২০০১ সালে অষ্টম শ্রেণিতে পড়াকালীন দুর্ঘটনায় চোখ হারানোর পর ওই বছর খুলনার পিএইচটি সেন্টারে ব্রেইলে হাতে খড়ি দিয়ে নতুন শিক্ষা ব্যবস্থার যাত্রা শুরু হয়। এখান থেকেই ব্রেইল শিখে ২০০৪ সালে নড়াইলের একটি স্কুলে ভালো নম্বর নিয়ে এসএসসি পাস করি। পরবর্তীতে ২০০৬ সালে ফুলতলা এমএম কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হই। ২০১০ সালে অনার্স শেষ করে সেখান থেকে ২০১২ সালে মাস্টার্স সম্পন্ন করি। এরপর ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করি। পরে বিসিএস দিয়ে সমাজসেবা অফিসার হিসেবে যোগদান করার পর বর্তমানে দৃষ্টি প্রতিবন্ধী স্কুলের প্রধান শিক্ষক হিসেবে কর্মরত আছি।”
এভাবেই নিজের পথচলার কথা বলছিলেন ফুলতলার দক্ষিণদিহির দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী এস এম সাকিব।
তিনি বলেন, “সমাজে এখনও প্রতিবন্ধী মানেই পরিবার বা সমাজের বোঝা-এ ধারণায় বিদ্যমান। আমি কখনোই কারো বোঝা হতে চাইনি। সেটা ছোটবেলাতেই বুঝেছিলাম, পড়াশোনার কোনো বিকল্প নেই। নিজের পায়ে দাঁড়াতে চেয়েছিলাম। সবার দোয়া ও সহযোগিতায় আজ এখানে আসতে পেরেছি, ভালো লাগে।”
নিজে ব্রেইল শিখে আজ দৃষ্টিহীন শিক্ষার্থীদের শেখাতে কেমন লাগে-এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “নিজ প্রতিষ্ঠানে কাজ করতে পেরে আমি সত্যিই আনন্দিত, কারণ এমন সৌভাগ্য সবার হয় না। তবে কাজ করতে গেলে কিছু সমস্যার মুখোমুখি হতেই হয়। আমাদের স্কুলেও শিক্ষক সংকট রয়েছে, পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের পড়ানোর জন্য পর্যাপ্ত উপকরণও নেই। এসব কারণেই তাদের যথাযথ শিক্ষা দিতে গিয়ে মাঝে মাঝে সমস্যার সম্মুখীন হতে হচ্ছে।”
দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী যমজ দুই বোন মোসাঃ ফিরোজা খাতুন ও তার ছোট বোন মোসাঃ সোনিয়া খাতুন। তারা দুই বোন খুলনার পিএইচটি সেন্টারের নিবাসী।
বড় বোন ফিরোজা খাতুন বলেন, “পিএইচটি সেন্টারে প্রথম শ্রেণিতে আমি ও আমার ছোট বোন ভর্তি হয়েছিলাম। ১৩ বছর ধরে এখানেই আছি। এখানে অনেকেই একসঙ্গে থাকি। লেখাপড়া এবং অবসরে বারান্দায় বসে খেলা করি, গান গাই। এতো দিন ধরে সবার সাথে থাকতে থাকতে এটা আমাদের পরিবার হয়ে উঠেছে। বাড়িতে থাকা অবস্থায় হঠাৎ কোথাও যাওয়ার প্রয়োজন হলে সাথে কেউ না থাকলে যাওয়া হতো না। কিন্তু এখানে এতো লোক আছে কেউ না কেউ আমাকে সাহায্য করে। বাড়ি থেকে আমরা এখানেই ভালো আছি। বাড়িতে যেতে খুব একটা ইচ্ছে করে না। আর যদিও যাই, দু’একদিনের বেশি থাকি না। এখানে তো আমরা স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারি, একে অপরের সহযোগিতা করি। কিন্তু বাড়িতে থাকলে বুঝতে পারি আমরা প্রতিবন্ধী। সবার মতো স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করতে পারি না। এখানে সেটা হয় না, আমরা সবাই সমান। সবাই সবাইকে সাহায্য করি।”
লেখাপড়ার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “আমরা যারা দৃষ্টি প্রতিবন্ধী আছি ব্রেইলের বই পড়া শিখি। এসএসসি পর্যন্ত ব্রেইলের বই থাকায় আমাদের সমস্যা হয়নি। কিন্তু এইচএসসিতে এসে বাংলা, ইংরেজি ব্রেইলের দুটো বই পেয়েছি। বাকিগুলো না থাকায় জেনারেল বইগুলো অডিও মাধ্যমে শুনে শুনে মুখস্ত করতে হয়। এর জন্য আমাদের সমস্যা হয়। এবারের এইচএসসিতে খুলনার দৌলতপুর মুহসীন মহিলা কলেজ থেকে আমি ৪.০০ পয়েন্ট পেয়ে পাস করেছি। আর ছোট বোন সোনিয়া ৪.৬৭ পয়েন্ট পেয়েছে।
নিজের স্বপ্নের কথা জানাতে গিয়ে তিনি বলেন, “আমি শিক্ষক হতে চাই। শিক্ষক হয়ে আমার মতো যারা প্রতিবন্ধী ছোট ভাই-বোন আছে তাদেরকে লেখাপড়া শেখাতে চাই।”
শুধু ফিরোজা আর সোনিয়াই নয়, তাদের সাথে থাকেন বাক প্রতিবন্ধী শাম্মী আক্তারও। তিনি কথা বলতে ও শুনতে পারেন না। কর্তৃপক্ষ ও শিক্ষকদের সহযোগিতায় ইশারায় প্রশ্ন করা হয় শাম্মীকে। তিনি লিখে ও ইশারায় তার উত্তর দেন। এখানে আছেন অনেক দিন ধরে। লেখাপড়া করছে। এইবার এসএসসি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে ভালো ফলাফল করেছেন। এখানে সবার সাথে তিনি ভালো আছেন।
