প্রকৃতিতে শীতের আগমন ঘটেছে। কুয়াশামাখা ভোরে কিংবা হিমেল বাতাসে শীতের তীব্রতা এখন স্পষ্ট। বিত্তবানদের কাছে এই সময়টা পিঠা উৎসব আর ফ্যাশনের উপলক্ষ্য হতে পারে। কিন্তু সমাজের সুবিধাবঞ্চিত মানুষের কাছে শীত আসে অভিশাপ হয়ে। বিশেষ করে পথশিশু ও হতদরিদ্র মানুষের জন্য শীতকাল এক নির্মম যন্ত্রণার নাম।
শহরের যান্ত্রিক জীবনে রাতের গভীরতা বাড়ার সাথে সাথে ফুটপাতের চিত্রটা ভয়ানক হয়ে ওঠে।
রাজধানীর বিভিন্ন স্টেশন, টার্মিনাল বা রাস্তার ধারে তাকালে দেখা যায় হাড়কাঁপানো শীতে কুণ্ডলী পাকিয়ে শুয়ে আছে অসংখ্য মানুষ। এদের বড় একটি অংশ শিশু। গায়ে সামান্য সুতির জামা কিংবা ছেঁড়া বস্তা জড়িয়ে তারা শীত নিবারণের ব্যর্থ চেষ্টা করে। কনকনে ঠান্ডায় তাদের হাত-পা জমে আসে এবং দাঁতে দাঁত লেগে শরীর কাঁপতে থাকে। অনেক সময় আবর্জনা পুড়িয়ে আগুন জ্বালিয়ে একটু উষ্ণতা খোঁজার দৃশ্য আমাদের বিবেকে আঘাত করে। কুকুর আর মানুষ যখন উষ্ণতার জন্য একে অপরের গা ঘেঁষে ঘুমায়, তখন মানবতার চরম বিপর্যয় ফুটে ওঠে। ঢাকার পাশাপাশি দেশের অন্য শহরগুলোতেও একই চিত্র দেখা যায়।
শহরের মতো গ্রামের দরিদ্র মানুষের অবস্থাও শোচনীয়। বিশেষ করে উত্তরাঞ্চলের জেলাগুলোতে শীতের প্রকোপ বেশি হওয়ায় সেখানকার জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। জরাজীর্ণ ঘরবাড়ি হিমেল হাওয়া আটকাতে পারে না। বৃদ্ধ ও শিশুরা নিউমোনিয়া এবং শ্বাসকষ্টের মতো রোগে আক্রান্ত হয়। দিনমজুরেরা ঠান্ডার কারণে কাজে যেতে পারে না বলে তাদের আয়ের পথ কমে আসে। পেটের ক্ষুধা আর হাড়কাঁপানো শীতের চাপে তাদের জীবন বিপন্ন হয়ে পড়ে।
শীতের এই দুর্ভোগ আমাদের সমাজব্যবস্থার বৈষম্যকে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়। একদল লেপ-কম্বলের নিচে আরামে ঘুমায় আর অন্যদল শীতে ঠকঠক করে কাঁপে। প্রতি বছর বিভিন্ন সংগঠন কিছু শীতবস্ত্র বিতরণ করে। তবে প্রয়োজনের তুলনায় তা নগণ্য। আবার অনেকে সাহায্যের নামে ছবি তোলা বা লোক দেখানো প্রচারণায় ব্যস্ত থাকে যা অত্যন্ত লজ্জাজনক। ফটোসেশন নয় বরং শীতার্তদের প্রয়োজন প্রকৃত সহানুভূতি।
রাষ্ট্রের উচিত দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে এই অসহায় মানুষদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা। পাশাপাশি আমাদের ব্যক্তিগত উদ্যোগও জরুরি। অব্যবহৃত পুরনো গরম কাপড় বা সামর্থ্য অনুযায়ী নতুন কম্বল নিয়ে আমরা তাদের পাশে দাঁড়াতে পারি। আসুন আমরা মানবিক হই। শীতের রাতে উষ্ণ বিছানায় ঘুমানোর আগে একবার অন্তত রাস্তার ওই মানুষগুলোর কথা ভাবি। আমাদের সামান্য সহযোগিতাই পারে তাদের মুখে হাসি ফোটাতে এবং শীতের প্রকোপ থেকে বাঁচাতে।
লেখক : শিক্ষার্থী, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়।
খুলনা গেজেট/এনএম



