োজিত নির্বাচনে অংশ না নেওয়ার সিদ্ধান্ত তাঁকে রাতারাতি দেশের রাজনৈতিক পরিম-লে ব্যাপক জনপ্রিয় করে তোলে।

১৯৯০ সালে স্বৈরাচার এরশাদের পতনের পর ১৯৯১ সালের নির্বাচন খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবনের প্রথম বড় সাফল্য হিসেবে ধরা দেয়। যাকে বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম সুষ্ঠু নির্বাচন হিসেবে আখ্যা দিয়ে থাকেন অনেকেই। এই নির্বাচনে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে প্রথমবারের মতো প্রধানমন্ত্রী হন বেগম খালেদা জিয়া। নারী নেতৃত্বের ক্ষেত্রে এটি ছিল এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত। তৎকালীন সময়ে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী বেনজির ভুট্টোর পর মুসলিম বিশ্বের দ্বিতীয় নারী প্রধানমন্ত্রী হওয়ার গৌরব অর্জন করেন তিনি। প্রথম মেয়াদেই তিনি সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা, মন্ত্রিপরিষদশাসিত সরকার ব্যব¯ায় প্রত্যাবর্তন এবং রাষ্ট্রীয় কাঠামোকে নির্বাচিত সরকারের অধীনে ফিরিয়ে আনার মতো পদক্ষেপগুলোকে জনসাধারণ ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করে।

খালেদার রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের প্রথম টার্নিংপয়েন্ট দেখা দেয় ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর। নির্বাচনটিতে সরকার প্রধান হিসেবে তিনি পুনর্নির্বাচিত হলেও, নির্বাচন প্রক্রিয়া নিয়ে ব্যাপক বিতর্কের সৃষ্টি হয়। তবে অন্যান্য স্বৈরাচারী শাসকদের মতো খালেদা জিয়া ক্ষমতা আঁকড়ে ধরে বসে থাকেননি। জনঅসন্তোষের বাস্তবতা স্বীকার করে বিরোধীদের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে পুনর্নির্বাচনের দাবি মেনে নিয়ে পদত্যাগ করেন তিনি। এটি তাঁর রাজনৈতিক জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ নৈতিক অবস্থান হিসেবে বিবেচিত হয়। পরবর্তী নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলেও শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তরের নজির স্থাপন করায় দেশ-বিদেশে প্রশংসা কুড়ান খালেদা।

এরপর ২০০১ সালে চারদলীয় জোটের নেতৃত্বে তৃতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রী হয়ে খালেদা জিয়া আবারও তাঁর নির্বাচনি অপরাজেয়তার দৃষ্টান্ত তুলে ধরেন। বগুড়া, ফেনী, লক্ষ্মীপুর, চট্টগ্রামের চারটি আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে বিপুল ভোটের ব্যবধানে জয় তুলে নিয়ে তিনি দেখান তাঁর অন্যায্যতার সঙ্গে আপসহীনতার পক্ষে জনরায় ফুরাবার নয়। এই মেয়াদে নারী শিক্ষার প্রসার ও ক্ষমতায়ন, মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠা, এবং কঠোর হাতে সন্ত্রাসবাদ দমনের মতো কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের নজির গড়ে তাঁর সরকার নিজেদের ইমেজ আরও বৃদ্ধি করে।
কিš ২০০৬ সালের পর তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রধান নির্বাচন নিয়ে বিতর্ক দেশে ফের রাজনৈতিক অচলাবস্থার সৃষ্টি করে। পরে ১/১১-এর সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে গ্রেপ্তার ও কারাবরণ এবং পরবর্তীতে ২০০৮ সালে ক্ষমতায় আসা আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টের কথিত দুর্নীতির মামলায় কারাবাস তাঁর রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে কঠিন পরিচ্ছেদ হিসেবে আবির্ভূত হয়। তবে দীর্ঘদিন কারাবাস, শারীরিক অসুস্থতা, দলের ওপর অব্যাহত দমন-পীড়ন ও চাপ আসার পরিপ্রেক্ষিতে বিদেশে যাওয়ার সুযোগ থাক সত্ত্বেও তাঁর দেশে থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত ফের তাঁকে আপসহীন নেত্রী হিসেবে দেশের মানুষের সামনে উপস্থাপন করে।

