বৃহস্পতিবার । ১৫ই জানুয়ারি, ২০২৬ । ১লা মাঘ, ১৪৩২

ভোটের বছরে দিল্লির চাপ ও ঢাকার চ্যালেঞ্জ

নিয়াজ মাহমুদ

বাংলাদেশ যখন একটি গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় নির্বাচনের দ্বারপ্রান্তে, ঠিক সেই সময় ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েন আর কূটনৈতিক শীতলতা কেবল গুঞ্জন বা আড়াল-আলোচনায় সীমাবদ্ধ নেই-তা এখন প্রকাশ্য। ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশন ঘিরে নিরাপত্তা উদ্বেগের কথা বলে নয়াদিল্লিতে বাংলাদেশ হাইকমিশনারকে তলব, নির্বাচন নিয়ে দিল্লির প্রকাশ্য ‘নসিহত’ এবং সর্বশেষ রাজধানীতে ভারতীয় ভিসা আবেদন কেন্দ্র হঠাৎ বন্ধ-সব মিলিয়ে একটি প্রশ্নই সামনে আসছে: এটি কি কাকতালীয় ঘটনাপ্রবাহ, নাকি সুপরিকল্পিত রাজনৈতিক বার্তা?

ভারতীয় মিডিয়ার খবরে বলা হয়, হাসনাত আবদুল্লাহর বক্তব্যকে ঘিরেই ঢাকা-দিল্লির কূটনৈতিক টানাপোড়েনের সূত্রপাত হয়েছে। এই নেতা তার বক্তব্যে বলেন, ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় সেভেন সিস্টার্সকে ভারত থেকে বিচ্ছিন্ন করা হবে এবং ঢাকায় ভারতবিরোধী শক্তিগুলোকে আশ্রয় দেয়া হবে।

ভারত বলছে, বাংলাদেশে ‘ক্রমাবনতিশীল নিরাপত্তা পরিস্থিতি’র কারণেই ভিসা কেন্দ্র বন্ধ। কিন্তু প্রশ্ন হলো-এই নিরাপত্তা হঠাৎ করে ঠিক নির্বাচনের মুখেই কেন বড় ইস্যু হয়ে উঠল? এতদিন কি এই নিরাপত্তা পরিস্থিতি ভারতের চোখে পড়েনি? নাকি ভোটের সময়ই উদ্বেগের মাত্রা বাড়ে?

এই প্রেক্ষাপটে ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশনে ‘ঢুকে পড়ার’ হুঁশিয়ারি কিংবা ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদীদের আশ্রয় দেওয়ার মতো বক্তব্য নিঃসন্দেহে ভুল, আবেগী ও আত্মঘাতি রাজনীতি। রাষ্ট্র চলে আবেগে নয়, হিসেবের খাতায়। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে গরম কথা যত সহজ, তার মূল্য তত বেশি।

ইতিহাস খুব বেশি দূরের নয়। আগরতলায় বাংলাদেশ সহকারী হাইকমিশনে হামলার ঘটনার পর ভারত সরকারকে আনুষ্ঠানিকভাবে দুঃখ প্রকাশ করতে হয়েছিল-যা দিল্লির জন্য ছিল কূটনৈতিক লজ্জার বিষয়। বাংলাদেশ যদি আজ সেই একই ভাষায় কথা বলে, তাহলে নৈতিক উচ্চভূমি হারাবে। তখন ভারত সহজেই নিজেকে ‘ভিক্টিম’ হিসেবে হাজির করতে পারবে, আর বাংলাদেশ পরিণত হবে অভিযুক্তে।

আন্তর্জাতিক আইন স্পষ্ট। স্বাগতিক দেশকে দূতাবাসের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই হয়। ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশন ভারতের সার্বভৌম সম্পদ, যেমন দিল্লিতে বাংলাদেশ হাইকমিশন বাংলাদেশের সার্বভৌম সম্পদ। এই মৌলিক সত্য অস্বীকার করে যে কোনো বক্তব্য কেবল সরকারকে নয়, রাষ্ট্রকেই দুর্বল করে।

কিন্তু তাই বলে কি ভারতের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের হাত-পা বাঁধা? একেবারেই নয়। বরং বাস্তবতা হলো-বাংলাদেশের হাতে এমন কিছু কার্যকর কূটনৈতিক লিভারেজ আছে, যেগুলো হুমকিতে নয়, নীরব ব্যবহারে কাজ করে।

প্রথম এবং সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র-বাণিজ্য। ভারত প্রতিবছর বাংলাদেশে ১৩–১৪ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি করে। বাংলাদেশ ভারতের বাজারে রপ্তানি করে মাত্র দেড়–দুই বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ বাংলাদেশ ভারতের জন্য একটি বড় বাজার। অর্থনীতির ভাষায়, ক্রেতাই শেষ কথা বলে।

এই কারণেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের চাপ বাংলাদেশ অনেক সময় অপছন্দ সত্ত্বেও মেনে নেয়। কারণ তারা বাংলাদেশের প্রধান ক্রেতা। সেই একই বাস্তবতা ভারতের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। বাংলাদেশ চাইলে পর্দার আড়ালে, উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক চ্যানেলে খুব ঠান্ডা মাথায় বলতে পারে-হাদি হত্যাচেষ্টায় জড়িতদের ফেরত না দিলে এবং বাংলাদেশবিরোধী তৎপরতা বন্ধ না হলে ভারতীয় পণ্য আমদানির গতি কমাতে বাধ্য হতে হবে।

