বুধবার । ২৮শে জানুয়ারি, ২০২৬ । ১৪ই মাঘ, ১৪৩২

বিশ্ব ইতিহাসে প্রত্যাবর্তনের রাজনীতি এবং বীরের বেশে ঢাকায় তারেক রহমান

নিয়াজ মাহমুদ

ইতিহাসে কিছু প্রত্যাবর্তন কেবল একজন ব্যক্তির ঘরে ফেরা নয়, তা একটি দেশের রাজনীতির দিকনির্দেশনা বদলে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। দীর্ঘ নির্বাসন, কারাবাস কিংবা রাজনৈতিক নীরবতার পর কোনো নেতার স্বদেশ প্রত্যাবর্তন অনেক সময় হয়ে ওঠে গণআকাক্সক্ষার প্রতীক, ক্ষমতার রাজনীতিতে নতুন মেরূকরণের সূচনা এবং রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ পথনকশা নির্ধারণের মুহূর্ত। বাংলাদেশ আজ তেমনই এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে।

দীর্ঘ ১৭ বছর নির্বাসনে থাকার পর বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন নিছক ব্যক্তিগত বা দলীয় ঘটনা নয়। এটি এমন এক রাজনৈতিক ঘটনা, যা বাংলাদেশের আসন্ন জাতীয় নির্বাচন, ক্ষমতার ভারসাম্য, বিরোধী রাজনীতির ভবিষ্যৎ এবং আঞ্চলিক কূটনীতির ওপর সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলতে পারে। বিমানবন্দরে খালি পায়ে মাটিতে পা রাখা, এক মুঠো মাটি হাতে নেওয়ার প্রতীকী দৃশ্য সবকিছুই ইঙ্গিত দেয়, এই প্রত্যাবর্তনকে কেবল আনুষ্ঠানিক সফর হিসেবে নয়, বরং রাজনৈতিক পুনর্জন্ম হিসেবেই উপস্থাপন করতে চায় বিএনপি।

বিশ্ব ইতিহাসে প্রত্যাবর্তনের রাজনীতি নতুন নয়। নেলসন ম্যান্ডেলা ২৭ বছর কারাবাস শেষে যখন দক্ষিণ আফ্রিকায় ফিরেছিলেন, তখন তিনি শুধু রাষ্ট্রক্ষমতা অর্জনের কথা ভাবেননি; ভেবেছিলেন একটি বিভক্ত জাতিকে কীভাবে এক করা যায়। প্রতিশোধ নয়, পুনর্মিলন এই রাজনৈতিক দর্শনই তাকে ইতিহাসের অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে।

রাশিয়ায় ১৯১৭ সালে ভ্লাদিমির লেনিনের প্রত্যাবর্তন ছাড়া বলশেভিক বিপ্লব কল্পনাই করা যায় না। নির্বাসনে বসেই তিনি বিপ্লবের তত্ত্ব নির্মাণ করেছিলেন, আর দেশে ফিরে ইতিহাসের গতিপথ পাল্টে দেন। ইরানে আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির ১৫ বছরের নির্বাসন শেষে স্বদেশে ফেরা মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে। ইউরোপে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় চার্লস দ্য গল নির্বাসন থেকে ফিরে ফ্রান্সের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন এবং যুদ্ধোত্তর রাষ্ট্রগঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।

উপমহাদেশের ইতিহাসেও প্রত্যাবর্তনের গুরুত্ব অপরিসীম। মহাত্মা গান্ধী ১৯১৫ সালে দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে ভারতে ফিরে এসে স্বাধীনতা আন্দোলনকে অভিজাত পরিসর থেকে বের করে এনে গণমানুষের আন্দোলনে রূপ দেন।

অন্যদিকে পাকিস্তানে বেনজির ভুট্টোর প্রত্যাবর্তন ছিল আবেগঘন, জনসমর্থনে ভরপুর, কিন্তু নিরাপত্তাহীনতা ও সহিংসতার ফাঁদে পড়ে শেষ পর্যন্ত মর্মান্তিক পরিণতিতে গিয়ে ঠেকেছিল।
বাংলাদেশের ইতিহাসেও প্রত্যাবর্তনের মাহাত্ম্য কম নয়। ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানের কারাগার থেকে স্বাধীন দেশে ফিরে এসে রাষ্ট্র পরিচালনার সূচনা করেন।