খুলনার গোয়ালখালী পিএইচটি সেন্টারের সহকারী তত্ত্বাবধায়ক নার্গিস আক্তার বলেন, “৩০ বছর ধরে আছি। এখানে সবকিছুই স্বাভাবিকভাবে চলে। এখানকার শিক্ষার্থীরা শুধু লেখাপড়া শেখে না, বাক-শ্রবণ যারা আছে- তারা হাতে কাজ করে। তারা ভালো সেলাই করতে পারে, সুন্দর ছবি আঁকতে পারে। যাদের দৃষ্টি নেই, তারা ভালো গান করে। এদের মধ্যে দু’একজন অনেক ভালো গান করে কবিতা আবৃত্তি করে। যারা ভালো করে তারা বিভিন্ন বিভাগীয় প্রোগ্রামে অংশগ্রহণও করে। সবাই তো সমান না। স্বাভাবিক বাচ্চাদের তুলনায় এরা নিজেদেরকে বিকশিত করতে পারে না। কিন্তু এরা যদি ঠিকমতো প্রশিক্ষণ পায়, তবে অনেককেই ভালো কিছু করতে পারবে। ভালো জায়গায় যেতে পারবে। তাদের বোঝানো হয় এরা চাইলে স্বাভাবিকভাবে ভালো কিছু করতে পারে।”
জানা গেছে, “ক্রিশ্চিয়ান এইড, আমরাই পারি পারিবারিক নির্যাতন প্রতিরোধ জোট ও মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন সম্মিলিত ভাবে “Expanding civic space through active CSO participation and strengthened governance system in Bangladesh (ECSAP)” নামে একটি প্রকল্পের মাধ্যমে প্রান্তিক নারী, দলিত, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি, ট্রান্সজেন্ডার, আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রারমান উন্নয়নের লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে।”
দৃষ্টি ও বাক-শ্রবণ প্রতিবন্ধীদের প্রধান শিক্ষক সৈয়দ সাইখ সাজ্জাদ বলেন, “শ্রবণ ও বাক প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের শেখানোর পদ্ধতি আলাদা কিš তাদের শেখার আগ্রহ অনেক। তারা কথা শুনতে বা বলতে না পারলেও হাতের ইশারার মাধ্যমে দ্রুত ভাব বিনিময় শেখে। ক্লাসে আমরা প্রথমে সহজ সংকেত দিয়ে শুরু করি। ধীরে ধীরে তারা জটিল বাক্য ও শব্দরূপও বুঝতে শেখে। শুধু সঠিক সুযোগ আর সঠিক দিশা দিলে তারা যে-কোনো দক্ষতা অর্জন করতে পারে। হস্তশিল্প, ছবি আঁকা যে ক্ষেত্রেই তাদের সুযোগ দিই, তারা নিজেদের প্রতিভা প্রমাণ করে দেখায়। তাদের এই অদম্য মানসিকতাই আমাদের প্রতিদিন নতুনভাবে কাজের অনুপ্রেরণা জোগায়।”
তিনি আরও বলেন, “খুলনা পিএইচটি স্কুলে দৃষ্টি, শ্রবণ ও বাক প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীরা শুধু পড়ালেখাই নয়- নিজেদের সীমাবদ্ধতাকে শক্তিতে পরিণত করার শিক্ষা পাচ্ছে। দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীরা স্পর্শের মাধ্যমে ব্রেইল অক্ষর শিখে।
প্রথমে তাদের জন্য এটি বেশ কঠিন মনে হয় কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই তারা দ্রুততায় পড়া-লেখার দক্ষতা অর্জন করে ফেলে। আমরা প্রতিটি শিশুকে আলাদাভাবে সময় দিই, তাদের শেখার ধরণ বুঝে এগিয়ে যাই। এক একটা শিশুর এক এক দিকে আগ্রহ, আমরা তাদের সেই আগ্রাহটিকে অনুপ্রাণিত করি। আমরা চাই তারা সমাজের বোঝা নয়, সমাজের সম্পদ হয়ে গড়ে উঠুক। বর্তমানে এই স্কুল থেকে পাস করে ঢাকা, জাহাঙ্গীরনগর, রাজশাহী এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় পড়াশোনা করছে।”
খুলনার গোয়ালখালী পিএইচটি সেন্টারের তত্ত্বাবধায়ক ও সমাজসেবা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক মোঃ শফিকুল ইসলাম বলেন, “সরকারি বাক শ্রবণ ও দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী বিদ্যালয়ে ৯০ জন আবাসিক ও ৩০ জন অনাবাসিক শিক্ষার্থী রয়েছে। দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ও বাকশ্রবণ প্রতিবন্ধীদের পৃথক শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। এখানে শিক্ষার্থীদের আন্তরিকতার সঙ্গে পাঠদান করানো হয়। দৃষ্টি প্রতিবন্ধীদের ব্রেইল এবং বাক ও শ্রবণ প্রতিবন্ধীদের বাচনভঙ্গি আর ইশারার মাধ্যমে লেখাপড়া করানো হয়। তারা ভালো রেজাল্টও করছে।”
খুলনা গেজেট/এনএম