এটা যদি মঞ্চে দাঁড়িয়ে বলা হয়, তাহলে ব্যুমেরাং হবে। কারণ তখন দিল্লিকেও জনতুষ্টির রাজনীতিতে নামতে হবে। কিন্তু নীরব চাপ, ঘোষণাহীন সিদ্ধান্ত-এসবই আন্তর্জাতিক রাজনীতির আসল ভাষা।

এরপর আসে আরও সংবেদনশীল কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র-মানুষের চলাচল ও সেবা খাত। প্রতিবছর লাখো বাংলাদেশি চিকিৎসা, শিক্ষা, পর্যটন ও বিভিন্ন সেবার জন্য ভারতে যান। এই খাতে বাংলাদেশ থেকে ভারতে যায় পাঁচ থেকে ছয় বিলিয়ন ডলারের কম নয়। ভারতের বহু হাসপাতাল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও পর্যটন খাত এই প্রবাহের ওপর নির্ভরশীল।
এই প্রেক্ষাপটে ঢাকায় ভারতীয় ভিসা কেন্দ্র বন্ধ হওয়া নিছক প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়; এটি একটি স্পষ্ট রাজনৈতিক সংকেত। বিশেষ করে যখন সামনে নির্বাচন, তখন এই সিদ্ধান্ত জনমনে স্বাভাবিকভাবেই সন্দেহ তৈরি করে-ভিসা কি কেবল নিরাপত্তার কারণে বন্ধ, নাকি এটি চাপ সৃষ্টির একটি হাতিয়ার?

বাংলাদেশ সরকার চাইলে এখানেও পাল্টা হুঙ্কার না দিয়ে আচরণগত কূটনীতি নিতে পারে। ঘোষণা নয়, বাস্তব সিদ্ধান্ত। চিকিৎসা, শিক্ষা ও পর্যটনে ভারতমুখী প্রবাহ নিরুৎসাহিত করা-শব্দ ছাড়া বার্তা দেওয়া। বার্তাটি হবে স্পষ্ট: সম্পর্ক স্বাভাবিক না হলে লেনদেনও স্বাভাবিক থাকে না।

তৃতীয় কৌশল-আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক ব্রিফিং। রাস্তায় বক্তৃতা দিয়ে বা ফেসবুক লাইভে হুমকি দিয়ে কোনো দেশকে চাপে ফেলা যায় না। বরং এতে সেই দেশ নিজেকে নির্যাতিত হিসেবে তুলে ধরার সুযোগ পায়। বাংলাদেশ চাইলে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জাতিসংঘ ও অন্যান্য অংশীদারদের কাছে নথিভিত্তিকভাবে তুলে ধরতে পারে-যদি সত্যিই ভারত বাংলাদেশবিরোধী তৎপরতায় জড়িত ব্যক্তিদের আশ্রয় দিয়ে থাকে, তবে তা আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য হুমকি।

নির্বাচন নিয়ে ভারতের প্রকাশ্য ‘নসিহত’ তাই স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্নবিদ্ধ। গত ১৫ বছরে প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনের সময় দিল্লির নীরবতা আজকের বক্তব্যকে বিশ্বাসযোগ্য করে না। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে ভারতের তুলনা চলে না। ইইউ কথা বলে কাঠামোবদ্ধ প্রক্রিয়ায়, পর্যবেক্ষক পাঠিয়ে। ভারত কথা বলছে রাজনৈতিক ইঙ্গিতে।

পররাষ্ট্র উপদেষ্টার স্বীকারোক্তি-ভারতের সঙ্গে সম্পর্কে টানাপড়েন আছে-বাস্তবতার স্বীকৃতি। কিন্তু এই টানাপড়েন সামাল দেওয়া যাবে না আবেগী বক্তৃতা দিয়ে। রাষ্ট্রের ভাষা হতে হয় হিসেবি, ঠান্ডা এবং দূরদর্শী।

সবশেষে একটি বিষয় পরিষ্কার করে বলা দরকার-বিচ্ছিন্নতাবাদীদের আশ্রয় দেওয়ার মতো বক্তব্য কোনো অবস্থাতেই রাষ্ট্রের নীতি হতে পারে না। এতে করতালি মিলতে পারে, কিন্তু রাষ্ট্র হারায় বিশ্বাসযোগ্যতা।

বাংলাদেশ এখন একটি মোড়ে দাঁড়িয়ে। একদিকে উত্তেজনার রাজনীতি-যেখানে শব্দ থাকবে প্রচুর, ফল থাকবে শূন্য। অন্যদিকে নীরব কৌশলের কূটনীতি-যেখানে কথা কম, কিন্তু চাপ বাস্তব। ইতিহাস বলে, রাষ্ট্র টিকে থাকে দ্বিতীয় পথেই। প্রশ্ন হলো, আমরা কি সেই পথ বেছে নিতে পারবো?

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট

email: niazjournalist@gmail.com

 

খুলনা গেজেট/এনএম




আরও সংবাদ

খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন