বুধবার । ২৮শে জানুয়ারি, ২০২৬ । ১৪ই মাঘ, ১৪৩২

উপকারী ও পুষ্টিকর সবজি ফুলকপি

মোঃ আবদুর রহমান

ফুলকপি অতি সুস্বাদু ও পুষ্টিকর শীতকালীন সবজি। এর ইংরেজি নাম Brassica Oleracea Var botrytis. ফুলকপিতে যথেষ্ট পরিমাণে ভিটামিন এ,বি,সি, ক্যালসিয়াম, লৌহ, ফসফরাস, পটাশিয়াম এন্টিঅক্সিডেন্ট এবং ফাইটোকেমিক্যালও থাকে।

সাইপ্রাস ও ভূমধ্যসাগরীয় উপকূলসমূহ ফুলকপির উৎপত্তিস্থল। বর্তমানে ইউরোপ, অস্ট্রেলিয়া, এশিয়া ও আফ্রিকার বহু দেশে ফুলকপি চাষ হচ্ছে। ফুলকপি যা আমরা খাই তাকে ইংরেজিতে কার্ড (Card) বলে। এটি আসলে ফুলের পূর্বাবস্থা যাকে বাংলায় বলা হয় পুষ্পমঞ্জরি। এটি পরে ফুলে পরিণত হয়। খাদ্যউপযোগী প্রতি ১০০ গ্রাম ফুলকপিতে ২.৬ গ্রাম আমিষ, ৭.৫ গ্রাম শ্বেতসার, ০.১ গ্রাম চর্বি ও ২.০ গ্রাম আঁশ থাকে। এছাড়া প্রতি ১০০ গ্রাম ফুলকপিতে ১.০ মাইক্রোগ্রাম ভিটামিন ‘এ’, ০.০২ মিলিগ্রাম ভিটামিন বি-১ (থায়ামিন), ০.০৩ মিলিগ্রাম ভিটামিন বি-২ (রাইবোফ্লেভিন), ৯১ মিলিগ্রাম ভিটামিন ‘সি’, ৪১ মিলিগ্রাম ক্যালসিয়াম, ১.৫ মিলিগ্রাম লৌহ, ০.৪১ মিলিগ্রাম জিংক ও ৪১ কিলোক্যালরি খাদ্যশক্তি রয়েছে। আমাদের দেহের পুষ্টিসাধনে এসব পুষ্টি উপাদানের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ফুলকপিতে ওলকপির চেয়ে বেশি পরিমাণে ভিটামিন বি-১ (থায়ামিন) থাকে। ভিটামিন বি-১ স্নায়ুতন্ত্রকে সবল ও স্বাভাবিক রাখে এবং দেহের স্বাভাবিক বৃদ্ধি সাধনে সাহায্য করে। ভিটামিন বি-১ এর মারাত্মক অভাব হলে রেবিবেরি নামক রোগ হয়। এছাড়া ফুলকপি থেকে ভিটামিন বি-২ (রাইবোফ্লেভিন) পাওয়া যায়। শরীরে এই ভিটামিনের অভাব হলে জিহ্বা, ঠোঁট ও মুখের কোনায় ঘা হয়। আমাদের দেশে শত শত শিশু ও স্কুলগামী ছোট ছোট ছেলে-মেয়েরা এ অপুষ্টিজনিত রোগের শিকার। কাজেই শিশু ও পূর্ণবয়স্ক লোকের জন্য ফুলকপি অত্যন্ত উপকারী সবজি। বাঁধাকপি ও ওলকপির তুলনায় ফুলকপি থেকে অধিক পরিমাণে ভিটামিন ‘সি’ পাওয়া যায়। ভিটামিন ‘সি’ আমাদের দাঁত, মাড়ি ও পেশি মজবুত করে।

তাছাড়া ভিটামিন ‘সি’ সর্দি-কাশি ও ঠান্ডার হাত থেকে রক্ষা করে এবং দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। তাই দেহের ভিটামিন ‘সি’ র চাহিদা পূরণে ফুলকপি এবং অন্যান্য ভিটামিন ‘সি’ সমৃদ্ধ শাক সবজি আমাদের বেশি করে খাওয়া উচিত। ভিটামিন ‘সি’ তাপে সংবেদনশীল বলে রান্নার সময় শাক-সবজির শতকরা ৫০ ভাগ ভিটামিন ‘সি’ নষ্ট হয়ে যায়। এজন্য ফুলকপি এবং অন্যান্য শাক-সবজিতে বিদ্যমান ভিটামিন ‘সি’ রক্ষার জন্য উচ্চতাপে অল্প সময়ে রান্না করে যত দ্রুত সম্ভব তা খেয়ে ফেলা উচিত।

বাঁধাকপির চেয়ে ফুলকপিতে বেশি পরিমাণে ক্যালসিয়াম রয়েছে। মানবদেহের হাড় ও দাঁতের গঠন এবং মজবুত করা ক্যালসিয়ামের প্রধান কাজ। তাছাড়া সন্তানকে বুকের দুধ খাওয়ানোর সময় প্রসূতি মায়ের খাবারে যথেষ্ট পরিমাণে ক্যালসিয়াম থাকা প্রয়োজন। আবার ফুলকপিতে কিছু পরিমাণে লৌহ থাকে। দেহে লৌহের অভাব হলে শরীরে অপুষ্টিজনিত রক্তশূন্যতা (ধহরসবধ) রোগ দেখা দেয়। ছোট ছেলে-মেয়েরা এবং গর্ভবতী ও প্রসূতি মায়েরা অতি সহজেই এ রোগের শিকার হয়। কাজেই শিশু, কিশোর-কিশোরী এবং গর্ভবতী ও প্রসূতি মায়ের সু-স্বাস্থ্যের জন্য দৈনন্দিন খাদ্য তালিকায় পর্যাপ্ত পরিমাণে ফুলকপি ও অন্যান্য শাক-সবজি থাকা আবশ্যক।

ফুলকপিতে আছে কলিন (এটি ভিটামিন ‘বি’ কমপ্লেক্স সমৃদ্ধ এক ধরনের পানিজাতীয় পুষ্টি উপাদান) ও ভিটামিন -বি, যা মস্তিষ্কের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কলিন মস্তিষ্কের কগনিটিভ প্রক্রিয়ায় সাহায্য করে। অর্থাৎ এতে স্মৃতিশক্তি বাড়ে ও দ্রুত শিখতে সাহায্য করে। এছাড়া বয়সের কারণে স্মৃতি বিভ্রমের সম্ভাবনা এবং শৈশবে টক্সিনের প্রভাবে মস্তিষ্ক দুর্বলতা কমায়। যদি গর্ভবতী মায়েরা নিয়ম করে ফুলকপি গ্রহণ করেন, তাহলে নবজাতকের মস্তিষ্কের সম্পূর্ণ বিকাশ সাধন ঘটে। চোখের যত্নে ফুলকপির কোন তুলনা হয় না। কারণ ফুলকপিতে বিদ্যমান ভিটামিন ‘এ’ চোখের সঠিক দেখভাল করার জন্য যথেষ্ট। তাই চোখকে সুস্থ আর সুন্দর রাখতে ফুলকপি বেশি বেশি করে খাওয়া উচিত।

ফুলকপিতে রয়েছে প্রচুর খাদ্য আঁশ ও সালফার জাতীয় উপাদান। এসব উপাদান খাবার হজম প্রক্রিয়ায় সাহায্য করে। তাই নিয়মিত পর্যাপ্ত পরিমাণে ফুলকপি খেলে কোষ্ঠ-কাঠিন্য দূর হয় এবং শরীর সুস্থ থাকে। ফুলকপি খাওয়ার আরও একটি উপকারিতা হলো ফুসফুস রক্ষা করা। ভয়াবহ ফুসফুস রোগের জন্য যেসব কারণ দায়ী তা প্রতিরোধে ফুলকপি সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারে। তাই ফুসফুস ভালো রাখতে ফুলকপি খেতে ভুলবেন না। ফুলকপি রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখে। যারা ডায়াবেটিস ও উচ্চরক্তচাপজনিত সমস্যায় ভোগে, তারা ফুলকপি খাবারের তালিকায় রাখাতে দ্বিধা করবেন না। হৃৎপিন্ড ভালো রাখতে ফুলকপি বেশ সহায়ক। এর সালফোরাফেন উপাদান রক্তচাপ কমায় এবং কিডনি ভালো রাখে। তাছাড়া ফুলকপি ধমনীর ভেতরে প্রদাহ রোধ করতেও সাহায্য করে।

ফুলকপিতে আছে এন্টিঅক্সিডেন্ট ক্ষমতা। ক্যানসারের জীবাণু প্রতিরোধ করতে ফুলকপিতে থাকা ভিটামিন উপাদানগুলো এন্টিঅক্সিডেন্টকে শক্তিশালী করে। বিশেষ করে ফুলকপিতে সালফোরাফেন নামে এমন এক উপাদান রয়েছে, যা ক্যানসার প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এই উপাদানটি ক্যানসারের স্টেম সেল ধ্বংস করতে সাহায্য করে এবং বিভিন্ন ধরনের টিউমারের বৃদ্ধিও প্রতিহত করে। স্তন ক্যানসার, প্রোস্টেট, পাকস্থলী, কোলন ও মূত্রথলির ক্যানসার প্রতিরোধে ফুলকপির ভূমিকা অপরিসীম। গবেষকরা বলেছেন, ফুলকপি খেলে মূত্রথলির ক্যান্সারের ঝুঁকি ৪০ শতাংশ কমে যায়। তাই যুক্তরাষ্ট্রের রসওয়েল পার্ক ক্যান্সার ইনস্টিটিউটের চিকিৎসকরা সপ্তাহে অন্তত তিন বার ফুলকপি খাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। ফুলকপি শরীরের বাড়তি মেদ কমিয়ে শরীরকে একটি সুন্দর গঠনে আনতে সাহায্য করে। যারা তাদের শরীরের বাড়তি ওজন নিয়ে চিন্তিত ও ডায়েট করার কথা ভাবছেন, তারা প্রতিদিনের খাদ্য তালিকায় ফুলকপির নাম অন্তর্ভূক্ত করতে পারেন।

ফুলকপি প্রধানতঃ ব্যঞ্জন ও ভাজি হিসেবে রান্না করে খাওয়া হয়। এছাড়া স্যুপ তৈরি করে ও বড়া ভেজে ফুলকপি খাওয়া হয়। ইদানীং সালাদ হিসেবেও এর ব্যবহার শুরু হয়েছে। সালাদ হিসেবে ফুলকপি কাঁচা খাওয়া হয় বলে এতে বিদ্যমান পুষ্টি উপাদানসমূহ অবিকৃত অবস্থায় আমাদের দেহ কর্তৃক গৃহীত হয়।

সুতরাং দেহের পুষ্টি সাধন এবং দেহকে সুস্থ-সবল ও নীরোগ রাখার জন্য শিশু ও পূর্ণবয়স্ক লোকের মৌসুমের সময় বেশি করে ফুলকপি ও অন্যান্য শাক-সবজি খাওয়া একান্ত আবশ্যক।

লেখক : উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা (অবঃ) উপজেলা কৃষি অফিস রূপসা, খুলনা।

 

খুলনা গেজেট/এনএম




খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন