নানাভাবে বিভক্ত হয়ে পড়েছেন খুলনায় ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া সংগঠকরা। অভ্যুথানের পরপরই ছাত্রদের একটি অংশ সমন্বয়কের পদ থেকে পদত্যাগ করে জাতীয় নাগরিক কমিটিতে যোগ দেন। এরপর জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপি গঠন হলে দ্বন্দ প্রকট আকার ধারণ করে। গত রোজায় ইফতার পার্টির পর স্থানীয় কোনো কর্মসূচি একসঙ্গে দেখা যায়নি তাদের। বর্তমানে খুলনায় এ সংগঠন দুটি ধারায় বিভক্ত।
জেলা সমন্বয়ক মাহমুদুল হাসান ফয়জুল্লাহ, ছাত্রনেতা সাজিদুল ইসলাম বাপ্পী ও সাবেক বিএনপি নেতা এস এম আরিফুর রহমান মিঠুর নেতৃত্বে একটি অংশ কেন্দ্রের বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করছে। জেলা যুগ্ম আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট মাফতুন আহম্মেদ নিজেকে দূরে সরিয়ে নিয়েছে। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সহযোগী জাতীয় পার্টির কয়েকজন পদত্যাগী নেতাকে তাদের সঙ্গে দেখা গেছে। এ নিয়েও দ্বন্দ্ব তৈরি হয়েছে নেতাকর্মীদের মাঝে।
অপর অংশে রয়েছেন আহমেদ হামীম রাহাতসহ জাতীয় নাগরিক কমিটির খুলনা মহানগর কমিটির সংগঠকরা। তিনি এক সময়ে ছাত্র শিবিরের কমার্স কলেজ শাখার সভাপতি ছিলেন। দলকে সংগঠিত করার সকল সুযোগ হাত ছাড়া করেছেন। সম্ভাবনা থাকলেও সাধারণ মানুষের মাঝে শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পারেনি সংগঠনটি।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতাদের মধ্যেও নানা মতাদর্শ তৈরি হয়েছে। কমিটি বিলুপ্তির আগে চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন অপকর্মে জড়িয়ে সংবাদের শিরোনাম হয়েছে সংগঠনের মহানগর ও জেলা কমিটির কয়েকজন নেতা। বর্তমানে তাদের অনেকেই নিস্ক্রিয় হয়ে পড়েছেন। কেউ কেউ ভিন্ন নামে সংগঠন তৈরি করে অভ্যুত্থানের চেতনাকে ধরে রাখার চেষ্টা করছেন।
সংগঠকরা জানান, অভ্যুত্থানের শুরু থেকেই আন্দোলনকে এগিয়ে নিয়েছেন খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়, বিএল কলেজ, কমার্স কলেজসহ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর ছাত্ররা। অভ্যুত্থানের পর নানা বিতর্কিত কর্মকান্ডে জড়িয়ে জনগণের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি শুরু হয় তাদের। সহযোদ্ধাদের বিতর্কিত কর্মকান্ডের দায় এড়াতে অনেকে অভ্যুত্থানের পর ফেসবুকে ঘোষণা দিয়ে পদত্যাগ করেন অনেকে। যারা সক্রিয় ছিলেন কেউ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে আবার কেউ নতুন দলের রাজনীতিতে সক্রিয়ভাবে জড়িয়ে পড়েন।
অভ্যুত্থানের পর থেকে একটি অংশের সঙ্গে নতুন দলে যোগ দেওয়ার তৎপরতা শুরু করেন মহানগর বিএনপি’র সাবেক কোষাধ্যক্ষ এস এম আরিফুর রহমান মিঠু। জেলায় সমন্বয়ক কমিটি থাকলেও দলের নিয়ন্ত্রণ মূলত তার হাতে। সাজিদুল ইসলাম বাপ্পীসহ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের জেলা কমিটির অনেক নেতাকর্মী তার সঙ্গে রয়েছে।
অভ্যুত্থানের পর সমন্বয়কের পদ থেকে পদত্যাগ করে জাতীয় নাগরিক কমিটি গঠন করেন আহমেদ হামিম রাহাত। অভ্যুত্থানের সংগঠকদের তৈরি এই প্লাটফর্মকে এগিয়ে নেন তিনি। কিন্তু এনসিপি গঠনের পর সাজিদুল ইসলাম বাপ্পীর সঙ্গে বিরোধে জড়ান রাহাত। এরপর বিভিন্ন ইস্যুতে বিরোধ চাঙ্গা হওয়ার পর মুখ দেখাদেখি বন্ধ হয়ে যায় তাদের।
এই বিরোধে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র নেতারাও বিভক্ত হয়ে পড়েন। বাপ্পীর সঙ্গে গত কোরবানীর হাটে গরুর হাট বসান বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক সদস্য সচিব জহুরুল তানভীর ও মুখ্য সংগঠক সাজ্জাদুল ইসলাম আজাদ। বিভিন্ন ইস্যুতে তারা একছিলেন। অন্যদিকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক মহানগর আহ্বায়ক আল শাহরিয়ার, জেলা কমিটির মুখপাত্র মিরাজুল ইসলাম ইমনসহ অন্যরা পৃথকভাবে কর্মসূচি পালন করতে থাকেন।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের উপদেষ্টা মিনহাজ আবেদীন সম্পদ এখনও নতুন দলে যোগদান করেননি। বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের ব্যানারে এলাকার উন্নয়ন তৎপরতার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হয়েছেন। আন্দোলনের সামনের সারির আরেক সংগঠক সাইফ নেওয়াজ জাস্টিস ফর জুলাই নামের আরেকটি সংগঠনের বিভাগীয় নেতৃত্ব দিচ্ছেন।
সার্বিক বিষয় নিয়ে সাজিদুল ইসলাম বাপ্পী বলেন, জেলা ও মহানগরে এনসিপি’র পূর্ণাঙ্গ কমিটি না থাকায় কিছুটা সমন্বয়হীনতা হচ্ছে। অনেকে দলের নাম ভাঙিয়ে সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করছেন। তাদের বিষয়টি কেন্দ্রীয় নেতাদের জানানো হয়েছে।
আহমেদ হামীম রাহাত বলেন, প্রকৃত জুলাই যোদ্ধাদের অবমূল্যায়ন করে সুবিধাবাদী একটি গোষ্ঠিকে কাছে টানা নিয়েই দূরত্বের শুরু। এটা মেটাতে কেন্দ্রীয় নেতাদের বার বার বলেছি। আশা করছি দ্রুত বিষয়টি সমাধান হবে।
খুলনা গেজেট/এনএম