বাংলাদেশের নির্বাচন ব্যবস্থায় উপজেলাভিত্তিক এলাকাসমূহকে সংসদীয় আসনে বিন্যস্ত করা হয়। বাগেরহাট জেলার দুটি গুরুত্বপূর্ণ উপজেলা- রামপাল ও মোংলা। বর্তমানে একসঙ্গে সংসদীয় আসন বাগেরহাট-৩ (রামপাল-মংলা) হিসেবে বিদ্যমান থাকলেও সময় সময় এ নিয়ে বিভ্রান্তি কিংবা পুনর্বিন্যাসের প্রস্তাব আসে। অথচ ইতিহাস, ভূগোল, অর্থনীতি, সংস্কৃতি ও প্রশাসনিক যুক্তির আলোকে রামপাল ও মংলাকে একই নির্বাচনী আসনে রাখা একান্ত জরুরি।
ঐতিহাসিক সংযুক্তি:
১৮৯২ সালে রামপাল থানা প্রতিষ্ঠার পর থেকে ১৯৭৬ সাল পর্যন্ত প্রায় ৮৪ বছর মোংলা ছিল রামপাল থানার অন্তর্ভুক্ত। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়- এই দুই অঞ্চলের প্রশাসনিক বন্ধন দীর্ঘদিনের, যা আধুনিক যুগেও ভেঙে দেওয়া অযৌক্তিক।
ভৌগোলিক ও প্রাকৃতিক সাদৃশ্য:
রামপাল ও মোংলা— উভয়ই সুন্দরবনের নিকটবর্তী, পশুর নদী ও অন্যান্য জলপথ ঘিরে থাকা নদীনির্ভর এলাকা। দুই উপজেলা একে অপরের সীমানায় অবস্থিত হওয়ায় যোগাযোগ ও অবকাঠামোতে যৌথ উন্নয়নের সুযোগ তৈরি হয়।
অর্থনৈতিক একতা ও সম্ভাবনা:
রামপাল তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র ও মোংলা সমুদ্রবন্দর— উভয় প্রকল্প জাতীয় অর্থনীতির চালিকাশক্তি। মোংলা ইপিজেড, আমদানি-রপ্তানি, শিল্পায়ন এবং রামপালের বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র— দুটি উপজেলার কার্যক্রম একে অপরকে পরিপূরক।
কৃষি ও মৎস্যনির্ভর অর্থনীতিও উভয় উপজেলায় জোরালো, যা সমন্বিত উন্নয়নের ভিত্তি গড়ে তোলে।
সাংস্কৃতিক ও সামাজিক মিল:
ভাষা, খাদ্যাভ্যাস, ধর্মীয় সহাবস্থান, লোকসংস্কৃতি ও সামাজিক রীতিতে এই দুটি উপজেলার মধ্যে উল্লেখযোগ্য সাদৃশ্য বিদ্যমান।
ঈদ, দুর্গাপূজা, বর্ষবরণসহ স্থানীয় উৎসবগুলোতে উভয়ের জনগণ মিলেমিশে অংশগ্রহণ করে।
কেন মোংলা-মোরেলগঞ্জ কিংবা রামপাল-বাগেরহাট সদর নয়?
ভৌগোলিক ভিন্নতা:
মোংলা: উপকূলবর্তী, লবণাক্ত অঞ্চল, সমুদ্রবন্দর ও বনজ সম্পদে সমৃদ্ধ।
মোরেলগঞ্জ: ভেতরের দিকের গ্রামীণ উপজেলা, ধানক্ষেত ও মিঠা পানির খালবিলনির্ভর।
অর্থনৈতিক পার্থক্য:
মোংলা: আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও শিল্পনির্ভর।
মোরেলগঞ্জ: প্রধানত কৃষিনির্ভর।
জীবনধারা ও অবকাঠামো:
মোংলা শহরঘেঁষা আধুনিক এলাকা, মোরেলগঞ্জ গ্রামীণ।
তেমনি রামপাল ও বাগেরহাট সদর- একটি শিল্পনির্ভর, অন্যটি প্রশাসনিক ও ঐতিহাসিক শহর।
পরিবেশ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় যৌথতা:
সুন্দরবন সংরক্ষণ, উপকূলীয় ঝুঁকি মোকাবিলা ও জলবায়ু অভিযোজনের জন্য রামপাল ও মংলার সমন্বিত পরিকল্পনা অপরিহার্য।
ঘূর্ণিঝড় ও লবণাক্ততা মোকাবেলায় একযোগে কাজ করলে উপকারিতা বহুগুণ বাড়ে।
জাতীয় ও আন্তর্জাতিক গুরুত্ব:
মোংলা বন্দর ও রামপাল তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র— উভয় প্রকল্পই বৈশ্বিক বিনিয়োগ, শক্তি নিরাপত্তা এবং রপ্তানিনির্ভর অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এক আসনে রাখলে সমন্বিত উন্নয়ন কৌশল গ্রহণ সহজতর হয়।
প্রশাসনিক ও উন্নয়নগত সুবিধা:
একই আসনে থাকলে উন্নয়ন প্রকল্প, অবকাঠামো উন্নয়ন ও নির্বাচন সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক কাজগুলো আরও দ্রুত ও কার্যকর হয়। আন্তঃউপজেলা সমন্বয় সহজ হয়, বিশেষ করে যেসব প্রকল্প দুই উপজেলাকে ঘিরে।
সুতরাং বলা যায় রামপাল ও মোংলা— দুটি উপজেলা ইতিহাসে, ভূগোলে, অর্থনীতিতে ও সমাজে পরস্পর সম্পৃক্ত। রাজনৈতিক প্রশাসন ও উন্নয়ন কৌশলের ক্ষেত্রেও তাদের মধ্যে রয়েছে অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক।যারজন্য সাংবিধানিক, রাজনৈতিক ও উন্নয়ন অভিসন্ধির আলোকে রামপাল ও মোংলাকে একই সংসদীয় আসনে রাখা শুধু যুক্তিসঙ্গত নয়- বরং সময়োপযোগী ও অপরিহার্য।
লেখক : প্রসিকিউটর (প্রশাসন), আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল, বাংলাদেশ সুপ্রিমকোর্ট।
খুলনা গেজেট/এএজে