প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের শাসনামলে ১৯৭৫ সালে শেখ হাসিনার ভারত থেকে স্বদেশ প্রত্যাবর্তনও ছিল এক গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ঘটনা। রাজনৈতিক আশ্রয়ে থাকা সেই প্রত্যাবর্তনের কিছুদিন পরই দেশকে হারাতে হয় জনপ্রিয় প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানকে যা বাংলাদেশের রাজনীতিকে নিয়ে যায় এক রক্তাক্ত ও অনিশ্চিত অধ্যায়ে।

এই উদাহরণই দেখায় প্রত্যাবর্তন নিজেই কোনো সমাধান নয়; বরং এটি নতুন এক পরীক্ষার শুরু।

তারেক রহমানের রাজনৈতিক জীবনও সহজ ছিল না। দুর্নীতি মামলা, ২০০৭ পরবর্তী রাজনৈতিক পটপরিবর্তন, সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় দেশত্যাগ এবং দীর্ঘ লন্ডনবাস সব মিলিয়ে তিনি রাজনীতিতে এক প্রভাবশালী চরিত্র। সরাসরি মাঠের রাজনীতি থেকে দূরে থাকলেও বিএনপির নীতিনির্ধারণ, আন্দোলনের কৌশল ও সাংগঠনিক সিদ্ধান্তে তার ছায়া ছিল স্পষ্ট।

এই দীর্ঘ অনুপস্থিতির কারণে বিএনপি একদিকে যেমন নেতৃত্ব সংকটে ভুগেছে, অন্যদিকে তৃণমূলে তৈরি হয়েছে ‘প্রত্যাবর্তনের প্রতীক্ষা’। ঢাকায় তারেক রহমানকে ঘিরে যে জনস্রোত, জেলা উপজেলা থেকে নেতাকর্মীদের ঢল তা প্রমাণ করে, এই প্রত্যাবর্তন বিএনপির কাছে কতটা আবেগঘন এবং রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

তবে রাজনীতির বাস্তবতা আবেগে চলে না। তারেক রহমানের সামনে চ্যালেঞ্জের তালিকা দীর্ঘ। প্রথমত, বিএনপিকে কেবল আন্দোলননির্ভর দল থেকে একটি বিশ্বাসযোগ্য শাসনক্ষমতার বিকল্প হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা। দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে থাকা একটি দলের জন্য এটি সহজ নয়। দ্বিতীয়ত, দলের ভেতরের বিভক্তি ও পুরোনো মুখনির্ভর রাজনীতি থেকে বেরিয়ে এসে নতুন নেতৃত্ব তৈরি করা। তৃতীয়ত, অতীতের দুর্নীতির অভিযোগ ও বিতর্কিত অধ্যায়গুলোর রাজনৈতিক মোকাবিলা।

এই প্রেক্ষাপটে তারেক রহমানের গণসংবর্ধনা মঞ্চের ভাষা বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। সেখানে প্রতিশোধের হুংকার নেই, নেই শত্রু চিহ্নিত করার চিরচেনা রাজনৈতিক বাগাড়ম্বর। বরং ‘নিরাপদ বাংলাদেশ’, ‘সবাই মিলে দেশ গড়া’, ‘হ্যাভ অ্যাঁ প্ল্যান’ এই শব্দগুলো ইঙ্গিত দেয় একটি সচেতন রিব্র্যান্ডিংয়ের। এটি বিএনপি’র ঐতিহ্যগত রাজনীতির সঙ্গে পুরোপুরি সংগতিপূর্ণ না হলেও, সময়ের বাস্তবতায় প্রাসঙ্গিক।

বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতা বদলে গেছে। ছাত্রজনতার গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী সমাজে কেবল সরকারবিরোধিতা দিয়ে রাজনীতি করা আর সম্ভব নয়। জনগণ জানতে চায় বিকল্প কী? অর্থনীতি, কর্মসংস্থান, দুর্নীতি দমন, আইন-শৃঙ্খলা ও পররাষ্ট্রনীতিতে বিএনপি’র স্পষ্ট রূপরেখা কী? তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তন সেই প্রশ্নগুলোর মুখোমুখি দাঁড়ানোর সুযোগ তৈরি করেছে।