২০০৮ সালের পর ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে বিএনপি’র ওপর দমননীতি আরও তীব্র হলে হাজারো মামলা, গ্রেপ্তার, গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যার অভিযোগের পাশাপাশি খালেদা জিয়াকেও করা হয় রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা। ২০১০ সালে প্রয়াত স্বামী এবং বাংলাদেশের অন্যতম সফল রাষ্ট্রপ্রধান শহীদ মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানের স্মৃতিবিজরিত সেনানিবাসের বাসভবন থেকে তাঁকে উচ্ছেদ, ২০১৪ সালের নির্বাচনে অংশ নিতে তাঁকে গৃহবন্দী করে রাখার কূটকৌশল এবং ২০১৮ সালে দুর্নীতির মামলায় কারাদ- প্রদান তাঁর ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক জীবনে গভীর ক্ষতের জন্ম দেয়। পুরোনো পরিত্যক্ত কারাগারে একাকী বন্দিত্বের দিনগুলো তাঁকে শারীরিক ও মানসিকভাবে ভেঙে দিলেও রাজনৈতিকভাবে তাঁর প্রতীকী শক্তি হয়ে ওঠে আরও দৃঢ়।

রাজনৈতিক বোদ্ধাদের মতে, ২০১৪ ও ২০২৪ সালের নির্বাচন বর্জন, ২০১৮ সালে নির্বাচনে অংশ নিতে না পারা এই সময়গুলোতে সরাসরি রাজনীতিতে খালেদার সক্রিয়তা হ্রাস করলেও তাঁর পরোক্ষ উপস্থিতি বিএনপি’র রাজনীতিতে ছিল প্রভাব বিস্তারকারী। দুর্নীতির মামলা থেকে করোনা মহামারীর সময় শর্তসাপেক্ষে মুক্তি পেয়ে কার্যত গৃহবন্দি অবস্থায় থেকেও তিনি দলের জন্য প্রেরণার উৎস হিসেবে বিদ্যমান ছিলেন।
এতদসত্ত্বেও ২০২৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যু একটি দীর্ঘ রাজনৈতিক যুগের সমাপ্তির বার্তা ছড়িয়ে দেয় দেশবাসীর মাঝে। খালেদার প্রায় সাড়ে চার দশকের রাজনৈতিক জীবন ক্ষমতা ও প্রতিরোধের দ্বন্দ্বে পরিপূর্ণ থাকলেও, তাঁর উত্থান প্রমাণ করে কীভাবে ব্যক্তিগত শোক এবং দেশের ক্রান্তিলগ্ন এক দৃঢ় রাজনৈতিক নেতৃত্বের আবির্ভাব ঘটাতে পারে, যা একইসঙ্গে আপসহীন, বাস্তববাদী এবং স্বমহিমায় ভাস্বর। আর তাঁর সংগ্রাম আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় ক্ষমতাচক্রের বাইরে থেকেও কীভাবে একজন নেতা ইতিহাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র হয়ে থাকতে পারেন। খালেদাদের মতো আপসহীন, ন্যায়পন্থা বাস্তববাদী রাজনৈতিক চেতনার ঝাঞ্ঝাবাহী ব্যক্তিত্বদের আবির্ভাব যখনই ঘটবে, তখনই ইতিহাসের বাঁক বারেবারে এভাবে হয়ে উঠবে অম্লান।

লেখক : কবি, সাংবাদিক ও কলামিস্ট।

 

খুলনা গেজেট/এনএম




খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন