ইংরেজ কবি Ben Jonson বলেছেন, “মানব জীবন সদ্য প্রস্ফুটিত লিলি ফুলের মতো।” লিলি ফুল রূপ-গন্ধ-বর্ণ বিতরণ করে মানব মনে স্থায়ী আসন অধিকার করে নিজের ক্ষুদ্র জীবন সার্থকতায় ভরে দিয়ে ঝরে যায়। ঝরা ফুলের মতো এমন একটি জীবনের নামে শহিদ শরিফ ওসমান বিন হাদি।
তিনি ছিলেন জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের অন্যতম সম্মুখযোদ্ধা এবং ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র। শরিফ ওসমান বিন হাদি গত ১৮ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখে সিঙ্গাপুর জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন। এর আগে ১২ ডিসেম্বর শুক্রবার জুমআ’র নামাজের পর রাজধানী ঢাকার বিজয়নগরের বক্স কালভার্ট এলাকায় দুর্বৃত্তের গুলিতে তিনি গুরুতর আহত হন। এ অবস্থায় হাদিকে প্রথমে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এবং পরে এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে গত ১৫ ডিসেম্বর তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য এয়ার এ্যাম্বুলেন্সে সিঙ্গাপুরে নেওয়া হয়। সেখানে জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে থাকার পর তিনি শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৩২ বছর।
গত ২০ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখে জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় ওসমান হাদির জানাজা সম্পন্ন হয়। লাখো মানুষের ঢল নামে জানাজায়। লাখ লাখ নামগোত্রহীন মানুষ মিছিলে শামিল হয়ে জানাজায় যোগ দিয়েছে, বারবার উচ্চারণ করেছে শহিদ ওসমান হাদির দেশপ্রেমের কথা, নিঃস্বার্থ আত্মত্যাগের কথা। জানাজা শেষে তাকে বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের কবরের পাশে সমাহিত করা হয়। জানাজায় দূর দূরান্ত থেকে অংশ নিতে আসা ছাত্র-জনতা বলেছেন, “জীবদ্দশায় এত বড় জানাজা আর কখনও দেখেনি।”
ওসমান হাদি ছিলেন প্রকৃত দেশপ্রেমিক, মুমিন ও মহান আল্লাহকে অধিক পরিমাণে স্মরণকারী। মূলত তিনি ছিলেন সত্যবাদী, ন্যায়বান, সৎ ও নির্লোভী এক সংগ্রামী আদর্শ মানুষ। তিনি জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের বিপ্লবী আদর্শে অনুপ্রাণিত ছিলেন। তার কবিতার সংকলন ‘লাভায় লালশাক পুবের আকাশ’ (সীমান্ত শরিফ ছদ্মনামে) তরুণদের মধ্যে দেশপ্রেমের স্ফুরণ ঘটিয়েছিল। ন্যায়, প্রতিবাদ ও মানবিকতার পক্ষে তার কণ্ঠ ছিল স্পষ্ট ও দৃঢ়। ইনসাফভিত্তিক রাষ্ট্র কায়েমের জন্য তিনি লড়াই করেছেন। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন, “হে মুমিনরা! তোমরা ইনসাফের ওপর দৃঢ়ভাবে দাঁড়াও যদিও তা তোমাদের নিজেদের বিরুদ্ধেই যায়।” (সুরা নিসা : ১৩৫) এই ইনসাফই ছিল তার ইবাদত, তার রাজনীতি, তার মানবতা। যে ইনকিলাবের কথা তিনি বলেছেন তা কোনো আবেগি স্লোগান ছিল না, ছিল সুস্পষ্ট নৈতিক অবস্থান। তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন, “যত ভালো কথা, যত বড় আদর্শই শোনানো হোক না কেন, মানুষের আর্থিক ভিত্তি যদি শক্ত না হয় তাহলে তার কোনো কার্যকারিতা নেই। চরম দারিদ্র্য মানুষকে ধীরে ধীরে দুর্নীতিগ্রস্ত ও অপরাধপ্রবণ করে তোলে। আর যত দিন এই দারিদ্র্য থাকবে, ততদিন একটি ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র গড়ে তোলা অসম্ভব।”
ওসমান হাদির জীবন ছিল আরাম ও নিরাপত্তার বাইরে, ছিল সংঘাত, চাপ, অবহেলা ও ঝুঁকির। অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলা, সুবিধাবাদের রাজনীতির বাইরে থাকা এবং মানুষের অধিকার নিয়ে আপোশহীন অবস্থান নেওয়া, এসবের মূল্য তাকে দিতে হয়েছে প্রতিদিন। তবুও তিনি পিছু হটেননি। বহুবার সতর্ক করা হলেও তিনি অবিচল ছিলেন। কারণ তার কাছে ব্যক্তিগত স্বস্তির চেয়ে দেশের কল্যাণ ছিল বড়। ‘শরিফ ওসমান বিন হাদি’ এখন কেবল একজন ব্যক্তির নাম নয়, এটি হয়ে উঠেছে প্রতিবাদী কণ্ঠ, তারুণ্যের সাহস এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর প্রতীক।
ওসমান হাদি ছিলেন আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-৮ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী। তিনি নির্বাচনে দাঁড়ালেও নির্বাচনে জয়ী হওয়া নিয়ে মরিয়া ছিলেন না। বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গকে তিনি এক উজ্জ্বল নক্ষত্রের মতো আবির্ভূত হয়ে এক যোদ্ধার গৌরবময় জীবন রেখে গেছেন। ক্ষমতার ভাষা নয়, তিনি বেছে নিয়েছিলেন জনতার ভাষা। বত্রিশ বছরের জীবনে দেশপ্রেমের প্রশ্নে ওসমান হাদি যে ইমপ্যাক্ট রেখে গেছেন, সেটাই তার সফলতা। নিজের জীবন উপেক্ষা করে তিনি কেবল একটি নিরাপদ বাংলাদেশ দেখতে চেয়েছিলেন। অল্প সময়েই তিনি নিজেকে জাতীয় নেতৃত্বের শিখরে তুলে আনতে সক্ষম হন। কিন্তু শত্রুর বুলেট তার জীবন কেড়ে নেয় এবং জাতিকে এক সম্ভাবনায় নেতার সেবা থেকে বঞ্চিত করে।
শরিফ ওসমান বিন হাদির মৃত্যু দেশের প্রতিটি মানুষকে ব্যথিত করেছে। দলমত নির্বিশেষে সব মানুষ কষ্ট পেয়েছে, শোকার্ত হয়েছে। ২০ ডিসেম্বর হাদির জানাজায় লাখো মানুষের ঢল তার প্রমাণ। শেষ বিদায়ে খুব কম মানুষই এরকম অশ্রুসিক্ত ভালোবাসা পান।
ঘাতকের বুলেট তার মস্তিষ্ক ভেদ করলেও তার আদর্শকে স্পর্শ করতে পারেনি। মানুষ তার কীর্তির মাঝেই বেঁচে থাকে। ক্ষণজন্মা শহিদ শরিফ ওসমান বিন হাদিও তার কর্মের আদর্শ নিয়ে আমাদের অন্তরে বেঁচে থাকবেন চিরকাল। তাই তো হাদির জানাজার আগে দেওয়া বক্তব্যে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, “প্রিয় ওসমান হাদি, তোমাকে আমরা বিদায় দিতে আসেনি। তুমি আমাদের বুকের ভেতরে আছো। বাংলাদেশ যত দিন থাকবে, তত দিন তুমি সব বাংলাদেশির বুকের মধ্যে থাকবে। এটা কেউ সরাতে পারবে না।”
লেখক : সম্পাদক, মাসিক সারস রূপসা, খুলনা।
খুলনা গেজেট/এনএম