তারেক রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন নিয়ে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেছেন, একজন বাংলাদেশি নাগরিক ও রাজনৈতিক নেতার নিজ ভূমিতে ফেরার এই অধিকারটি পুনরুদ্ধার হওয়া আমাদের গণতান্ত্রিক লড়াইয়েরই একটি ইতিবাচক প্রতিফলন। এই প্রত্যাবর্তন দেশের বহুদলীয় গণতন্ত্রের চর্চাকে আরও সুসংহত করবে। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় তার ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে এক পোস্টে এমন মন্তব্য করেন তিনি।

আঞ্চলিক রাজনীতির দিক থেকেও এই প্রত্যাবর্তন গুরুত্বপূর্ণ। ভারতের সঙ্গে বিএনপির সম্পর্ক ঐতিহাসিকভাবে শীতল। দিল্লির দৃষ্টিতে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি এক অনিশ্চিত সমীকরণ। বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে ভারতের টানাপড়েনের বাস্তবতায় তারেক রহমানের রাজনৈতিক উত্থান দিল্লির জন্য অস্বস্তিকর হলেও তা উপেক্ষণীয় নয়। ভবিষ্যতে বিএনপি ক্ষমতায় গেলে ভারত বাংলাদেশ সম্পর্ক কোনো পথে যাবে এই প্রশ্নও নতুন করে আলোচনায় আসবে।

অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে জামায়াতে ইসলামির সম্ভাব্য শক্ত অবস্থান, বিরোধী ভোটব্যাংকের বিভাজনের আশঙ্কা এবং নির্বাচনী প্রতিযোগিতার তীব্রতা, সবকিছু মিলিয়ে রাজনীতির মাঠ আরও জটিল হয়ে উঠছে। এই বাস্তবতায় শক্তিশালী নেতৃত্বের প্রত্যাবর্তন অনেকের জন্য যেমন আশার, তেমনি কারও কারও জন্য অস্বস্তির কারণ। তারেক রহমানের দেশে ফেরাকে স্বাগত জানিয়েছে জামায়াতে ইসলামী। দলটির আমির শফিকুর রহমান বলেছেন, ‘তার একজন রাজনৈতিক সহকর্মী দীর্ঘ ১৭ বছর পর সরাসরি রাজনীতির মাঠে ফিরছেন, এটিকে তিনি ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন।’ একই সঙ্গে শফিকুর রহমান বলেছেন, ‘বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে ঐক্যের ব্যাপারে তারেক রহমান কী ভূমিকা রাখেন, অথবা কী পরিকল্পনা আছে তার এবং বাস্তবায়ন কীভাবে করবেন এসব বিষয়ে জামায়াত নজর রাখবে।’

ইতিহাস বলে, প্রত্যাবর্তন তখনই সফল হয়, যখন নেতা সময়ের ভাষা বুঝতে পারেন। লেনিন দেশে ফিরে বিপ্লব করেছিলেন, খোমেনি রাষ্ট্রব্যবস্থা উল্টে দিয়েছিলেন, ম্যান্ডেলা জাতিকে মিলিয়েছিলেন। প্রত্যেকের পথ আলাদা, কিন্তু সবার সামনে ছিল ইতিহাসের কঠিন পরীক্ষা।
তারেক রহমানের ক্ষেত্রেও সেই পরীক্ষাই শুরু হয়েছে। তিনি কি অতীতের প্রতিহিংসাপরায়ণ রাজনীতি থেকে বেরিয়ে এসে অন্তর্ভুক্তিমূলক ও ভবিষ্যৎমুখী নেতৃত্ব দিতে পারবেন? তিনি কি বিএনপিকে কেবল ক্ষমতার জন্য নয়, রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য প্রস্তুত করতে পারবেন? তিনি কী আস্থার সংকট কাটিয়ে উঠতে পারবেন দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পরিসরে?

তারেক রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন তাই কোনো শেষ অধ্যায় নয় এটি একটি নতুন রাজনৈতিক উপন্যাসের প্রথম পৃষ্ঠা। এই উপন্যাসের পরিণতি নির্ভর করবে তার রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, সংযম, দূরদর্শিতা এবং সময়ের দাবির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার ক্ষমতার ওপর। বাংলাদেশ আজ তাকিয়ে আছে এই প্রত্যাবর্তনের ইতিহাস গড়ার দিকে।

লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট।
Email : niazjournalist@gmail.com




খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন